টলিউড বা তেলেগু সিনেমা ক্রমেই তাদের নিজস্ব স্বাক্ষর রাখছে বিনোদনজগতে। কিন্তু এর সূচনার পেছনে আছে এক কৃতী ব্যক্তির হাত। তিনি রাঘুপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু। ১৮৬৯ সালের আজকের দিনে, ব্রিটিশ আমলের মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) প্রেসিডেন্সির উপকূলীয় শহর মছলিপত্নমে রাঘুপতির জন্ম। সিনেমা তার চোখে কেবল বিনোদন ছিল না। তিনি সিনেমাকে দেখতেন এক ভাষা হিসেবে, যা গল্প বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তাই আজ তাকে তেলেগু সিনেমার জনক হিসেবে গণ্য করা হয়।
যৌবনের শুরুতেই নাইডু চলে যান মাদ্রাজে এবং খোলেন একটি ফটোগ্রাফি স্টুডিও। স্থিরচিত্র ছিল তার প্রথম ভালোবাসা। কিন্তু স্থিরতায় তার তৃপ্তি ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন তার ছবিগুলো প্রাণ পাবে, কথা বলবে, গল্প বলবে। সেই প্রবল ইচ্ছাই তাকে টেনে নিয়ে যায় ইউরোপীয়দের নতুন আবিষ্কার ‘মুভিং পিকচার’-এর দিকে।
প্রথমদিকে তিনি ইউরোপ ও ব্রিটেন থেকে আনা স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতেন। তিনি ভ্রমণ করেন ভারত, বার্মা ও শ্রীলংকাজুড়ে। হাতে প্রজেক্টর, সঙ্গে পর্দা—মানুষকে পরিচয় করান সিনেমার সঙ্গে এমন এক সময়ে যখন ‘চলচ্চিত্র’ শব্দটাই অচেনা ছিল।
১৯১২ সালে তার স্বপ্ন আরো বড় রূপ নেয়। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ ভারতের প্রথম ভারতীয় মালিকানাধীন সিনেমা হল—গেইটি, ক্রাউন ও গ্লোব থিয়েটার। তখন বেশির ভাগ সিনেমা হলই বিদেশী কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ছিল। নাইডুর স্থাপিত থিয়েটারগুলো ছিল সাংস্কৃতিক ও আর্থিক উভয় দিক থেকে একধরনের স্বাধীনতার ঘোষণা। এ থিয়েটারগুলোতেই ভারতীয় দর্শকরা প্রথমবার নিজেদের ভাষায়, নিজেদের গল্পে সিনেমা দেখেছিল।
এরপর তিনি সৃষ্টি করেন এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন—গ্লাস স্টুডিও।
তখনকার দিনে বৈদ্যুতিক আলো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। তাই তিনি বানালেন এমন একটি স্টুডিও, যার ছাদ ও দেয়াল কাচের, যাতে সূর্যের আলো পুরো সেটে পড়ে। এ ‘আলোর ঘর’-এ নির্মাণ হয়েছিল ভারতের প্রাচীনতম চলচ্চিত্রগুলোর অংশবিশেষ। এখানে অভিনেতা, প্রযুক্তিবিদ ও স্বপ্নবাজরা শিখেছিলেন—আলো ও ছায়ার সমন্বয়ে গল্প বলা যায়।
১৯২১ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা’ নামে একটি সিনেমা, যা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য তেলেগু নীরব চলচ্চিত্র হিসেবে। নিজের প্রতিষ্ঠিত সংস্থা স্টার অব দ্য ইস্ট ফিল্মসের ব্যানারে তৈরি হয় সিনেমাটি। মহাভারতের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমার প্রধান ভূমিকায় ছিলেন তার পুত্র রাঘুপতি সূর্যপ্রকাশ, যিনি সহপরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।
প্রায় ১২ হাজার রুপিতে নির্মিত এ সিনেমা মুক্তির পর আয় করে প্রায় ৬০ হাজার রুপি। অর্থের চেয়েও বড় ছিল এর প্রতীকী মূল্য। এটি প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় ভাষায়, ভারতীয়দের নিজস্ব প্রযুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় চলচ্চিত্র তৈরি সম্ভব।
রাঘুপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু ছিলেন একাধারে ফটোগ্রাফার, প্রদর্শক, পরিবেশক, প্রযোজক ও স্টুডিও নির্মাতা। তিনি বিদেশ থেকে আধুনিক সরঞ্জাম আনতেন, প্রজেক্টর কিনতেন এবং পরীক্ষা চালাতেন। এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে একসময় নিজের ফটোগ্রাফি স্টুডিও বন্ধক রাখেন নতুন যন্ত্র কেনার জন্য। তার কাছে সিনেমা কোনো ব্যবসা ছিল না, ছিল তার জীবনের ব্রত।
যেমন করে সময় এগোয়, সিনেমার দুনিয়াও বদলেছে। বড় কোম্পানি, বড় মূলধন, নতুন প্রযুক্তি—সবকিছুর ভিড়ে এ পথিকৃৎ ধীরে ধীরে হারিয়ে যান পেছনের সারিতে। তার থিয়েটারগুলো বিক্রি হয়, স্টুডিওর যন্ত্রপাতি হয়ে পড়ে অচল। শেষ জীবনে তিনি প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় দিন কাটান। ১৯৪১ সালে তিনি প্রয়াত হন—নিঃশব্দে, অথচ তার রেখে যাওয়া আলোর প্রভাব আজও নিভে যায়নি।
১৯৮১ সালে আন্ধ্র প্রদেশ সরকার তার অবদানকে স্বীকৃতি দেয় ‘রাঘুপতি ভেঙ্কাইয়া পুরস্কার’ প্রবর্তনের মাধ্যমে, যা আজও তেলেগু সিনেমায় আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়। ২০১৯ সালে তার জীবনীনির্ভর একটি সিনেমাও তৈরি হয়েছে তেলেগুতে। আজকের প্রতিটি তেলেগু চলচ্চিত্র, প্রতিটি স্টুডিও, প্রতিটি আলো-ছায়ার গল্পের পেছনে কোথাও না কোথাও রয়েছেন সেই মানুষটি, যিনি একদিন কাচের ছাদের নিচে সূর্যের আলোকে রূপ দিয়েছিলেন সিনেমার প্রথম ফ্রেমে।