বর্তমানে ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত মুখ চিত্রনায়ক জায়েদ খান ও চিত্রনায়িকা নিপুণ আকতার। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নির্বাচনে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সাধারণ সম্পাদক পদে। নির্বাচন শেষ হয়েছে ১১ দিন হলো। এতদিনে নির্বাচনের আবহ স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত আলোচনার জন্ম দিচ্ছে এ নির্বাচন। জায়েদ-নিপুণকে নিয়ে আলোচনা এখন আর এফডিসির গণ্ডিতে আটকে নেই। সামাজিক যোগাযোগ ও ভিডিও শেয়ারিং মাধ্যম থেকে ছড়িয়ে গেছে পাড়ার চায়ের দোকান পর্যন্ত। বন্ধুদের আড্ডায় আলোচনার বিষয় এই দুজন। কে জিতবেন শেষ পর্যন্ত, কে বসবেন সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে, সেই সিদ্ধান্ত এখন হাইকোর্টের হাতে। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত আপিল বিভাগের দেয়া রায় বাতিল চেয়ে রিট করেছেন জায়েদ খান। পাল্টা আপিল করেছেন নিপুণ। নির্বাচন কমিশনের আপিল বোর্ডের মতে, সাধারণ সম্পাদক নিপুণ আকতার। হাইকোর্টের রায় মতে, সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান। এসব ঘটনায় দুই তারকাকে শিরোনামের আড়াল হতে দিচ্ছে না গণমাধ্যম। এমন অবস্থায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছেন তাদের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার নিয়ে।
নাসরিন আকতার নিপুণের চলচ্চিত্রে যাত্রা হয় ২০০৬ সালে, রত্নগর্ভা সিনেমার মাধ্যমে। নায়ক মান্নার বিপরীতে অভিষেক হয় নিপুণের। যদিও রত্নগর্ভা এখনো মুক্তি পায়নি। প্রথম সিনেমা হোঁচট খেলেও হোঁচট খায়নি নিপুণের ক্যারিয়ার। একই বছরে নায়ক শাকিব খান, অপু বিশ্বাস, আমিন খানের সঙ্গে করেন পিতার আসন সিনেমা। পিতার আসন সে সময় ব্যবসাসফল সিনেমার তকমা পায়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি নিপুণকে। সে সময়ের সুপারহিট নায়ক মান্না, শাকিব খান, আমিন খান, রিয়াজ, ফেরদৌসদের সঙ্গে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন। প্রতি বছর তিন-চারটি করে সিনেমা মুক্তি পেতে শুরু করে। অভিষেকের চতুর্থ বছর ২০০৯ সালে মুক্তি পায় নয়টি সিনেমা। মহম্মদ হান্নান, দেবাশীষ বিশ্বাস, সোহেল রানা, স্বপন চৌধুরী, এজে রানাদের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেন। নিপুণ কাজ করেছেন কাজী হায়াত, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, শাহ আলম কিরণ, তৌকীর আহমেদ, মোহাম্মদ হোসেন জেমির মতো হিটমেকারদের পরিচালনায়। চলচ্চিত্র যাত্রার দ্বিতীয় বছরেই আসে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাজঘর সিনেমার জন্য সেরা পার্শ্বচরিত্রে এ পুরস্কার পান। ২০০৯ সালে চাঁদের মতো বউ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য একই বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এ অভিনেত্রী। উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১৫ সালে নিপুণের ১০টি সিনেমা মুক্তি পায়। এরপর অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে যান নিপুণ। ২০১৬ সালে তৌকীর আহমেদের আলোচিত চলচ্চিত্র অজ্ঞাতনামায় বিদেশ গমনেচ্ছু বিধবার চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান। এ নায়িকার সর্বশেষ সিনেমা মুক্তি পায় ২০১৮ সালে। মাঝে সিনেমা কমিয়ে মনোযোগ দেন ব্যবসায়। পার্লার ব্যবসায়ও বেশ নাম কামিয়েছেন এ অভিনেত্রী। গত বছর মনোলোক নামের একটি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হন ৫৫-এর অধিক সিনেমায় অভিনয় করা এ শিল্পী। সিনেমা থেকে সম্মানী বাবদ ১ টাকা নিয়ে আবার আলোচনায় চলে আসেন। তবে অতীতের সব আলোচনা ছাপিয়ে গেছে শিল্পী সমিতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কার্যনির্বাহী পদে নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন। এ বছর নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়ে যত না আলোচনায় এসেছেন, তার চেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন তার প্যানেলের সভাপতি পদে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে দাঁড় করিয়ে। গত ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে জায়েদ খানের কাছে হেরে গেলে এ নায়কের বিরুদ্ধে ভোট কেনাসহ বেশকিছু অভিযোগ এনে আপিল বিভাগে আপিল করেন। তার আপিলের পরিপ্র্রেক্ষিতে বাতিল হয় জায়েদ খানের প্রার্থিতা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয় এ নায়িকাকে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে নিপুণ পড়তে যান রাশিয়ায়।
অন্যদিকে চিত্রনায়ক জায়েদ খানের চলচ্চিত্র যাত্রা নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি আয়োজিত এ রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র পেয়েছে মান্না, দিতি, মিশা সওদাগর, অমিত হাসান, আমিন খানের মতো শিল্পীদের। জায়েদের চলচ্চিত্র যাত্রা ২০০৮ সালে, মহম্মদ হান্নানের পরিচালনায় ভালোবাসা ভালোবাসা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এ সিনেমায় আরো অভিনয় করেন রিয়াজ ও শাবনূর। পরের বছর মনতাজুর রহমান আকবরের কাজের মানুষ ও মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের মন ছুঁয়েছে মন সিনেমায় অভিনয় করেন। ২০১০ সালে এফআই মানিকের পরিচালনায় অভিনয় করেন আমার স্বপ্ন আমার সংসার সিনেমায়। একই বছর জায়েদ অভিনীত আরেক হিটমেকার মনতাজুর রহমান আকবরের পারিচালনায় মায়ের চোখ ও রিকশাওয়ালার ছেলে ছবি মুক্তি পায়।
জায়েদ খান প্রধান অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন ২০১২ সালে, এমএম সরকারের পরিচালনায় আত্মগোপন চলচ্চিত্রে। ২০১৪ সালে জায়েদের পাঁচটি সিনেমা মুক্তি পায়। মাশরুর পারভেজ ও আকিব পারভেজের যৌথ পরিচালনার অদৃশ্য শত্রু, রকিবুল আলম রকিবের প্রেম করবো তোমার সাথে, আজাদ খানের দাবাং, মনতাজুর রহমান আকবরের মাই নেম ইজ সিমি ও রাজু চৌধুরীর তোকে ভালোবাসতেই হবে মুক্তি পায় এ বছর। ২০১৫ সালে তিনি শাহ আলম মন্ডল পরিচালিত ভালোবাসা সীমাহীন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। একই বছর তিনি রকিবুল আলম রকিব পরিচালিত নগর মাস্তান ছবিতে কাজ করেন। এ বছর তার বিপরীতে ছিলেন পরীমনি। ব্যবসাসফল সিনেমার নির্মাতা মালেক আফসারী জায়েদ খানকে নিয়ে নির্মাণ করেন অন্তর জ্বালা, ২০১৭ সালে। ছবিটি প্রযোজনা করেন জায়েদ খান নিজেই। ২০২১ সালের শুরুতে মুক্তি পায় এ দেশ তোমার আমার। গত বছরের শেষ দিকে সোনার চর নামে একটি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। এটি পরিচালনা করছেন জাহিদ হোসেন।
সংগঠক হিসেবে জায়েদ খান বেশ পরিচিত। ২০১৭ সালে দুই বছরের জন্য শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তার জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও। ২০২২ সালের নির্বাচনে তাকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রথমে ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী সময়ে ফলাফল ঘোষণার কয়েকদিন পর তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। প্রার্থিতা বাতিলের জন্য আপিল করেন চিত্রনায়িকা নিপুণ আকতার। জায়েদ খান ও নিপুণ আকতার জুটি বেঁধে অভিনয়ও করেছেন। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর একত্রে অভিনয় করা দৃশ্যগুলো এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।