‘টপ গান’ মুক্তির ৪০ বছর

মাটির পৃথিবীতে নেমে আসা ‘স্টার ওয়ার্স’

৪০ বছর পরেও ‘টপ গান’ টিকে আছে মূলত একটি কারণে, টম ক্রুজ। প্রযোজক ব্রুকহাইমারের মতে, ক্রুজ এমন একজন অভিনেতা যিনি দর্শকের অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত থামেন না। এ ডেডিকেশনই সিনেমাটিকে টাইমলেস করে রেখেছে

১৯৮৬ সালের ১৬ মে মুক্তি পায় ‘টপ গান’। এটি নিতান্তই একটি অ্যাকশন ফিল্ম নয়, বরং আধুনিক হলিউডের ইতিহাসে ব্লকবাস্টারের ধারণার বদলে দেয়া সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। চার দশক পরও এটি শুধু নস্টালজিয়া জাগানো ক্লাসিক নয়। নির্মাণের গল্পও সমান রোমাঞ্চকর, প্রায় সিনেমার মতোই নাটকীয়।

ম্যাগাজিন পাতা থেকে শুরু: এটা যেন পৃথিবীর স্টার ওয়ার্স

১৯৮৩ সাল। প্রযোজক জেরি ব্রুকহাইমার একটি ম্যাগাজিনে ‘টপ গানস’ শিরোনামের একটি ফিচার পড়েন। ওই ফিচারে মার্কিন নৌবাহিনীর এফ-১৪ যুদ্ধবিমানের পাইলটদের জীবন তুলে ধরা হয়েছিল। ফিরারে জুড়ে দেয়া ছবিতে দেখা যায়, যুদ্ধবিমানের ককপিট থেকে তোলা আকাশ, গতি ও তীব্র উত্তেজনা।

ব্রুকহাইমারের ভাষায়, সেই ছবিটি দেখে তার মনে হয়েছিল ‘এটা যেন পৃথিবীতে বাস্তব স্টার ওয়ার্স’। সায়েন্স ফিকশন মনে হলেও সত্যিকারেরই ঘটনা। সিনেমাটির প্রাথমিক ধারণার জন্ম দেয় এ অনুভূতিই।

ব্রুকহাইমারের দ্রুত অংশীধার ডন সিম্পসনকে বিষয়টি জানান। এর পর তারা প্রযোজনা সংস্থা প্যারামাউন্টের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান এবং প্রজেক্টটি অনুমোদন পায়।

স্ক্রিপ্টের শুরু: বাস্তব পাইলটদের পৃথিবীতে প্রবেশ

স্ক্রিপ্ট লেখার দায়িত্ব পান জ্যাক এপস জুনিয়র ও জিম ক্যাশ। তাদের বলা হয়, সিনেমাটি হতে হবে বাস্তব যুদ্ধবিমানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে। থাকবে না কোনো কৃত্রিম ভিএফএক্স বা স্টুডিও ফ্লাইট।

এ শর্ত থেকেই শুরু হয় এক অনন্য গবেষণা অভিযান। লেখক এপস নিজেই পাইলট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তিনি যান মেরিন কোর এয়ার স্টেশন মিরামারে, যেখানে নেভাল এভিয়েটরদের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

প্রশিক্ষণ: ভয়, গতি ও জি-ফোর্স

এপসকে শুধু পর্যবেক্ষক করে রাখা হয়নি, তাকে সত্যিকারের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে ছিল পানির নিচে ‘হেলো ডাঙ্কার’ ইজেকশন অনুশীলন, জরুরি অবস্থায় উড়োজাহাজ থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া শেখা, উচ্চ জি-ফোর্স সহ্য করার প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধবিমানে উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা।

এপস জানান, যখন প্রথমবার তাকে আকাশে তোলা হয়, তখন বলা হয়েছিল তারা এমন কিছু করবে যা সাধারণত করা উচিত নয়। তারপর শুরু হয় উচ্চগতির ক্লোজ পাস, ব্যারেল রোল ও সিক্স জি পর্যন্ত চাপ।

তার অভিজ্ঞতায়, সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল পাইলটদের শারীরিক সক্ষমতা। তারা একেকজন পূর্ণাঙ্গ ‘অ্যাথলেট’। জি-ফোর্স সামলাতে তাদের শরীরকে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, এমনকি শ্বাসপ্রশ্বাসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

‘টপ গান’ চলচ্চিত্রে টম ক্রুজ। ছবি: প্যারামাউন্ট পিকচার্স

গল্পে সমস্যা: নাটকীয়তা কোথায়?

বাস্তব পাইলটদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে লেখকরা একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হন। কারণ তাদের সাধারণ রুটিনে কোনো নাটকীয় দ্বন্দ্ব নেই। সবাই পেশাদার, টিমওয়ার্কে বিশ্বাসী। কিন্তু সিনেমার জন্য দরকার সংঘাত।

এ সমস্যার সমাধান দেয় একটি সৃজনশীল মোড়, যখন একজন পাইলটকে ‘আউটসাইডার’ হিসেবে তৈরি করা হয়। যে সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চায় না, বরং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়।

এভাবেই জন্ম নেয় পিট ম্যাভেরিক মিচেল চরিত্র। প্রতিভাবান কিন্তু বিদ্রোহী পাইলট, যার মধ্যে অহং, ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা এবং আবেগ সবই আছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আইসম্যান নামের শৃঙ্খলাপরায়ণ এক পাইলট। এই দুই চরিত্রের দ্বন্দ্বই সিনেমার মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

গোসের মৃত্যু: গল্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

সিনেমার সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল মাভেরিকের সহ-পাইলট গোসের মৃত্যু।

পাইলটদের সঙ্গে আলাপচারিতা থেকে এ ধারণা আসে। লেখকরা দেখেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের ১৫ বছর পরও অনেক পাইলট তাদের হারানো সহকর্মীদের শোক ভুলতে পারেননি। সেই গভীর আবেগ গল্পে ঢোকানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

গোসের মৃত্যু শুধু একটি ঘটনাই নয়, এটি ম্যাভেরিকের মানসিক যাত্রার কেন্দ্রবিন্দু। সে অপরাধবোধ, ভয় ও আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে যায়। এ অংশটি সিনেমাকে শুধুমাত্র অ্যাকশন ফিল্ম না রেখে একটি আবেগঘন মানবিক গল্পে রূপ দেয়।

টম ক্রুজ: একজন তারকার জন্ম

মাভেরিক চরিত্রের জন্য শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল টম ক্রুজ। লেখকরা তাকে মাথায় রেখেই স্ক্রিপ্ট লেখেন। তখন ক্রুজ তরুণ ও উদীয়মান তারকা। রিডলি স্কটের ‘লিজেন্ড’ সিনেমার জন্য লম্বা চুল রেখেছিলেন তিনি।

প্রযোজক জেরি ব্রুকহাইমার তাকে রাজি করাতে একটা চালাকি করেন। টম ক্রুজকে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ব্লু এঞ্জেলস’ দলের সঙ্গে সত্যিকারের ফাইটার জেটে উড়ার সুযোগ দেন। আর লম্বা চুল, পনিটেইল নিয়ে আসা ক্রুজকে পাইলটরা প্রথমে সিরিয়াসলি নেননি। কিন্তু আকাশে উড়ার পর অভিজ্ঞতা বদলে যায় সবকিছু। ক্রুজ বিমান থেকে নেমেই ফোন করে বলেন, ‘আই অ্যাম ইন’। এই একটি মুহূর্ত তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

টনি স্কটের ভিজ্যুয়াল বিপ্লব

পরিচালক টনি স্কট সিনেমাটিকে শুধু একটি গল্প হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে একটি ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা বানান। দ্রুতগতির কাট, সূর্যাস্তের গোল্ডেন লাইট, ককপিটের ক্লোজ শট ও উড়োজাহাজের গর্জনকে প্রায় সংগীতের মতো ব্যবহার সিনেমাটিকে অনন্য করে তোলে। এসব মিলিয়ে দর্শক যেন সত্যিই আকাশে উড়ছে—এই অনুভূতি তৈরি হয়।

প্রযোজকরা শুরুতে চিন্তিত ছিলেন, সিনেমাটি অনেক বেশি ‘স্টাইল-হেভি’ হয়ে যাচ্ছে কিনা। পরে ধীরে ধীরে ভারসাম্য আনা হয়।

২০২২ সালে মুক্তি পায় ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’। ছবি: প্যারামাউন্ট পিকচার্স

বিতর্ক: দেশপ্রেম না সামরিক প্রচারণা?

মুক্তির পর ‘টপ গান’ বিশাল সাফল্য পায়। বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করে হয়ে ওঠে বছরের সবচেয়ে বড় হিট।

কিন্তু একই সঙ্গে সমালোচনাও আসে। অনেকে বলেন, এটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘রিক্রুটমেন্ট টুল’। কারণ সিনেমার পর নৌবাহিনীতে যোগদানের আবেদন বেড়ে যায় এবং এমনকি সিনেমা হলে নিয়োগ বুথও বসানো হয়।

সমালোচক পাউলিন কেইল এটিকে ‘শাইনি হোমোরোটিক কমার্শিয়াল’ বলে আখ্যা দেন—যেখানে সৌন্দর্য, পুরুষত্ব এবং সামরিক গৌরবকে একসঙ্গে প্যাকেজ করা হয়েছে।

লেখক জ্যাক এপস অবশ্য এ সমালোচনার সঙ্গে একমত নন। তার মতে, সিনেমাটি সৈনিকদের মানবিক দিক, বন্ধুত্ব এবং আত্মত্যাগকে সম্মান করে।

সংস্কৃতির ওপর প্রভাব

‘টপ গান’ শুধু সিনেমা হিসেবে নয়, একটি পপ কালচার ফেনোমেনা হয়ে ওঠে। এর ‘টেক মাই ব্রেথ অ্যাওয়ে’ গানটি অস্কার জেতে। সাউন্ডট্র্যাক বিশ্বব্যাপী হিট হয়। এর পাশাপাশি ফ্যাশন ট্রেন্ডে চলে আসে সানগ্লাস, জ্যাকেট, ফাইটার পাইলট লুক। ‘নিড ফর স্পিড’ স্টাইল অ্যাকশন সিনেমারও জন্ম দেয়।

এটি এমন একটি ফিল্ম যা সিনেমা হল ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনের সংস্কৃতিতে ঢুকে পড়ে।

টিকে থাকার কারণ

৪০ বছর পরেও ‘টপ গান’ টিকে আছে মূলত একটি কারণে, টম ক্রুজ। প্রযোজক ব্রুকহাইমারের মতে, ক্রুজ এমন একজন অভিনেতা যিনি দর্শকের অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তিনি প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত থামেন না। এ ডেডিকেশনই সিনেমাটিকে টাইমলেস করে রেখেছে।

সমালোচকরা বলেন, ‘টপ গান’ শুধু একটি অ্যাকশন সিনেমা নয়। এটি একটি বাস্তব যুদ্ধবিমানের অভিজ্ঞতা, একজন তরুণ তারকার উত্থান, সৃজনশীল সংকট থেকে জন্ম নেয়া গল্প এবং ভিজ্যুয়াল সিনেমার নতুন ভাষা তৈরির ইতিহাস।

সিনোমটি দেখিয়েছে কীভাবে বাস্তবতা, প্রযুক্তি ও আবেগ একসঙ্গে মিলে একটি সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। চার দশক পরেও যখন কেউ ফ্লাইং বা স্পিড অনুভব করতে চায়, তখন ‘টপ গান’ সেই অনুভূতির সবচেয়ে কাছের সিনেমা হয়ে থাকে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও