সিনেমার কলাকুশলীদের বলা হয় ‘শিল্পী’। সে হিসেবে সিনেমা অবশ্যই ‘শিল্প’। শিল্পের সংজ্ঞা নানাভাবে দেয়া যায়। অনেকে দিয়েছেনও। দার্শনিক ফ্রেডরিক হেগেল বলেছেন, ভাবনার নিরেট উপস্থাপনাই শিল্প। আপনি যা ভাবলেন, সেটাকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে পারাটাই শিল্প। আরআরআর সিনেমার ক্ষেত্রে রাজামৌলির ভাবনা জানার সুযোগ নেই। সেটা কেবল তিনিই জানেন। তার পরও সিনেমাটা দেখার পর দর্শকের মনে হবে, রাজামৌলি তার ভাবনার সর্বোচ্চ কাছে যেতে এক চুলও ছাড় দেননি।
সিনেমার ক্ষেত্রে শিল্পের সঙ্গে বাণিজ্যের বিরোধ যুদ্ধের সঙ্গে শান্তির বিরোধের মতোই। তার পরও বিশ্বনেতারা যেমন শান্তির জন্য যুদ্ধ অবতারণা করেন; রাজামৌলি তেমন শিল্প দিয়ে বাণিজ্য করতে ওস্তাদ। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, শিল্প খুবই কঠিন এক বাণিজ্য। তাহলে সিনেমা কী? এ প্রশ্নের উত্তরও প্রস্তুত উপমহাদেশের বিখ্যাত এ নির্মাতার কাছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, শিল্প খুবই কঠিন এক বাণিজ্য; সিনেমা হলো শিল্প ও বাণিজ্যের সমন্বয়। কথা তো সত্য। আমাদের দেশে যারা আর্ট ফিল্ম বানান তারাও সেটা মুক্তি দেন সিনেমা হলে। লগ্নীকৃত টাকা তুলে কীভাবে লাভ গোনা যায় সে চিন্তায় সিনেমার প্রচার-প্রসারে সময় ও অর্থ ব্যয় করেন। ওটিটি কিংবা টেলিভিশনে সেই শিল্প বিক্রিও করে দেন। তার পরও শিল্পনির্ভর সিনেমার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয় বাণিজ্যিক সিনেমাকে। অথচ দুই জনরার সিনেমা বানাতেই অর্থ লগ্নি করতে হয়। বাণিজ্য করতে হয়।
তাই আমাদের দেশে সিনেমার জনরা দাঁড়িয়ে গেছে ভিন্ন এক সংজ্ঞার ওপর। ব্যবসা করতে পারলে সেটা বাণিজ্যিক সিনেমা, করতে না পারলে শিল্পনির্ভর সিনেমা। বাণিজ্যিক সিনেমায়ও শিল্পী কাজ করেন, বাণিজ্যিক সিনেমায়ও নির্মাতাকে চিন্তার কাছাকাছি যেতে হয়, সেই চিন্তা কেউ করেন না।
এজন্যই মনে হয় আমাদের প্রধান সংকট প্রযোজক/নির্মাতাদের ভাবনায়। তারাও তাদের ভাবনা অনুযায়ী দর্শকদের দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছেন। যে কারণে শিল্পনির্ভর সিনেমার দর্শকরা বাণিজ্যিক সিনেমা দেখছে না। বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শকরা দেখছে না শিল্পনির্ভর সিনেমা।
নির্মাতাদের চিন্তার সংকীর্ণতা ভাঙার চেষ্টা করেছেন শ্রীসাইলা শ্রী রাজামৌলি। বাহুবলী সিরিজের দুই সিনেমায় যেমন তুলে এনেছেন উপমহাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি, তেমনি ব্যবসা করেছেন হাজার কোটি রুপি। মনে হয় রাজামৌলিকে পড়লে শিল্প, বাণিজ্য ও সিনেমার সংজ্ঞা আলাদা করে পড়ার দরকারই পড়ে না।
অন্য অনেক শিল্পের সঙ্গে চলচ্চিত্রের বিস্তর ফারাক। চলচ্চিত্র একটি সংঘবদ্ধ চিন্তার ফসল। লেখক বা পরিচালক শুধু গল্পটাই ভাবতে পারেন। সেই গল্প কতটা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হবে সেটা নির্ভর করে অনেকের ওপর। বাহুবলী, পুষ্পা, কেজিএফ কিংবা আরআরআরের মতো বড় আয়োজনের সিনেমার ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় প্রায় এক গ্রাম মানুষের ওপর। সেট, আলো, পোশাক, সংলাপ, দৃশ্যধারণ ও অভিনয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের পুরোটা ঢেলে দিতে হয়। কোনো এক ক্ষেত্রে ৫০ জনের একটা দল কাজ করলে ৫০ জনকেই হতে হয় শতভাগ দক্ষ ও মনোযোগী।
এমন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষের দক্ষতা ও পরিশ্রমের ফসল আরআরআর। সিনেমায় মেধা ও শ্রমের পুরোটা দিলে সিনেমাও যে দুই হাত ভরে দেয় তার উদাহরণ বক্স অফিস। আরআরআর এরই মধ্যে আয় করেছে হাজার কোটি রুপি।
দক্ষিণ ভারতের সিনেমা কেমন হতে পারে, তাদের শিল্পবোধ ও শিল্প প্রকাশভঙ্গি মাথায় নিয়ে দেখতে বসলে ৩ ঘণ্টার সিনেমায় দর্শকের নিরাশ হওয়ার কোনো জায়গা নেই। রাজামৌলির কাজের বিষয়ে যাদের ধারণা আছে তারা নিশ্চয়ই যুক্তি আর বিজ্ঞানকে পাশে রেখে আরআরআর দেখতে বসবে।
সিনেমার গল্পটা ১৯২০ সালের। সেভাবেই সাজানো হয়েছে শিল্পীদের পোশাক, চেহারা ও সেট। ব্রিটিশরাজ ও নিজাম অব হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের লড়াইয়ের গল্প আরআরআর। এ গল্পে বিশেষ কিছু নেই। ভারতীয় দর্শকদের জন্য প্রায় চেনা-জানা একটি গল্প। তবে পরিবর্তনের পালাবদল, অন্যায়ের চোখে চোখ রেখে ন্যায়ের লড়াই পর্দায় আটকে রাখে দর্শককে। গল্প এগিয়েছে রাম আর ভীম নামের দুই বন্ধুকে নিয়ে। বন্ধুত্বের বাইরেও তাদের জীবনের নানা ঘটনা অবধারিতভাবেই সামনে চলে এসেছে। গল্পের গতি আর অভিনয় প্রায় প্রতিটি ফ্রেমকে করেছে অর্থবহ। বিশেষ করে রামচরণ ও এনটিআর জুনিয়রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী অলিভিয়া মরিস ও ভারতীয় অভিনেত্রী আলিয়া ভাট। যদিও আলিয়া ভাট পর্দায় খুব কম সময়ের জন্য ছিলেন। যতটুকু ছিলেন ততটুকু সময়কে করেছেন অর্থবহ। চোখের আরাম ছিল রামচরণ আর রামা রাওয়ের রসায়ন। সব মিলিয়ে বাহুবলীর মতো আরআরআর বারবার দেখার মতো একটি সিনেমা হয়ে উঠেছে।