আমাদের কাননবালা

‘আমি বনফুল গো, ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’ নজরুলগীতিটি যিনি কণ্ঠে ধারণ করে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের এক নন্দন ‘কানন’। বলছি কানন দেবীর কথা; নিজের কণ্ঠের জাদু

‘আমি বনফুল গো, ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে’ নজরুলগীতিটি যিনি কণ্ঠে ধারণ করে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের এক নন্দন ‘কানন’। বলছি কানন দেবীর কথা; নিজের কণ্ঠের জাদু এবং অনবদ্য অভিনয় দিয়ে পাকাপোক্ত জায়গা করে নেন দর্শকের হৃদয়ে, চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। তার স্মরণে সজনীকান্ত দাসের লেখা গানের একটি লাইন যথার্থ বলে মনে হয়—‘ওগো সুন্দর, মনের গহনে তোমার মূরতিখানি’। উল্লেখ্য, মুক্তি (১৯৩৭) চলচ্চিত্রের এ গানেও কণ্ঠ দিয়েছিলেন কানন। কানন দেবীর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’তে তার বেড়ে ওঠার বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি ‘কাননবালা’ নামেও সুপরিচিত।

অসাধারণ সুন্দর ছিলেন তিনি । তার দৃষ্টিনন্দন মুখশ্রীই মূলত চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসে তাকে। সুচিত্রা সেনকে কানন দেবীর পরের প্রজন্মের কানন দেবী বললেও দুঃসাহস দেখানো হবে না। তারা তুলনাহীন যদিও, কেননা তাদের বেড়ে ওঠা কিংবা চলচ্চিত্রে প্রবেশের রাস্তায় ছিল বিস্তর ফারাক।

কানন দেবীর পিতার নাম রতন চন্দ্র দাস এবং মায়ের নাম রাজবালা দেবী। কিন্তু রাজবালা ছিলেন রতন চন্দ্র দাসের রক্ষিতা। পাঁচ বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হয়। রাজবালা তার দুই কন্যাকে নিয়ে দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে রাঁধুনি ও ঝিয়ের কাজ করতেন। সে সময় তারা থাকতেন হাওড়ার ঘোলডাঙা বস্তিতে। সেখানে তার মতো অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে থাকাটা মুশকিল হয়ে পড়ে। রাজবালা চাননি তার মেয়েও কারো রক্ষিতা হোক। সময়ের পরিক্রমায় দারিদ্র্যের কারণে তার মা তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার অনুমতি দেন। যদিও কানন দেবীর চলচ্চিত্রে প্রবেশের পথ ফুলেল ছিল না মোটেও। তখন অভিজাত ঘরের মেয়েরা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য আসতেন না। এমনিতে তিনি ছিলেন দরিদ্র ঘরের, অন্যদিকে ছিলেন রক্ষিতার কন্যা। ফলে তার সামাজিক মূল্য ছিল অতি নিম্ন। চলচ্চিত্রে আসার পর এ অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। পরিচালকরা তাকে দিয়ে প্রায় নগ্নদশায় পর্দায় উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। ১৯৩১ সালে ‘জোরবরাত’ নামক জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনাধীন চলচ্চিত্রে পরিচালকের নির্দেশে নায়ক জোর করে চুম্বন করেন। এ আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ হলেও মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর তিনি অভিনয় করেন ‘বিষ্ণুপ্রিয়া’, ‘শঙ্করাচার্য’, ‘শ্রীগৌরাঙ্গ’, মা চলচ্চিত্রে। ১৯৩৫ সালে সতীশ দাস গুপ্তের ‘বাসবদত্তা’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রায় নগ্ন হয়ে অভিনয় করতে বাধ্য হন। শোনা যায়, ছবি নির্মাতারা তাকে অভিনয়ের সম্মানীও ঠিকমতো দেন না। তবে ১৯৩৫ সালে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে সুখ্যাতি লাভ করেন। এ চলচ্চিত্রে তিনি নিজের কণ্ঠে গীত গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলান। ১৯৩৬ সালে তিনি ‘কৃষ্ণ সুদামা’, ‘কণ্ঠহার’, ‘বিষবৃক্ষ’ ‘খুনি কৌন (হিন্দি)’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ওই বছরে তিনি নিউ থিয়েটার্সে যোগদান করেন।

‘বিদ্যাপতি (১৯৩৭)’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতির শীর্ষে ওঠে আসেন। ওই বছরই ‘মুক্তি’ ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম সারির নায়িকা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন; দরিদ্র সস্তা অভিনেত্রী কাননবালা থেকে তিনি সম্ভ্রান্ত কানন দেবী হয়ে ওঠেন। অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নায়িকা এবং দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কারসহ বহু সম্মানে ভূষিত হন। শেষ বয়সে এসে নিজেকে সমাজ সেবায় নিযুক্ত করেন এ গুণী শিল্পী। কে জানে, হয়তো পরপারে তিনি কান পেতে আছেন আজও! 

আরও