সেলিম আল দীনের ৭৬তম জন্মজয়ন্তী

জন্মেছিলেন গ্রামের মাটিতে, মৃত্যু নাটকের মঞ্চে

যেখানে বাংলা নাটকেই চলছিল পাশ্চাত্যের অনুকরণ, সেখানে সেলিম আল দীনের “চাকা” ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিওক কলেজে মঞ্চায়ন হয়েছিল। বাংলা নাটককে তিনি ঔপনিবেশিকতার কবল থেকে মুক্তি দেন।

আজ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এর জন্মদিবস। তার হাত ধরেই বাংলা নাটকের নতুন পথ খুলে গিয়েছিল। তার জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ‘সেলিম আল দীন-রবীন্দ্রনাথ মোদের শিল্পে রয়, বাঙলা নাট্যের জয়যাত্রা অনন্ত-অক্ষয়’— স্লোগানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উৎসবের পর্দা উঠছে; পর্দা নামবে আগামীকাল মঙ্গলবার।

ঠিক ৭৬ বছর আগে, ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা নাটকের নব্যধারার প্রবর্তক সেলিম আল দীন। শৈশবেই সোঁদা মাটির গন্ধ, লোককথা, বাউল গান আর মেলায় দেখা যাত্রাপালা তাকে বিমুগ্ধ করেছিল। যার ছাপ আমরা পরবর্তীতে বাংলা নাট্যমঞ্চে স্পষ্ট দেখতে পাই। পারিবারিক বাধা স্বত্ত্বেও যখন বারবার ছুটে যেতেন বাংলা সংস্কৃতির একেবারে মূলধারার শিল্পের কাছে, তখনও তিনি সেলিম আল দীন হয়ে ওঠেননি। তার পারিবারিক নাম ছিল মঈনুদ্দিন খালেদ। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি ফারসি-আরবি সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নাম রাখেন সেলিম আল দীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনার পর নাট্যবিদ্যায় উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বিদেশে পাড়ি জমান। অল্প কয়েকদিনেই ফিরে এসে বলেছিলেন- “আমার নাটক আমার মাটির গন্ধ ছাড়া পূর্ণ হবে না।”

যখন অন্যরা পাশ্চাত্যের বাস্তবধর্মী নাটকের অনুকরণে ব্যস্ত, তখন সেলিম আল দীন খুঁজে ফিরছিলেন বাংলার নিজস্ব নাট্যভাষা। ১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা থিয়েটার। এখান থেকেই মঞ্চায়িত হয় তার অনেক সাড়া জাগানো বাংলা নাটক। ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘চাকা’, ‘হাতহদাই’, ‘নিমজ্জন’, এই প্রত্যেকটি নাটকে উঠে এসেছে বাংলার চিরচেনা রূপ আর গল্প। যেখানে বাংলা নাটকেই চলছিল পাশ্চাত্যের অনুকরণ, সেখানে সেলিম আল দীনের “চাকা” ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিওক কলেজে মঞ্চায়ন হয়েছিল। বাংলা নাটককে তিনি ঔপনিবেশিকতার কবল থেকে মুক্তি দেন। বাংলা নাট্যমঞ্চে অনুবাদনির্ভর নাট্যচর্চার যে রীতি গড়ে ওঠেছিল, সেখানে তিনি প্রতিস্থাপন করেন বাংলা ভাষার মৌলিক নাটককে। শুধুমাত্র সংলাপভিত্তিক নাটক না লিখে গল্প, কবিতা, চিত্রকলা, এইসব বিভাজন ভেঙে তিনি বাংলা নাটককে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন।

১৯৮৬ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাট্যবিভাগ “নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ” প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানেই শিক্ষক হয়ে গড়ে তোলেন অসংখ্য নাট্যকর্মী। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। হল ক্যান্টিনে ছাত্রদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, খেতেন, আর বিতর্ক করতেন শিল্প আর জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পেয়েছেন বহু সম্মাননা। ১৯৮৪ সালে ‘বাংলা একাডেমী’ পুরস্কার, ২০০৭ সালে ‘একুশে পদক’ এবং চলচ্চিত্র “হুলিয়া” তে সেরা সংলাপ রচয়িতা হিসেবে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র’ পুরস্কার পেয়েছেন

২০০৮ সালের জানুয়ারির এক স্যাঁতসেঁতে সন্ধ্যায়, যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে নাটকের মহড়া চলছিল, সেই মহড়ার মাঝখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জীবনের শেষ মুহুর্তটাও মঞ্চে থেকেই বিদায় নিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন—বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের এক অমর নাম।

আজ তার জন্মদিবস উপলক্ষ্যে ‘সেলিম আল দীন-রবীন্দ্রনাথ মোদের শিল্পে রয়, বাঙলা নাট্যের জয়যাত্রা অনন্ত-অক্ষয়’— স্লোগানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উৎসবের পর্দা উঠছে; পর্দা নামবে আগামীকাল মঙ্গলবার।

আরও