মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ জীবন্ত হয়েছে যে সিনেমায়

গতকাল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নামতে হয়েছিল বাঙালিকে।

গতকাল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নামতে হয়েছিল বাঙালিকে। নয় মাসের এ মুক্তিযুদ্ধে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে। চড়া দামেই কিনতে হয়েছে স্বাধীনতা। এ গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধকে রুপালি পর্দায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয় যুদ্ধের সেই উত্তাল সময় থেকেই। যা আজও অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে দেশের গুণী নির্মাতারা চেষ্টা করেছেন জাতির সোনালি সময়টা সেলুলয়েডে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলতে। ফলে নির্মাণ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিনেমা। স্বাধীনতার জন্য বাঙালির মুক্তিযুদ্ধকে বড় পর্দায় এনেছে এমন কয়েকটি সিনেমা নিয়ে টকিজের এ আয়োজন—

জয় বাংলা: নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। বিজয় দিবসের দেড় মাসের মাথায় আসে প্রথম ঈদ। ঈদুল আজহার দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি। ওইদিন একদম নতুন সিনেমা হিসেবে মুক্তি পায় জয় বাংলা। ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সিনেমাটি। স্বাধীনতার পর প্রথম ঈদ উদযাপন হয় ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা আন্দোলনকেন্দ্রিক’ সিনেমা দিয়ে।

ফখরুল আলম পরিচালিত এ সিনেমায় অভিনয় করেন আনোয়ার হোসেন, ইনাম আহমেদ, আমিনুল হক, আতিয়া, কায়েস, আলেয়া, সিতারা, সুপ্রিয়া, আমিনুল হক বাদশা প্রমুখ।

এর চিত্রনাট্য লিখেছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার, সাহিত্যিক মাহবুব তালুকদার। জয় বাংলা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘ছবিটি মানসম্পন্ন ছিল না বলে এটা নিয়ে আলোচনাও খুব বেশি হয়নি। তবে এর একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব অবশ্যই আছে।’ ছবিতে ব্যবহূত হয়েছিল গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি। ১৯৭০ সালের জুনে সিনেমাটি সেন্সর বোর্ডে জমা পড়ে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ‘জয় বাংলা’র পক্ষে ছিলেন না। তাই ছবিটি মুক্তি পেতে দেরি হয়। ওই ঈদের আরেকটি আকর্ষণ ছিল দুই সপ্তাহ আগে মুক্তি পাওয়া মানুষের মন, যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা। মুস্তফা মেহমুদের পরিচালনায় প্রধান চরিত্রে ছিলেন ববিতা ও রাজ্জাক।

একাত্তরের যীশু:

একাত্তরের যীশু সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। শাহরিয়ার কবিরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। চলচ্চিত্রে গির্জার ফাদার চরিত্রে অভিনয় করেছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, গির্জার কেয়ারটেকার ডেসমন্ডের ভূমিকায় ছিলেন হুমায়ুুন ফরীদি। তাদের অসাধারণ সাবলীল অভিনয় দক্ষতা চলচ্চিত্রটিকে প্রাণ দিয়েছে। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন জহির উদ্দিন পিয়াল, আবুল খায়ের, কামাল বায়েজিদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, শতদল বড়ুয়া বিলু, সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল, ইউসুফ খসরুসহ আরো অনেকে। ফ্রেমে মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যায়ন নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন বেবী ইসলাম। প্রযোজনা করেছে অনুপম চিত্রায়ণ ট্রাস্ট। ছবিটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের চিত্রকেই তুলে ধরেছে সেলুলয়েডে। যীশুর মতো মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। একাত্তরের যীশু তারই উপস্থাপনা, মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছিলেন এ দেশের মানুষকে স্বাধীনতা এনে দিতে। একটা গ্রামকে কেন্দ্র করেই একাত্তরের যীশু চলচ্চিত্র তুলে এনেছে আমাদের স্বাধীনতার গল্প, আত্মত্যাগের গল্প। চলচ্চিত্রটির সংলাপ লেখার জন্য সেলিম আর দীন ১৯৯৩ সালে শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ওই বছর এডিনবার্গ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ১৯৯৪ সালে ব্রিসবেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ও লন্ডন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করে ছবিটি।

নদীর নাম মধুমতী: নদীর নাম মধুমতী সিনেমা মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। রচনা ও পরিচালনা করেছেন তানভীর মোকাম্মেল। নূর আলী নিবেদিত চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিবেশনার দায়িত্বে ছিল কিনো-আই ফিল্মস। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৌকীর আহমেদ, আলী যাকের, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সারা জাকের, আফসানা মিমি প্রমুখ। সিনেমার কাহিনী ও সংলাপ রচনার জন্য তানভীর মোকাম্মেল শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা বিভাগে এবং সাইদুর রহমান বয়াতি শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

সিনেমার গল্পে দেখা যায় মধুমতী নদীপাড়ের এক গ্রামে মোতালেব মোল্লা নামের এক জমিদার ও স্থানীয় নেতাকে। মোতালেব বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন মোতালেব পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করে। অন্যদিকে মোতালেবের সৎ সন্তান বাচ্চু মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেয়। বাচ্চু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের ভয়াবহতা দেখে কুণ্ঠিত হয়। পাশাপাশি তার বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বলে তাকে কোনো গুরুদায়িত্ব দেয়া হয় না। বাবা-সন্তানের সম্পর্কের চেয়ে দেশের প্রতি টান কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ধীরে ধীরে গল্প সেদিকে মোড় নিতে থাকে। 

জয়যাত্রা: জয়যাত্রা মুক্তি পেয়েছিল ২০০৪ সালের ১৫ নভেম্বর। আমজাদ হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে এ চলচ্চিত্রের সংলাপ ও চিত্রনাট্য লিখেছেন তৌকীর আহমেদ। চলচ্চিত্রের শুরুতেই এ দেশের হাজারটির মাঝে একটি ছোট্ট সবুজ গ্রামের ছবি এঁকেছেন চলচ্চিত্রকার। শান্তি ও সম্প্রীতির এক কোমল পরিবেশ বিরাজ করছিল সেখানে, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সাংসারিক মানুষ সুখে দিনযাপন করছিল, তরুণ-তরুণীরা একে অন্যকে ভালোবেসে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছিল। দেশের রাজনীতি কিংবা হালহকিকত নিয়ে তাদের খুব বেশি আগ্রহ না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও তাদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। সেই শান্তিপূর্ণ গ্রামটিতেই এক রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে হাজির হলো। তারা সারা গ্রাম জ্বালিয়ে দিল। অনেকে প্রাণ হারাল। এর মাঝে যারা বেঁচে গেল, তারা আশ্রয় নিল এক নৌকায়। আপন দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ভারত সীমান্ত লক্ষ্য করে চলতে শুরু করল নৌকা। এ মানুষগুলোর অসহায়তা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব এবং বিপত্সংকুল পথ অতিক্রমের যাত্রার গল্প নিয়েই নির্মাণ হয়েছে জয়যাত্রা।

এটি এক অর্থে বিশাল পরিব্যাপ্তির একটি চলচ্চিত্র। অজস্র চরিত্রের সম্মিলন ঘটিয়ে চলচ্চিত্রকার এখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোয় সব শ্রেণীর মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষাকে যথার্থ প্রতিফলনের চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে যুদ্ধকালীন মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বিশ্বাসের ক্রমপরিবর্তন ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এ চলচ্চিত্রে প্রাধান্য পেয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যেই তাই অনুভূত হয় একেকটি মানুষের নিজস্ব গল্প, হারানোর গল্প, বেদনার গল্প। তার এ নির্মাণ প্রচেষ্টার কাহিনী কেন্দ্র সম্পর্কে তৌকীর বলেছেন, সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বিপাশা হায়াত, আজিজুল হাকিম, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ুুন ফরীদি, তারিক আনাম খান, আবুল হায়াত, মেহবুবা মাহনূর প্রমুখ।

অনিল বাগচীর একদিন: কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস ‘অনিল বাগচীর একদিন’ থেকে এ নামেই সিনেমাটা তৈরি করেন নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। ২০১৫ সালে এটি মুক্তি পায়। যদিও উপন্যাসটির রচনাকাল ছিল ১৯৯২। সেই বইমেলায় উপন্যাসটি এতই জনপ্রিয় হয় যে বইমেলা চলাকালীনই দ্বিতীয় মুদ্রণ বের হয়েছিল। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নাম অনিল বাগচী। স্কুলশিক্ষক বাবা আর বোন ছাড়া তার কেউ নেই। সে ঢাকায় একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করার কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকে। ১৯৭১-এর অগ্নিঝরা একটি দিনে অনিল একটি চিঠি পায়। পাকিস্তানি বাহিনী তার বাবাকে হত্যা করেছে। বাবার মৃত্যু তার মনোজগতে পরিবর্তন ঘটায়। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে সে রওনা হয় টাঙ্গাইলের উদ্দেশে নিজের বোনের দায়িত্ব নেয়ার জন্য। বাসের সহযাত্রী আইয়ুব আলী তাকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো আপন করে নেয়। জীবন বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলার অনুরোধ করে কিন্তু অনিল পিতার দেয়া শিক্ষার অন্যথা হতে দিতে চায় না। ভীতু অনিলের কাছেও মৃত্যুভয় হাস্যকর হয়ে ওঠে। অনিলের মতো আজন্ম ভীতুকেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বুলেটের সামনে দাঁড়ানোর মতো বিরাট বিপ্লবী করে তোলে তার নিজের জায়গা থেকে। এমন গল্প নিয়েই এগিয়েছে সিনেমাটি।

যুদ্ধের পটভূমি কিন্তু যুদ্ধ নেই; বরং মানবিক গল্প, মূল্যবোধই সেখানে পেয়েছে প্রাধান্য। পরিচালক গল্পটির মূল চরিত্র অনিলের মতো একেবারেই সহজ-সরল চিত্রবিন্যাসের মাধ্যমে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের চিত্রিক বয়ান করেছেন যেন।

পরিচালক এ চলচ্চিত্রে বাস্তবতাকে দেখিয়েছেন সাদা-কালো। আর কল্পনার রঙ দেখিয়েছেন রঙিন। মোরশেদুল ইসলাম ছবিটির জন্য যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরেফ সৈয়দ, গাজী রাকায়েত, তৌফিক ইমন, জ্যোতিকা জ্যোতি, ফারহানা মিঠু, মিশা সওদাগর।

আরও