বাংলা চলচ্চিত্র জগতের আলোর রোশনাই

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সালমান শাহর আয়ু শেষ হয়েছিল।

‘সময়ের হাত এসে মুছে ফেলে আর সব—

নক্ষত্রেরও আয়ু শেষ হয়!’

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। এদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সালমান শাহর আয়ু শেষ হয়েছিল। তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয় রাজধানী ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে। তার মৃত্যু রহস্যের জট আজও খোলেনি। তার মৃত্যুকে ঘিরে প্রচলিত সব কথার শেষে দীর্ঘশ্বাসে বেরিয়ে আসে জীবনানন্দ দাশের লেখা ওপরের ওই দুই লাইন। দেখতে দেখতে ২৮ বছর পেরিয়ে গেল বাংলা চলচ্চিত্র জগতে তাকে ঘিরে থাকা শূন্যতাবোধের। তবু মনে হয় দূর থেকে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন, অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের নব্বইয়ের দশকের ‘মহানায়ক’ সালমান শাহ।

বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে কেতাদুরস্ত ও কালোত্তীর্ণ নায়ক ছিলেন সালমান। কারো কারো কাছে ছিলেন নিশিদিন প্রতিদিন স্বপ্নে দেখা নায়ক। রুপালি পর্দার জগতে চার বছরের পদচারণায় অভিনয় করেছেন ২৭টি চলচ্চিত্রে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কেয়ামত থেকে কেয়ামত দিয়ে শুরু করে ১৯৯৪-৯৭ পর্যন্ত তুমি আমার, অন্তরে অন্তরে, রঙিন সুজন সখী, বিক্ষোভ, স্নেহ, প্রেমযুদ্ধ, দেন মোহর, কন্যাদান, স্বপ্নের ঠিকানা, আঞ্জুমান, মহামিলন, আশা ভালোবাসা, বিচার হবে, এই ঘর এই সংসার, প্রিয়জন, তোমাকে চাই, স্বপ্নের পৃথিবী, সত্যের মৃত্যু নেই, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া, প্রেম পিয়াসী, স্বপ্নের নায়ক, শুধু তুমি, আনন্দ অশ্রু, বুকের ভিতর আগুন প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্রানুরাগীদের হৃদয়ে চিরদিনের মতো জায়গা করে নিয়েছেন নায়ক সালমান শাহ।

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগে সালমান শাহ বিনোদনজগতে পা রাখেন বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হয়ে। কেবল অভিনয় দিয়ে তিনি প্রেক্ষাগৃহের দর্শককে মুগ্ধ করেননি, নজর কেড়েছেন স্বতন্ত্র স্টাইল দিয়েও। সে সময় তরুণদের ফ্যাশন আইকন হয়ে ওঠেন সালমান। মডেলিং, অভিনয়ের পাশাপাশি গান গাওয়ায়ও পারদর্শী ছিলেন তিনি। ছোট থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করতেন। তার আসল নাম ছিল শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। পরে নিজ গুণে হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় নায়ক ‘সালমান শাহ’।

একটি সাক্ষাৎকারে প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাককে ‘কারো অভিনয় কি ভালো লাগে বা মনে হয় যে তারা আসলে সত্যি কিছু করতে পারবেন’ প্রশ্ন করা হলে উত্তরে সর্বপ্রথম তিনি নাম নিয়েছিলেন সালমান শাহের এবং বলেছিলেন, ‘একটা ছেলে ছিল অকালে মরে গেল-সালমান শাহ’।

এ দুনিয়া ছাড়তে হবে সে কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু কথাটি মেনে নেয়া বড়ই কঠিন। আর ছেড়ে যাওয়া যখন অস্বাভাবিকভাবে অকালে ঘটে যায়, তা মেনে নেয়া যেন আরো কঠিন হয়ে পড়ে, এর চেয়ে হৃদয়বিদারক হয়তো কিছুই হয় না!

সালমান শাহের ভক্তরা তার রহস্যময় মৃত্যুতে আজও বিদারক মন নিয়ে বসে থাকে, বসে ভাবে তিনি ক্ষণজন্মা না হলে আজ আমাদের চলচ্চিত্র জগৎ কতটা সমৃদ্ধ হতে পারত! বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে আলোর রোশনাই হয়ে তিনি এসেছিলেন, সূচনা করেছিলেন এক নতুন অধ্যায়।

আরও