রণবীর সিং বিতর্কে ফের আলোচনায় বলিউডের ‘নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতি’

রণবীর সিং বিতর্ক আবারো প্রশ্ন তুলেছে—বলিউডে ‘নিষেধাজ্ঞা’ কি সত্যিই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা, নাকি এটি ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর একটি উপায়? পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, প্রথম সারির কোনো তারকাকে নিষিদ্ধ করা মানে শুধু একজন অভিনেতার ক্ষতি নয়, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের জীবিকার ওপরও আঘাত

‘ডন থ্রি’ থেকে সরে দাঁড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের মুখে রণবীর সিং। সেই সঙ্গে আবারো আলোচনায় এসেছে বলিউডের ‘নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতি’ বা অঘোষিত অসহযোগিতার বিষয়টি। অতীতে অনেক তারকা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে, কখনো আবার পরোক্ষভাবে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ফেডারেশন অব ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ (এফডব্লিউআইসিই) বলিউডের বিভিন্ন সংস্থাকে অনুরোধ জানিয়েছে, আপাতত যেন রণবীর সিংহের সঙ্গে কাজ না করে তারা। অভিযোগ, পরিচালক ফরহান আখতারের ‘ডন থ্রি’র জন্য চুক্তিপত্রে সই করার পরও তিনি প্রকল্পটি ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার ক্ষতি হয়েছে।

রণবীরকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই সামনে আসছে বলিউডে ‘নিষেধাজ্ঞা’ বা অঘোষিত অসহযোগিতার একাধিক পুরোনো উদাহরণ। সম্প্রতি এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।

বলিউড ক্যারিয়ারের শুরুতে বড় একটি প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করলেও পরে তাদের কোনো ছবিতে দেখা যায়নি অভিনেত্রী শ্রদ্ধা কাপুরকে। ‘স্ত্রী’ ও ‘স্ত্রী ২’-এর মতো সফল ছবি উপহার দেয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তার আর কাজ হয়নি। যদিও এক সাক্ষাৎকারে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালোই রয়েছে।

কার্তিক আরিয়ানের ক্ষেত্রেও কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তবে করণ জোহরের ‘দোস্তানা টু’ থেকে বাদ পড়ার পর তিনি অঘোষিতভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন ইন্ডাস্ট্রিতে। অবশ্য পরে ধর্ম প্রোডাকশনসের সঙ্গে কার্তিকের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। প্রতিষ্ঠানটির ‘তু মেরি ম্যায় তেরা, ম্যায় তেরা তু মেরি’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। তবে ছবিটি বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। কার্তিকের কিছু অনুরাগীর অভিযোগ, তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল চিত্রনাট্যের ছবিতে যুক্ত করা হয়েছিল।

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর বলিউডে স্বজনপ্রীতি ও অঘোষিত বয়কট নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন মহলে দাবি ওঠে, কিছু প্রভাবশালী প্রযোজনা সংস্থা পেশাগত মতবিরোধের কারণে তাকে নতুন প্রকল্প থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। শোনা যায়, একের পর এক ছবি থেকে বাদ পড়ায় তিনি ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়েছিলেন।

একসময় বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও বক্স অফিস-সফল অভিনেতা ছিলেন গোবিন্দ। কিন্তু শুটিংয়ে নিয়মিত দেরি করে পৌঁছানো এবং পরিচালক ডেভিড ধাওয়ানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে ধীরে ধীরে অনেক প্রযোজক ও পরিচালক তার সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেন। ২০০৯-১০ সালের পর থেকে তার কাজের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কখনও মন্তব্য করেননি গোবিন্দ।

২০০৩ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে সালমান খানের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়ার অভিযোগ আনেন বিবেক ওবেরয়। ওই ঘটনার পর তার কর্মজীবনে বড় ধরনের ধাক্কা আসে। বলিউডে দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা প্রচলিত যে, সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় অনেক প্রযোজক ও পরিচালক বিবেকের সঙ্গে কাজ করা এড়িয়ে চলতে শুরু করেছিলেন। ‘সাথিয়া’ ও ‘কোম্পানি’র মতো সফল ছবির পরও ধীরে ধীরে মূলধারার বলিউড থেকে দূরে সরে যান তিনি।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে চাঙ্কি পাণ্ডে জানান, তিনিও একসময় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে ‘আগ হি আগ’ ছবির শুটিং চলাকালে পুরো ইন্ডাস্ট্রিতে ধর্মঘট চলছিল। কিন্তু ছবিটির শুটিং বন্ধ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। চাঙ্কির ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তাকে প্রায় এক সপ্তাহের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে একই ছবিতে থাকা ধর্মেন্দ্র ও শত্রুঘ্ন সিনহার মতো তারকাদের বিরুদ্ধে তেমন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

২০১৬ সালে উরি সেনাঘাঁটিতে হামলার পর পাকিস্তানি শিল্পীদের ওপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে বলিউডে কাজের সুযোগ হারান পাকিস্তানি অভিনেতা ফওয়াদ খান ও মাহিরা খান। ‘খুবসুরত’, ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’ ও ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’-এ অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পাওয়া ফওয়াদ খানের ২০২৫ সালে বলিউডে ফেরার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পহেলগাম হামলার পর পাকিস্তানি শিল্পীদের নিয়ে বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিলে সেই সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। মাহিরা খানও একই কারণে বলিউডে আর কাজের সুযোগ পাননি। শাহরুখ খানের বিপরীতে ‘রইস’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।

রণবীর সিং বিতর্ক আবারো প্রশ্ন তুলেছে—বলিউডে ‘নিষেধাজ্ঞা’ কি সত্যিই কার্যকর কোনো ব্যবস্থা, নাকি এটি ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর একটি উপায়? পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, প্রথম সারির কোনো তারকাকে নিষিদ্ধ করা মানে শুধু একজন অভিনেতার ক্ষতি নয়, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের জীবিকার ওপরও আঘাত। সম্ভবত সে কারণেই বিতর্ক সত্ত্বেও রণবীর থেমে থাকেননি। তিনি এরই মধ্যে পরবর্তী ছবি ‘প্রলয়’-এর কাজ শুরু করেছেন।

আরও