প্রতিবার নতুন চরিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে আসতে চাই

মা-বাবার হাত ধরেই ছোট্ট বয়সে শোবিজে পা রাখেন লাক্স সুপারস্টার (২০২৫) বিজয়ী বিদুষী বর্ণিতা।

মাত্র তিন-চার বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা হয় তার। ছয়-সাত বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ সিনেমায়। টিভিসি ও নাটকেও কাজ করেছেন তখন। তবে শৈশবের সে সময় অভিনয় নিয়ে তেমন ভাবনা ছিল না বর্ণিতার। খেলাধুলায়ই বেশি আগ্রহ ছিল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে সে চিত্র। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাজ দেখতে দেখতে নিজের মধ্যেও বড় পরিসরে অভিনয়ের স্বপ্ন তৈরি হয়। সে স্বপ্ন পূরণের জন্য শুরু হয় অডিশন দেয়া। এক-দুই বছর নয়, টানা সাত বছর ধরে চেষ্টা করেও বড় কোনো সুযোগ পাচ্ছিলেন না তিনি। এর মধ্যেই পার করেছেন জীবনের কঠিন এক সময়। ঠিক সে সময়ই সামনে আসে লাক্স সুপারস্টারের বিজ্ঞাপন। বর্ণিতার কাছে সেটি যেন হঠাৎ পাওয়া কোনো সুযোগ নয়, বরং জীবনের মিরাকল।

তিনি বলেন, ‘নিজে নিজে যখন অন্য অ্যাক্টরদের দেখতাম, তখন তাদের অভিনয় দেখে এত ভালো লাগত। ওই স্বপ্ন নিজের মনেও তৈরি হয়। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু করি, আমি বড় পরিসরে অভিনয় করতে চাই।’

সাত বছর অপেক্ষার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত সুযোগ আসছিল না তখন একসময় ভেবেছিলেন, লাক্স সুপারস্টার হয়তো আর হবে না। কিন্তু গতবার অর্থাৎ ২০২৫-এ যখন প্রতিযোগিতার রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়, তখন তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। সে অবস্থায় লাক্সের বিজ্ঞাপনটি তার সামনে আসে। ঘটনাটিকে নিজের জন্য বিশেষ এক উপহার মনে হয়েছিল বর্ণিতার।

তার ভাষায়, ‘সাত বছর যেহেতু হয়নি, ভেবেছিলাম হয়তো লাক্স সুপারস্টার আর হচ্ছেই না কখনো। কিন্তু যখন গতবার রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়, আমি খুব অসুস্থ ছিলাম, জীবনের সবচেয়ে কঠিন ধাপটা পার করছিলাম। ওই সময় লাক্সের বিজ্ঞাপনটা আমার সামনে আসে। মনে হয়েছিল, এটা হয়তো আল্লাহর তরফ থেকে আমার জন্য একটা গিফট, হয়তো এটাই আমার জীবনকে পাল্টে দেবে।’

লাক্স সুপারস্টার জয়ের পরই বর্ণিতার সামনে খুলে যায় অভিনয়ের নতুন দরজা। নির্মাতা শিহাব শাহীনের ওয়েব প্রজেক্ট ‘ক্যাফে আম্ব্রেলা’য় অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। চরিত্রটি নিয়ে অবশ্য এখনই বিস্তারিত বলতে চান না বর্ণিতা। স্পয়লার এড়াতেই তার এ সিদ্ধান্ত। তবে এটুকু জানান, চরিত্রটি তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। নিজের স্বভাবের বিপরীত একটি চরিত্র হয়ে উঠতে হয়েছে তাকে।

এ রূপান্তরকেই অভিনয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করেন বর্ণিতা। নিজের খোলস ভেঙে চরিত্রটির মধ্যে ঢোকার ক্ষেত্রে পরিচালক শিহাব শাহীন ও সহ-অভিনেতার সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। বর্ণিতা বলেন, ‘চরিত্রটা আমার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এটাকে ফুটিয়ে তোলা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল আমার জন্য। নিজের খোলস ভেঙে ওই ক্যারেক্টারের মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। সেজন্য ডিরেক্টর শিহাব শাহীন স্যার এবং আমার কো-অ্যাক্টর অনেক সাহায্য করেছেন। সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী, তবে একদিক থেকে নার্ভাসও এ ভেবে, মানুষ আমার অভিনয়টা কীভাবে নেবে।’

বর্ণিতার কাছে নিজের প্রথম শুটিংয়ের দিনটি ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। সকালে পরীক্ষা দিয়ে সরাসরি সেটে যেতে হয়েছিল তাকে। প্রস্তুতির তেমন সময় ছিল না। আগের রাতেও ঠিকমতো ঘুম হয়নি। সব মিলিয়ে বেশ অস্থিরতার মধ্যেই শুরু হয়েছিল তার প্রথম শুটিং।

তবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পর যেন সব অস্থিরতা কেটে যায়। তিনি বলেন, ‘আগের রাতে ঘুম হয়নি, একটা হুলুস্থুল অবস্থা ছিল। কিন্তু যখনই প্রথম সিনটা করতে বসি, ওই মুহূর্তে অনেক ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। অলমোস্ট কেঁদেও ফেলেছিলাম—ওয়াও, দিস ইজ দ্য স্টার্টিং অব মাই ড্রিম! পুরো দিনটা অনেক ইনজয় করেছি।’

প্রথম কাজেই পরিচালক শিহাব শাহীনের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানান বর্ণিতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিয়ে শিহাব স্যার যে ধৈর্য ধরে একটা একটা করে দেখিয়ে-বুঝিয়ে গাইড করেন, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। এমন ছোট সিন আছে, যেখানে খালি একটা ‘‘হ্যাঁ’’ বা একটা ‘‘না’’ বলছি। সে হ্যাঁ বা না-কে কতভাবে বলা যায়, সে জিনিসও তিনি শিখিয়েছেন।’

লাক্স সুপারস্টারের সময়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে একটি জন্মদিনের গল্পও শোনান বর্ণিতা। প্রতিযোগিতার শেষ দিকে টানা ৩৬ ঘণ্টা শুটিং চলছিল। সে ব্যস্ততার মধ্যেই পড়ে তার জন্মদিন। জন্মদিন ঘটা করে উদ্‌যাপনের অভ্যাস ছিল না তার। কিন্তু সেবার সহকর্মীরা ব্যস্ততার মধ্যেও তার জন্য কেক নিয়ে আসেন। হঠাৎ এমন আয়োজনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

বর্ণিতা বলেন, ‘আমার আসলে খুব একটা বার্থডে সেলিব্রেট করা হতো না। কখনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘটা করে উদ্‌যাপনের সুযোগ পাইনি। কিন্তু ওইদিন সেটে সবাই আমার জন্য কেক নিয়ে আসেন। তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও সবকিছু থামিয়ে দিয়ে আমাকে উইশ করেন। মুহূর্তটা আমি ভুলতে পারব না। আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিন এবং সবচেয়ে স্মরণীয় জন্মদিন হয়ে থাকবে এটা।

লাক্স সুপারস্টারের শীর্ষ ১২ প্রতিযোগীর সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বকেও জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে করেন বর্ণিতা। প্রথমবারের মতো বাসা ছেড়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয় এ সম্পর্ক। তার ভাষায়, ‘এতটা লম্বা সময় একসঙ্গে থেকে বন্ধুত্ব না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। আমার লাইফে তেমন ক্লোজ ফ্রেন্ডস ছিল না। লাক্সের জার্নিতে আসার পরই এ মেয়েরা আমার বেস্ট ফ্রেন্ডস হয়ে ওঠে।’

শিশুশিল্পী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তখন অভিনয় নিয়ে তেমন বোধ তৈরি হয়নি বর্ণিতার। এখন মূল চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে সে জায়গার দায়িত্বও নতুন করে অনুভব করছেন তিনি। আগে কাজ নিয়ে খুব বেশি ভাবতে না হলেও এখন প্রতিটি কাজ নিয়েই বাড়তি সচেতন থাকতে হয় তাকে।

বর্ণিতা বলেন, ‘আগে আমি মেইন ফোকাস ছিলাম না, এখন আমি মূল অভিনেত্রী। এ জায়গার দায়িত্ব অনেক বড়। আগে চিন্তামুক্ত থাকতাম, এখন রাতে ঘুমানোর আগে অনেক কিছু নিয়ে মাথায় চিন্তা করতে হয়। কিন্তু এটা যেহেতু আমার নিজের পছন্দ করা পথ, তাই এটা নিয়েও আমি খুব খুশি যে ফাইনালি আমার করার কিছু পেয়েছি।’

ভবিষ্যতে নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রে আটকে রাখতে চান না বর্ণিতা। ভিন্ন ঘরানার গল্প ও নারীকেন্দ্রিক চরিত্রে কাজ করার ইচ্ছা তার। প্রতিবার নতুন কোনো চরিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে আসতে চান তিনি। বর্ণিতার ভাষায়, ‘আমি সব ধরনের কাজ ভার্সেটাইলভাবে করতে চাই। আমাকে দেখে যেন মানুষ প্রত্যেকবার ভিন্ন কিছু পান।’

আরও