নতুন সিনেমা মুক্তি উপলক্ষে গত মাসে দর্শকদের উদ্দেশে হলিউড তারকা রায়ান গসলিং বলেছিলেন, ‘সিনেমা হল খোলা রাখার দায়িত্ব আপনাদের নয়। সেটা আমাদের। আমাদের এমন কিছু বানাতে হবে, যাতে আপনারা হলে যেতে চান।‘
স্বাভাবিকভাবেই এ মন্তব্যে দর্শকরা হাততালি দিয়েছেন। তবে কভিড-পরবর্তী সময়ের একেবারে শুরুর দিকের কৌশলের সঙ্গে এ কথার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। তখন স্টুডিওগুলো ভাবত, মানুষকে হলে ফেরাতে হলে তাদের ‘প্রায় ধমক দিয়েই’ টিকিট কিনতে বাধ্য করতে হবে।
কিন্তু সে ধারণা ছিল মারাত্মক ভুল। দর্শকরা ‘পায়ে হেঁটে’ ভোট দিতে গেলেও ঘরে বসে নেটফ্লিক্স চালু করেছিল। এতে পর পর বড় বাজেটের সিনেমা ভরাডুবি হয়, আর যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ শতাংশ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়।
দর্শক অনাগ্রহের এ সমস্যা এতদিন ‘রিয়ার-ভিউ মিররে’ ছিল, স্ট্রিমিংয়ের উত্থানে তা হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়। আর সেই সংকট এখনো কাটেনি। ধারণা করা হচ্ছে, বড় কোনো বিপর্যয় না ঘটলে হলিউড বক্স অফিস আবার কভিড-পূর্ব স্তরে ফিরতে পারে ২০৩০ সালে।
দর্শককে খুশি করা এবং ইন্ডাস্ট্রির দায় নিজের কাঁধে নেয়া— গসলিং নতুন এ কৌশল প্রথম ব্যবহার করেন ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে। ওই সময় ‘বার্বি’ সিনেমার প্রচার করছিলেন তিনি, ১৪০ কোটি ডলার আয় করে এবং ওই বছরের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমা হয়।
মুক্তির পর চলতি বছরের বড় ওপেনিং পায় গসলিংয়ের ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’। সিনেমাটি আয় করেছে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা প্রতিদিনই বাড়ছে। তবে খুব শিগগিরই ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’কে ছাড়িয়ে যায় আন্তোইন ফুকুয়া পরিচালিত মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক ‘মাইকেল’।
‘মাইকেল’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য
‘বার্বি’সহ হিসাব করলে এ সিনেমাগুলোর মধ্যে একটা মিল আছে, এগুলো তৈরি হয়েছে ‘ভক্তদের’ জন্য। সিনেমাপ্রেমী বা সমালোচক এর লক্ষ্য হয়। দর্শকদের বলা হচ্ছে—এটা একটা ইভেন্ট, আনন্দের অভিজ্ঞতা। তাই চিন্তা-ভাবনা না করে উপভোগ করুন।
‘মাইকেল’ প্রথম সপ্তাহান্তেই বিশ্বব্যাপী ২১ কোটি ৭০ লাখ আয় করে বক্স অফিসে নতুন ইতিহাস গড়েছে। এর অর্ধেকের কাছাকাছি এসেছে উত্তর আমেরিকার স্থানীয় বাজার থেকে। পেছনে ফেলে দিয়েছে রেকর্ড করা বায়োপিক ‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’ ও ’স্ট্রেইট আউটা কম্পটন’কে। ‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’-এর প্রযোজক গ্রাহাম কিংই ‘মাইকেল’-এরও প্রযোজক। ‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’ ৯১ কোটি ১০ লাখ ডলার আয় করে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সফল সংগীত বায়োপিক।
‘মাইকেল’ আবার সবচেয়ে ব্যয়বহুল সংগীত বায়োপিক—বাজেট প্রায় ২০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৫ কোটি ডলার খরচ হয়েছে পুনরায় শুটিংয়ে। কারণ, যৌন নিপীড়নের এক অভিযোগকারীর সঙ্গে আইনি সমঝোতার কারণে সিনেমাটির শেষ দিকের এক-তৃতীয়াংশ নতুন করে বানাতে হয়। শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি ১৯৮৮ সালেই গল্প শেষ করে, এবং পরবর্তী অভিযোগগুলো এড়িয়ে যায়।
এ কারণে মুক্তির পর সমালোচকদের কাছ থেকে খুব খারাপ রিভিউ পায় সিনেমাটি। দ্য গার্ডিয়ানের পিটার ব্র্যাডশ লিখেছেন, ‘হতাশাজনকভাবে অগভীর ও প্রাণহীন ছবি।’ আর দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের আলিসা উইলকিনসন বলেন, ‘দর্শক ও বিষয়—দুই পক্ষের প্রতিই অপমানজনক।’
কিন্তু এতে কি দর্শকদের কিছু যায় আসে? তারা যখন এসব আলোচনা উপেক্ষা করে সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন, তখন বিষয়টি আরো গভীরে গিয়ে ভাবার মতো। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘মাইকেল’ শুধু একটি সংগীত বায়োপিক নয়—এটি পুরো ইন্ডাস্ট্রির নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে। সত্যতা বা নিরপেক্ষতার চেয়ে গান শোনা আর আনন্দ পাওয়াকে দর্শক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’ সিনেমার দৃশ্য
ভ্যারাইটির সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্টিভেন গেডোস বলেন, ‘ভক্তরা নাচ দেখতে, গান শুনতে যায়। গল্প বাস্তবের সঙ্গে মিলল কি-না, তা তাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
এ মন্তব্যের সঙ্গে পরিচালক কেভিন ম্যাকডোনাল্ডও একমত। তিনি বলেন, ‘দর্শকরা সত্যতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। এসব সিনেমা অনেকটাই “ফ্যান সার্ভিস”।’ তার মতে, যত বেশি ক্লিশে, যত বেশি পরিচিত গান, তত বেশি প্রভাব। উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘বোহেমিয়ান রাপসোডি’র ‘লাইভ এইড’ কনসার্টের কথা বলেন. ‘দারুণ আবেগময় ও ডুবিয়ে দেয়ার মতো ছিল।’
এখানেই একটা বড় সত্য লুকিয়ে আছে। আর তা হলো সিনেমা হল টিকে আছে, কারণ সাউন্ড সিস্টেমে গান অসাধারণ শোনায়। এ কারণেই সংগীত বায়োপিক এক ধরনের ফাঁদে আটকে গেছে। যদি দর্শক শুধু গান শুনতে চায়, তাহলে প্রযোজকদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—গানের অধিকার পাওয়া। সেটা না থাকলে সিনেমা বানানোই বৃথা। যেমন ‘আন্দ্রে ৩০০০’ বা ‘স্টারডাস্ট’ বায়োপিক ব্যর্থ হয়। কারণ এসব সিনেমায় মূল সংগীত ব্যবহারের অনুমতি ছিল না। কিন্তু এই অধিকার পেতে গেলে গল্পের নিয়ন্ত্রণও চলে যায় শিল্পী বা তাদের পরিবারের হাতে। ফলে সিনেমা হয়ে ওঠে একপক্ষীয়।
স্টিভেন গেডোস বলেন, ‘আপনি যদি পরিবার বা শিল্পীর সঙ্গে চুক্তি করেন, তাহলে তাদের সংস্করণটাই দেখাতে হবে। ফলে এগুলো প্রায়ই ভীষণ বিকৃত হয়।’
উদাহরণ হিসেবে তিনি সামনে আনেন মার্টিন স্করসেজি নির্মিত বব ডিলানের ডকুমেন্টারির। এ গায়ক নিজের বায়োপিক ‘আ কমপ্লিট আননোনে’ পুরোপুরি প্রভাব রেখেছেন। গেডোস বলেন, ‘ডিলান নিজেই স্ক্রিপ্টের প্রতিটি লাইন পড়েছেন। এটা পুরোপুরি তার নিজের গল্প।’
তবে ব্যবসায়িকভাবে সিনেমাটি সফল। ১৪ কোটি ১০ লাখ ডলার আয় করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ডিলানকে পরিচিত করে। এই সাফল্যের পর ব্রুস স্প্রিংটিনের বায়োপিক ‘ডেলিভারি মি ফ্রম নোহয়ান’ তৈরি হয়। কিন্তু এটি মাত্র ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করে, যা বাজেটের চেয়েও কম। গেডোসের মতে, ব্যর্থতার কারণ বায়োপিকের অনুমতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং সিনেমাটি বিরক্তিকর ছিল।
এদিকে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলোর প্রভাবে পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পী বা তাদের পরিবার নিজেরাই প্রযোজক হয়ে উঠছে। ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘এখন শিল্পীদের সাংবাদিক দৃষ্টিতে দেখার ধারণাই হারিয়ে গেছে।’ উদাহরণ হিসেবে প্রিন্সকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি বাতিল হওয়ার ঘটনা বলেন তিনি। কারণ সেটি তার ইমেজের ক্ষতি করতে পারত। একইভাবে ওপেরাহ উইনফ্রেকে নিয়ে ম্যাকডোনাল্ডের একটি সিরিজও এ সেলিব্রিটি প্রেজেন্টার নিজেই কিনে বন্ধ করে দেন।
গত একশ বছরে বায়োপিক সাধারণত অতিরঞ্জিত ও দুর্বল বলে পরিচিত ছিল। প্রথম বায়োপিক ‘জোয়ান অব আর্ক’ মুক্তি পায় ১৯০০ সালে। তবে ২০০০-এর পর থেকে পরিবর্তন আসে। বাস্তবতার কঠিন দিকও দেখানো শুরু হয়। জেমি ফক্স ‘রে’ সিনেমার জন্য অস্কার জেতেন, রিজ উইদারস্পুন জেতেন ‘ওয়াক দ্য লাইন’-এর জন্য।
‘এলভিস’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য
পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০০০-১৯ সালের মধ্যে অভিনয় বিভাগে ৫৫ শতাংশ অস্কার গেছে বায়োপিকে। গত চার বছরে এসেছে ৬৩টি অস্কার মনোনয়ন। তা সত্ত্বেও সেলিব্রিটিদের ‘মহিমান্বিত’ করে দেখানোর প্রবণতা আবারো ফিরে এসেছে।
বাজ লুরমানের ‘এলভিস’ মুক্তি পায় ২০২২ সালে। ২৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করা সফল সিনেমা ৮টি অস্কার মনোনয়ন পায়। পরের বছর ‘প্রিসিলা’ সিনেমায় এলভিসকে নেতিবাচকভাবে দেখান সোফিয়া কপোলা। আর সিনেমাটি মাত্র ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার আয় করে।
এটি এমন সময় হলিউডে যখন সুপারহিরো সিনেমার জনপ্রিয়তা কমছে। এখন লাইভ মিউজিকই সবচেয়ে বড় ব্যবসা। জেমস ক্যামেরন সামনে আনতে চলেছেন বিলি আইলিস থ্রিডি কনসার্ট ফিল্ম। আর ২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় করে টেইলর সুইফটের ‘ইরাস ট্যুর’ প্রমাণ করে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন সংগীতের ওপর নির্ভর করছে।
সামাজিক মাধ্যমও তারকা নির্ভরতা বাড়িয়েছে। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, এক্স—সবখানেই তারকারা নিজের ইমেজ নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বায়োপিক হয়ে উঠেছে ‘আইপি মাইনিং’, অর্থাৎ আগে থেকেই জনপ্রিয় এমন কিছু কাজে লাগানো।
স্টিভেন গেডোস বলেন, ‘মানুষ ১৮ বছর বয়সের স্মৃতিতে ফিরতে ভালোবাসে। আর হলিউড এ নস্টালজিয়া থেকে টাকা বানাতে ওস্তাদ হয়ে গেছে।’
সামনে আসছে স্যাম মেনডেসের চারটি ‘দ্য বিটলস’ সিনেমা, যার সঙ্গে জড়িত ব্র্যান্ডের দুই সদস্য রিঙ্গো স্টার ও পল ম্যাককার্টনি। প্রতিটি সদস্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা গল্প বলা হবে—যাতে পক্ষপাতের অভিযোগ কমে।
স্টিভেন গেডোস বলেন, ‘পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে মাইকেল জ্যাকসন বা বিটলসকে চেনে না। যদি কোনো সিনেমায় তাদের ১৪টা গান থাকে, তাহলে সেটি টাকা ছাপানোর লাইসেন্স।’
তাই আর কী—আরাম করুন, উপভোগ করুন। এই সিনেমাটা আপনার জন্যই!
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে