মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র: ইতিহাসের দলিল ও চেতনার প্রতিচ্ছবি

মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা যখন একেবারেই টাটকা, ঠিক তখনই নির্মিত হয় প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলো। যা ছিল যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা শুধু যুদ্ধের ঘটনা নয়, বরং যুদ্ধের ফলস্বরূপ সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কের ওপর তার গভীর প্রভাবকে কেন্দ্র করেও নির্মিত হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি সামরিক সংঘাত ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অগ্নিপরীক্ষা। এ অগ্নিঝরা ইতিহাসের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে চলচ্চিত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এ চলচ্চিত্রগুলো আমাদের জাতীয় চেতনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যুদ্ধের বিভিন্ন দিককে ধরে রেখেছে স্যালুলয়েডের ফিতায়।

সূচনালগ্নের ঐতিহাসিক দলিল (১৯৭১-১৯৭৫)

মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা যখন একেবারেই টাটকা, ঠিক তখনই নির্মিত হয় প্রথম দিকের চলচ্চিত্রগুলো। যা ছিল যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্যে রয়েছে-

ওরা এগারো জন (১৯৭২)

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এতে অভিনয় করা ১১ জনের মধ্যে ১০ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। ছবিটি সরাসরি রণাঙ্গনের বীরত্ব ও রাজাকারদের নৃশংসতা তুলে ধরে। গল্পের শুরু খসরু ও তার বোন মিতার স্বাভাবিক ছাত্রজীবন দিয়ে। খসরুর সঙ্গে প্রতিবেশী শীলার বাগদান, আর মিতার সঙ্গে শীলার ভাই পারভেজের প্রেম—সব মিলিয়ে জীবন ছিল শান্ত। কিন্তু ১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে খসরু গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলে ও নেতৃত্ব দেয়। পারভেজ গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতে গিয়ে ধরা পড়ে এবং নির্মমভাবে তার পরিবারকে হত্যা করা হয়, শীলাও নির্যাতিত হয়। মিতা বিক্রমপুরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যুক্ত হলে সেও নির্যাতনের শিকার হয় পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শত্রুবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সারা দেশ ভরে ওঠে বিজয়োল্লাসে। কিন্তু ঘরে ফেরেনা অনেকের প্রিয় মানুষ। বিজয়ের মাঝেও থেকে যায় শূন্যতার ক্ষত। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ সেই কালজয়ী গানে আজও আমরা স্মরণ করি ৭১ এর সেই বীরেদের। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন খসরু, রাজ্জাক, শাবানা, নূতন।

অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২)

সুভাষ দত্ত পরিচালিত এ চলচ্চিত্র যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নারী ও যুদ্ধশিশুদের কঠিন বাস্তবতা এবং ধর্ষিতাকে গ্রহণ করার মতো সংবেদনশীল সামাজিক বিষয় নিয়ে নির্মিত, যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত সাহসী। পর্দায় তিনিই প্রথম যুদ্ধশিশুদের অধিকার নিয়ে দাবি উত্থাপন করেন। সিনেমার পোস্টারে লেখা ছিল ‘লাঞ্চিত নারীত্বের মর্যাদা দাও, নিষ্পাপ সন্তানদের বরণ কর’। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ এ সিনেমারই একটি জনপ্রিয় গান, যা আজও আমাদের মনকে ভিজিয়ে দিয়ে যায় গভীর আবেগে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লাঞ্চিত নারীদের পুনর্বাসনের কাজ সাহসের সঙ্গে করে দেখানোর তাগিদ ছিল সিনেমাটিতে। এ ছবি আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা শুধু ভূখণ্ডের নয়, তা মানবিক মর্যাদারও হওয়া চাই।

ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩)

একজন ভারতীয় তরুণী অনিতা গুপ্তা, তার নিখোঁজ প্রেমিককে খুঁজতে বাংলাদেশে আসে। সে সময় এদেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ। অরুণীও বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে। মিশে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। তার চোখে বাঙালি জাতির দুঃখ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মানবিকতার জয়গান তুলে ধরা হয় এ সিনেমায়। আলমগীর কবিরের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় এ সিনেমায় অভিনয় করেন ববিতা, হাসু ব্যানার্জী, গোলাম মোস্তফা, খলিল প্রমুখ। এ সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন জহির রায়হান। মেঘনার ধীর বহমানতা যেন ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ভিন্ন দেশের একটি নারীর চোখে যখন আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মহিমা আর আত্মত্যাগ তুলে ধরা হয়, তখন দেশপ্রেমের অনুভূতি আরো গভীর ও বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে।

আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩)

খান আতাউর রহমান পরিচালিত এ চলচ্চিত্র যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলার চিত্র তুলে ধরে। বঙ্গবাণী কলেজের সাত তরুণ—হিরে, চুন্নি, পান্না, সোনা, রতন, কাঞ্চন ও মাণিক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করলেও যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনে তারা এক নতুন সংগ্রামে নামে। অস্ত্র হাতে তারা সমাজের অন্যায়, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। তবে এ প্রতিরোধ ধীরে ধীরে সহিংসতার রূপ নেয়। এক সময় পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে মাণিক ধরা পড়ে, বহিষ্কৃত হয়। সমাজকে আদর্শ পথে ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে সাত তরুণ শেষ পর্যন্ত হতাশা ও অপকর্মের পথে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অবক্ষয়েরই এক করুণ প্রতিচ্ছবি এ কাহিনী।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সংবেদনশীল চিত্রায়ণ (১৯৭৬-১৯৯৯)

এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলো শুধু যুদ্ধের ঘটনা নয়, বরং যুদ্ধের ফলস্বরূপ সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কের ওপর তার গভীর প্রভাবকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে।

মেঘের অনেক রঙ (১৯৭৬)

হারুনর রশীদ পরিচালিত এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। যুদ্ধকালীন ধর্ষণের শিকার এক নারীর করুণ পরিণতি এবং তার সন্তানের জীবন সংগ্রামের মর্মস্পর্শী চিত্র এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি গেরিলা যোদ্ধাদের জীবনের ঝুঁকি, আতঙ্ক, এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা দেশপ্রেমের এক অসাধারণ গল্প। এটি একাত্তরের ঢাকা শহরের গৃহবন্দী সাধারণ মানুষের মানসিক যুদ্ধকে সামনে এনেছে।

হাঙ্গর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭)

সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত এই চলচ্চিত্রতে একজন গ্রামীণ মায়ের চরম আত্মত্যাগের গল্প চিত্রিত হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে নিজের বিশেষভাবে সক্ষম অবুঝ ছেলেকে তুলে দেয় পাক হানাদার বাহীনির হাতে। মাটির প্রতি মায়ের এই নিঃশর্ত ভালোবাসার দৃশ্যে জলে চোখ ভেসে যায় প্রতিটি দর্শকের।

নতুন শতকের নতুন ভাবনা (২০০০-বর্তমান)

এ সময়ের চলচ্চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুন আঙ্গিকে এবং ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি লাভ করেছে।

মাটির ময়না (২০০২)

তারেক মাসুদের এই সিনেমা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক মাদ্রাসাশিক্ষক পরিবারে পিতা-পুত্রের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও উদারতার দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন তাদের এ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাইরের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে এক নতুন অর্থ তৈরি করে। সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিপ্রেসি পুরস্কার লাভ করে।

জয়যাত্রা (২০০৪)

তৌকীর আহমেদ পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক মানবিক দলিল। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর গণহত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে একটি গ্রামের মানুষ নৌকায় করে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বের হয়। সেই নৌকায় একত্রিত হয় বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণী ও বয়সের মানুষ—শিক্ষক, কৃষক, বৃদ্ধ, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারী। দীর্ঘ পথজুড়ে তারা ক্ষুধা, ভয় ও আক্রমণের মুখোমুখি হয়। নৌকার মধ্যেই ঘটে জন্ম ও মৃত্যুর ঘটনা। এ যাত্রাপথেই ফুটে ওঠে মানবতা, প্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। নৌকাটি শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রতীকী জয়যাত্রায় রূপ নেয়।

আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১)

মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত এই সিনেমাতে একটি কিশোরের দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধের নৃশংসতা ও দেশপ্রেম তুলে ধরা হয়েছে। রাশেদ নামের এক সাহসী ও বুদ্ধিমান কিশোরের নেতৃত্বে তার বন্ধুরা মিলে কীভাবে স্থানীয় পাক-বাহিনী ও রাজাকারদের প্রতিরোধ করে, সেই গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটি শেখায় বয়স নয়, সাহস আর ন্যায়বোধই একজন মানুষকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে তোলে। তরুণদের মনে স্বাধীনতার বীজ বুনে দেয় এ সিনেমা।

গেরিলা (২০১১)

সিনেমাটি সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালনা করেছেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। একাত্তরের ঢাকা শহরের এক সাহসী নারী, বিলকিস। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি নিজেও জড়িয়ে পড়েন গেরিলা যুদ্ধে। শহরের বুকে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বিলকিসের চরিত্রটি প্রমাণ করে, যুদ্ধের ময়দানে নারী শুধুই ভুক্তভোগী ছিল না, তারা ছিল প্রতিরোধের ধারালো অস্ত্র।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, তারা আমাদের জাতীয় চেতনার মশাল বহন করে। এই চলচ্চিত্রগুলো একদিকে যেমন আমাদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তেমনি অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধ, বীরাঙ্গনাদের দুর্ভোগ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজের জটিলতাগুলিকেও তুলে ধরে। প্রতিটি চলচ্চিত্রই কোনো না কোনোভাবে আমাদের এই মহৎ ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মকে যুক্ত রাখে, যা একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।

আরও