মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা, সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ

আমাদের জাতীয় জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশকে পাওয়া। একটি জাতির দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম নিশ্চয় একটি মহাকাব্য। এ মহাকাব্য রুপালি পর্দায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয় সেই ১৯৭২ থেকেই, যা আজও চলমান।

আমাদের জাতীয় জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশকে পাওয়া। একটি জাতির দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম নিশ্চয় একটি মহাকাব্য। এ মহাকাব্য রুপালি পর্দায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয় সেই ১৯৭২ থেকেই, যা আজও চলমান। বিভিন্ন সময় মেধাবী নির্মাতারা এগিয়ে এসেছেন জাতির সোনালি সময়টা সেলুলয়েডে জীবন্ত করার স্বপ্নে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু সিনেমা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এমন কয়েকটি সিনেমা নিয়েই বণিক বার্তার এ আয়োজন—

ওরা ১১ জন

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। যুদ্ধের পর পরই এর কাজ শুরু হয়। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এটি নির্মাণ করেন। ছবির প্রযোজক ছিলেন মাসুদ পারভেজ, যাকে আমরা সোহেল রানা বলে জানি। ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি দৃশ্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কিছু দৃশ্যও অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া ‘ওরা ১১ জন’-এর ১০ জনই ছিলেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। ছবিতে অভিনয় করেছিল খসরু, রাজ্জাক, মুরাদ, হেলাল, নান্টু, আলতাফ, শাবানা, নূতন, হাসান ইমাম, খলিল, এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং ফিরে আসার মতো ভাগ্য নিয়ে চরিত্রটি তৈরি। বীরাঙ্গনা চরিত্রে নূতনের অভিনয় এবং রাজাকারের চরিত্রে এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। ছবিটি ১৯৭২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

ধীরে বহে মেঘনা

১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ধীরে বহে মেঘনা। ফিচার ফিল্মটির নির্মাতা আলমগীর কবির। ২০০২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র তালিকায় অষ্টম অবস্থানে ছিল ছবিটি। ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা তুলে ধরার পাশাপাশি শিল্পমানেও উন্নত। এতে অভিনয় করেন ববিতা, হাসু ব্যানার্জী, গোলাম মোস্তফা, খলিল প্রমুখ। এ সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন জহির রায়হান। ধীরে বহে মেঘনা ছবিতে গান লিখেছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং সুরারোপ করেছেন সমর দাস। সংগীত পরিচালনা করেছেন সত্য সাহা। এ চলচ্চিত্রে দুটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। দুই কিংবদন্তির গান সিনেমাটিকে অন্য মর্যাদায় নিয়ে গেছে। প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশ ফিল্মস ইন্টারন্যাশনাল এবং পরিবেশনা করেছে স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশন। চিত্রগ্রহণ করেছেন অরুণ রায়, এমএ মোবিন ও কমল নায়েক।

সংগ্রাম

১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় সংগ্রাম। পরিচালনা করেন চাষী নজরুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, এটাই তার নির্মিত সেরা ছবি। এ ছবিতে মুক্তিযুদ্ধে অপারেশন ও মহড়ার সরেজমিন দৃশ্য দেখানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রক্রিয়াগুলো ছবিতে দেখানো হয়েছে, যাতে সে সময় সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পাওয়া যায়। একদল দামাল ছেলের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠা, মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের বাস্তবতা, পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নারীদের বন্দি অবস্থা, কৌশলে তাদের পরাস্ত করা সিনেমার মূল উপজীব্য। কাঁটাতারে মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ ঝুলে থাকার একটি মর্মস্পর্শী দৃশ্য আছে। ছবির একটি দৃশ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তাকে রাজি করানো হয়েছিল। ঢাকার পিলখানায় সেই দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্যালুট নেবেন আর খসরুসহ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা তাকে স্যালুট দেবে এটাই ছিল দৃশ্য। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির জন্য ছবিটি বিশেষত্ব পেয়েছে। অভিনয়ে খসরু, সুচন্দা, নূতন, ফারুক, হাসান ইমাম, দারাশিকো, খলিল প্রমুখ।

মেঘের অনেক রঙ

১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম রঙিন ছবি। পরিচালক হারুনর রশীদ। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত এক নারী তার ছেলেকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে নিজে আত্মহত্যা করে। বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ডাক্তার। ছেলেকে নিয়ে বাবার নতুন জীবন শুরু হলে দ্বিতীয় স্ত্রী তা মানতে পারে না। ভুল বোঝাবুঝি হলে ছেলে চলে যেতে চায়। রত্না কথাচিত্রের ব্যানারে চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেছেন আনোয়ার আশরাফ ও শাজীদা শামীম। এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাথিন, ওমর এলাহী, রওশন আরা, আদনান প্রমুখ। মেঘের অনেক রঙ ছবির নির্মাতা হারুনর রশীদ প্রধান নারী চরিত্রে একজন পাহাড়ি মেয়ে সন্ধান করছিলেন। মাথিন তখন রাঙ্গামাটিতে নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার মেসো রশীদকে মাথিনের কাজের মহড়ায় নিয়ে আসেন। রশীদ তার কাজ দেখে তাকে এ ছবির জন্য নির্বাচন করেন। শিশুশিল্পীর ভূমিকায় আদনানের অভিনয় প্রশংসা পায়। শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর জাতীয় পুরস্কার জেতে আদনান। মোট পাঁচটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতে মেঘের অনেক রঙ সিনেমাটি।

আগুনের পরশমণি

১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় সিনেমাটি। পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ। তার লেখা উপন্যাস থেকে একই নামে ছবিটি নির্মাণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে এক সরকারি কর্মকর্তার বাড়িতে অবরুদ্ধ পরিবারের গল্প নিয়ে ছবির কাহিনী। সেখানে একসময় একজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আসে এবং ছবির গল্প অসাধারণভাবে বদলে যায়। মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূরের অভিনয় চোখে লেগে থাকার মতো। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল হায়াত, বিপাশা হায়াত, শিলা আহমেদ, ডলি জহুর, পুতুল, মোজাম্মেল হোসেন, দিলারা জামান, সালেহ আহমেদ প্রমুখ। সবার অভিনয়ই প্রশংসিত হয়। ছবির নির্মাণ ছিল নিখুঁত। সাসপেন্স ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের যথাযথ ব্যবহার সিনেমাটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল আগুনের পরশমণি। কলকাতায় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ২০১১ সালে।

হাঙর নদী গ্রেনেড

১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেরা ছবিটি। এ ছবিরও পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম। সেলিনা হোসেনের উপন্যাস থেকে একই নামে নির্মিত এ ছবি। যশোরের এক মায়ের জীবনের সত্য ঘটনায় উপন্যাসটি লেখা হয়। সত্যজিৎ রায় একবার চিঠিতে সেলিনা হোসেনের এ উপন্যাসের প্রশংসা করেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বলেন। একজন মায়ের জীবনকালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিজের সন্তানকে মুক্তিযোদ্ধার জন্য বিসর্জন দেয়াই ছিল গল্প। মায়ের ভূমিকায় সুচরিতা অনবদ্য অভিনয় করেন এবং চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা মনে করেন এটাই সুচরিতার সেরা ছবি। প্রতিবন্ধী ছেলের ভূমিকায় বিজয় চৌধুরীও অসাধারণ অভিনয় করেন। অন্যান্য চরিত্রে সোহেল রানা, শর্মিলী আহমেদ, দোদুল, অন্তরা, মিজু আহমেদ সবাই ছিলেন চমত্কার। ছবিটি সে বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। শ্রেষ্ঠ পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম, অভিনেত্রী সুচরিতা, শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসেবে সেলিনা হোসেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

মাটির ময়না

ছবিটি ২০০২ সালে মুক্তি পায়। পরিচালক তারেক মাসুদ। আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিপ্রাপ্ত ও প্রশংসিত হয় ছবিটি। অভিনয় করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রোকেয়া প্রাচী, নুরুল ইসলাম বাবলু, রাসেল ফরাজী। ছবিটি পরিচালকের নিজের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নির্মাণ করেন। আনু চরিত্রের ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়ার সময় সেখানে মধ্যমপন্থী সুবিধাবাদী অবস্থানের মানুষকে দেখে। একইভাবে বাড়িতে বাবা ও মায়ের ভিন্ন মতাদর্শ দেখা দেয়। বাবা জয়ন্ত গোঁড়া ধর্মীয় চেতনায় অটল আর স্ত্রী রোকেয়া প্রাচী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সেন্সর বোর্ড ছবিটিকে বিতর্কিত ঘোষণা করে, মামলা পর্যন্ত হয়। পরে আদালতের রায়ে ছবিটি প্রদর্শিত হয়। অস্কারের জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীত এটি প্রথম ছবি ছিল।

গেরিলা

২০১১ সালে নির্মিত ছবি। কারিগরি দিক থেকে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের সেরা ছবি। পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ। মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা বাহিনীর ভূমিকার পাশাপাশি অনেক বাস্তবতা দেখানো হয়েছে। রাজাকারদের পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ধর্ষণ, লুটপাট, জবাইয়ের মতো অনেক অপকর্ম ছবিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জয়া আহসান, এটিএম শামসুজ্জামান, শতাব্দী ওয়াদুদ অসাধারণ অভিনয় করেছেন। ছবিটি ১০টি শাখায় জাতীয় পুরস্কার পায়।

আমার বন্ধু রাশেদ

ছবিটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে। পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম। মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস থেকে নির্মিত ছবিটি। মুক্তিযুদ্ধে এক সাহসী ছাত্রের ভূমিকা নিয়ে ছবির কাহিনী। ছাত্রটির কিশোরবেলার বন্ধুর বয়ানে ছবিটি এগিয়ে যায়। যেখানে তার ছেলের কাছে তার বন্ধু রাশেদের গল্প শোনানো হচ্ছে। মূল চরিত্রে

চৌধুরী জাওয়াতা আফনান। অন্যান্য চরিত্রে আসাদ, ড. ইনামুল হক, হোমায়রা হিমু, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ওয়াহিদা মল্লিক জলি প্রমুখ।

লাল মোরগের ঝুঁটি

সরকারি অনুদানে নির্মিত ছবিটি ২০১৬ সালে কাজ শুরু হলেও মুক্তি পায় ২০২১ সালে। পরিচালক নূরুল আলম আতিক। ছবিটি বর্তমানে স্টারসিনেপ্লেক্সসহ ঢাকার ছয়টি হলে প্রদর্শিত হচ্ছে। শনিবার থেকে চট্টগ্রামেও প্রদর্শিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বসবাসরত মানুষের সামগ্রিক জীবন ও সংগ্রামকে বিভিন্ন ন্যারেটিভের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ছবির নির্মাণ ও অন্যান্য কারিগরি দিক নিয়ে প্রশংসা করছেন অনেকেই। লাল মোরগের ঝুঁটি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র হিসেবে কতদূর যাবে তা বলার জন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।

আরও