২০১৫ সাল। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ঝড় তুলেছিল কলকাতার একটি সিনেমা। বেলাশেষে। পরিচালক দুজন। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’
সিনেমায় অভিনয়ের ৩০ বছর পর এক সিনেমায় দেখা মেলে কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের। কিংবদন্তি জুটি দর্শককে উপহার দেন মন্ত্রমুগ্ধ কিছু সময়। ছবিটি যে শুধু সমালোচকদের তারিফ পেয়েছিল তাই নয়, বক্স অফিসেও সাফল্যের জোয়ার এসেছিল। খোদ অমিতাভ বচ্চন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসা করেছিলেন।
মাঝখানে কেটে গেছে সাত বছর। এর মধ্যে মহামারী হানা দিয়েছে। না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন কিংবদন্তি তুল্য অভিনেতা সৌমিত্র। তিনি যাওয়ার আগে উপহার দিয়ে গেলেন আরেকটা দীর্ঘশ্বাস। আরেকটু মুগ্ধতা ও ভালোবাসা! এ মুগ্ধতার নাম ‘বেলাশুরু’। বেলাশেষের চরিত্রগুলো ফিরে এলেও বেলাশুরু কোনোমতেই বেলাশেষের সিক্যুয়েল নয়। বেলাশেষের পরতে পরতে ফুটে উঠেছিল সম্পর্ক, সংসার, প্রেম, বন্ধুত্ব আর ভাঙনের নানা সমীকরণ। বেলাশুরুর কেন্দ্রে রয়েছে শুধুই ভালোবাসা আর পরিবার।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সিনেমা বেলাশুরুর দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট। এটি পারিবারিক ড্রামা ঘরানার সিনেমা, যা পরিচালনা করেছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। এর আগে তারা বেলাশেষে নামে একই জনরার একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন। বেলাশুরু বলি বা বেলাশেষে, দুটোই একটি আদ্যোপান্ত পারিবারিক ছবি, যার ভিত দাঁড়িয়ে পারিবারিক আবেগের ওপর। বলা যায় পরিবারের ভেতরকার টানাপড়েন ও মূল্যবোধের গল্প নিয়ে তৈরি বেলাশুরু। বর্তমান সময় বিবেচনায় বেলাশুরু পরিবারের সঙ্গে দেখার মতো সিনেমা। বলে রাখা ভালো, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় জুটির ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা বেলাশেষের সঙ্গে বেলাশুরুর তুলনা না করাই ভালো। কারণ দুটি গল্পে চরিত্র আর পারিবারিক আবহ ছাড়া সব আলাদা। তার পরও কিছু জায়গায় তুলনা এসেই যাবে। আমার মতে, বেলাশুরু সিনেমার প্রধান আলোচনার দিক হলো প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের অভিনয়। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সারাক্ষণ উদ্বেগ, বিপন্নতা, অস্থিরতা ও ভালোবাসার এমন বাস্তবিক অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন যে স্ত্রী আরতির ভুলে যাওয়া অসুখের আঘাত চোখ ভিজিয়ে দেয়। সৌমিত্র ভালো অভিনেতা, সে কথা কে না জানে? বেলাশুরুর চরিত্রায়ণ দেখতে বসে মনে হয়, তিনি বিশ্বের বহু ভালো অভিনেতার একজনও নিশ্চয়। সারা জীবনের অভিনয়চর্চা, জ্ঞানার্জন ও অনুশীলন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, তার প্রতি মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের কোনো ভাষা নেই। বেলাশুরুর পরিচালকদ্বয় তার অভিনয়ক্ষমতা যথার্থ ব্যবহার করতে পেরেছেন। অসামান্য অভিনয়ে সৌমিত্র ফুটিয়ে তোলেন বিশ্বনাথের অসহায়তা। লুকোনো ঈর্ষা, দুঃখ ও গভীর প্রেমে সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে ব্যাকুল হয়ে ওঠা চরিত্রে তার বিকল্প কাউকে ভাবা যায় না। আরতি চরিত্রে স্বাতীলেখা সরল বাক্যে অনবদ্য। জীবনের এক সরল, মিঠে, ঝিকিমিকি আনন্দময় সময়ের সঙ্গে বাকি জীবনের অবিচ্ছেদ্য প্রেম, যার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে না স্মৃতিগ্রাসী স্নায়ুরোগ। প্রত্যেক ব্যক্তির হূদয়েই কি থাকে না এমন এক আগলে রাখা বেলা? যেকোনো সময়েই কি তার আশ্রয়ে চলে যেতে চায় না ব্যথাতুর, যন্ত্রণা বিধুর, ক্লান্ত হূদয়? বড় মেয়ে ও জামাই চরিত্রে অভিনয়ে অপরাজিতা আঢ্য ও খরাজ মুখোপাধ্যায়, যাদের সম্পর্ক সরল ও নির্ঝঞ্ঝাট। সার্বিকভাবে সৌমিত্র ও স্বাতীলেখার অভিনয় ছাড়াও অন্য চরিত্রগুলোয় অভিনয় গুণ এ সিনেমার এক সম্পদ। বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত কুশীলবের সঙ্গে সমমাত্রায় একেবারে ঝরঝরে অভিনয় করেছেন ছোট মেয়ে ও জামাইয়ের ভূমিকায় মনামী ঘোষ ও অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।
আবেগ হলো এ সিনেমার মেরুদণ্ড, যা দর্শককে খুব সহজেই সংযোগ করবে। এছাড়া সিনেমার কমিক টাইমিং অসাধারণ। আগেরবারের চেয়েও এবার বেশি হাসাবে সিনেমাটি। তার কারণ খরাজ ও প্রদীপ। এ দুই চরিত্র এবারো সে হাসির মেজাজটা বজায় রেখে গেছেন।
সিনেমার আবেগী অংশটা এত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কারণে। পুরো সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার অত্যন্ত সাবলীল ছিল। ক্যামেরার কাজ সরল হলেও কারো নজর এড়াবে না।
তবে কখনো কখনো সিনেমাটি একতরফা লাগছিল। বাকি চরিত্রগুলো এবার খুব বেশি জায়গা পায়নি। তাদের আবেগগুলো সেভাবে কাজ করেনি। সিনেমাজুড়ে দুটি চরিত্রকে ফোকাস করা হয়েছে। আমার মনে হয়েছে সিনেমাটিকে এত লম্বা না করে কিছু জায়গায় অবশ্যই বাদ দেয়া যেত। দুটি সিনেমায়ই শিবুনন্দী জুটি একটা সেম স্টোরি প্যাটার্ন রেখেছেন, যা দর্শক দেখামাত্রই ধরতে পারবেন। এটি খারাপ দিক নয়, তবে দর্শক কখনই একই জিনিস দেখতে পছন্দ করে না, এটা নির্মাতাদের মনে রাখা দরকার ছিল। তার পরও রিমেকের যুগে একটি সত্যিকারের বাংলা সিনেমা বেলাশুরু। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর স্বাতীলেখার অভিনয় দেখার জন্য হলেও সবার সিনেমাটি দেখা উচিত।