বছরজুড়ে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও নতুনত্ব এসেছে সিনেমায়

বাংলা চলচ্চিত্রের এক মিশ্র অনুভূতির বছর ছিল ২০২৫। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শকের উপস্থিতির স্বল্পতা, প্রেক্ষাগৃহে সীমিত মুক্তি, হল বন্ধ ঘোষণাসহ বছরটি ছিল সিনেমার জন্য চ্যালেঞ্জের।

বাংলা চলচ্চিত্রের এক মিশ্র অনুভূতির বছর ছিল ২০২৫। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দর্শকের উপস্থিতির স্বল্পতা, প্রেক্ষাগৃহে সীমিত মুক্তি, হল বন্ধ ঘোষণাসহ বছরটি ছিল সিনেমার জন্য চ্যালেঞ্জের। দুই ঈদের সময় কিছু বড় সিনেমা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় কেটেছে প্রায় দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহে। তবু এ অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু সিনেমা দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ৩০-৪০টির মধ্যে কয়েকটি সিনেমা নতুনত্বের ছোঁয়া এনেছে। সেসব সিনেমা শুধু বাণিজ্যিক দিক থেকে নয়, শিল্প ও গল্প বলার দিক থেকেও দর্শক মনে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করেছে। এ সিনেমাগুলো নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও অভিনেতাদের সৃজনশীলতা এবং সাহসী পদক্ষেপের পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে

‘বলী’ নতুন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ইকবাল হোসাইন চৌধুরী। চলতি বছরের শুরুতেই মুক্তি পেয়ে সমালোচকদের নজর কাড়ে সিনেমাটি। এটি পরিচালকের প্রথম সিনেমা, যা মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা হিসেবে তৈরি। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চরিত্রের মানসিক পরিবর্তন এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মানিয়ে নেয়া দৃঢ় নাট্যশৈলী। সূক্ষ্ম চিত্রগ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনয় দর্শককে গল্পের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহে দর্শকসংখ্যা সীমিত হলেও সামাজিক মাধ্যম এবং সমালোচকদের আলোচনায় সিনেমাটি বিশেষ স্থান পায়।

‘উৎসব’ পরিবার ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন তানিম নূর। ছোট পর্দার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘উৎসব’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষিক্ত হন তিনি। উৎসব পরিবার, দ্বন্দ্ব ও সামাজিক বাস্তবতার সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরে। সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে ধীরে ধীরে আবর্তিত হয় গল্প, যেখানে ছোটখাটো অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগের মাধ্যমে সমাজের বড় চিত্র ফুটে ওঠে। ভিজুয়াল টোন, সংগীত ব্যবহার ও চিত্রনাট্যের সূক্ষ্মতা সিনেমাটিকে পরিপক্বতা দিয়েছে। সিনেমাটি শুরুতে সীমিত মুক্তি পেলেও পরবর্তী সময়ে দর্শক চাহিদার কারণে দীর্ঘদিন প্রেক্ষাগৃহে চলে। বাণিজ্যিকভাবেও সিনেমাটি সফল হয়।

‘অন্যদিন’ মানব জীবনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন কামার আহমাদ সাইমন। অর্ধ-ডকুমেন্টারি শৈলীর সিনেমা ‘অন্যদিন’ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, সময়ের অস্থিরতা ও জীবনযাত্রার বিভিন্ন স্তর ফুটিয়ে তুলেছে। ধীরলয়ের নির্মাণ, বিমূর্ত ভাবনা ও সূক্ষ্ম মানবিক চিত্রায়ণ সিনেমাটিকে সমালোচকদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যারা সিনেমাটি গভীরভাবে দেখেছেন, তারা সিনেমার শিল্পভাষা এবং মানবিক গভীরতা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। আন্তর্জাতিক উৎসবেও সিনেমাটি প্রশংসিত হয়েছে।

‘সাবা’ পরিবার ও ত্যাগের গল্প

সিনেমার পরিচালক মাকসুদ হোসেন। ‘সাবা’ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক তরুণীর গল্প, যিনি অসুস্থ মায়ের যত্নে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। মেহজাবীন চৌধুরী ও রোকেয়া প্রাচীর অভিনয় সিনেমাটিকে শক্তিশালী করেছে। চিত্রনাট্য ও আবহ সংযোজন গল্পের আবহকে প্রাণবন্ত করেছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোয়ও সিনেমাটি প্রশংসিত হয়েছে।

‘বাড়ির নাম শাহানা’ এক নারীর সংগ্রাম ও স্বাধীনতার গল্প

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন লিসা গাজী। ‘বাড়ির নাম শাহানা’ সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত। এটি এক নারীর স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প। আনান সিদ্দিকা মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। গল্পের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চিত্রগ্রহণ এবং সংগীতের ব্যবহার সিনেমার আবহকে সমৃদ্ধ করেছে। দর্শক ও সমালোচকরা সিনেমার গল্প বলার ক্ষমতা ও শিল্পভাষা প্রশংসা করেছেন।

‘ফেরেশতে’ মানবিক বার্তা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন মুর্তজা অতাশ জমজম। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটিতে জয়া আহসানের অভিনয় এবং সিনেমার মানবিক বার্তার কারণে দর্শক প্রশংসা পেয়েছে। এটি ইরানের ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে জাতীয় পুরস্কার এবং ভারতের গোয়া আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক দিকের সংমিশ্রণের কারণে সিনেমাটি দর্শক সমাদৃত হয়েছে।

‘দেলুপি’ নতুন প্রজন্মের সাহসী পদক্ষেপ

এ সিনেমা পরিচালনা করেছেন তাওকীর ইসলাম। বছরের শেষের দিকে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেলুপি’ লোকজ উপাদান, ধর্ম, অন্ধবিশ্বাস ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলে। কম প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তারা সিনেমার অভিনয়, সাউন্ড ডিজাইন, লোকেশন ও সিনেমাটোগ্রাফি প্রশংসা করেছেন। সমালোচকরা এটিকে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের সাহসী ও সৃজনশীল কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আরও