বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো/ তাপস নিঃশ্বাস বায়ে, মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে।’ গত বৈশাখের মতো এ বৈশাখেও করোনাভাইরাসের আক্রমণে শুধু বাঙালি কেন, বিশ্ববাসীর জীবনও যেন খাদের কিনারায়। আকাশ ছোঁয়ার মতো করে দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। অথচ বৈশাখ মানে তো ছিল বাঙালির প্রাণের উত্সবের মাস, আনন্দের মাস—নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ। বাঙালিরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন পহেলা বৈশাখে মেতে উঠত উত্সবে। কিন্তু পুরো পৃথিবী এখন যেন মৃত্যুপুরী।
আজ পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেসে আসেনি সেতারের সুর। রাগভৈরবীর তালে দুলে ওঠেনি কেউ। কেউ যাবে না কোথাও। ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যুচিন্তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এ যেন এক বিষণ্ন বৈশাখ...
তবু জীবন থেমে নেই। বয়ে যাচ্ছে জীবনের মতো করে। কখনো রঙিন, কখনো রঙহীন। মহামারীর চলমান ঢেউ মোকাবেলায় আবারো ১৪ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত সারা দেশে কঠোর লকডাউন কার্যকর করেছে প্রশাসন। খুব প্রয়োজন ছাড়া বের হওয়া যাবে না। থাকতে হবে ঘরের মধ্যে বন্দি। ভাইরাস থেকে বাঁচতে আর কোনো উপায়ও নেই। এরই মধ্যে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হানা দিয়েছে কভিড। চিরচেনা মুখগুলো বিদায় নিচ্ছে, কেউ আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণা ভোগ করছে হাসপাতালের বিছানায়, কেউবা বাসায়। এমন পরিস্থিতিতে বাঙালির এই প্রাণের উত্সব সামনে রেখে বণিক বার্তা থেকে যোগাযোগ করা হয় তারকাদের সঙ্গে। কেমন করে কাটাচ্ছেন এই নববর্ষ?
অনিমেষ আইচ, নির্মাতা ও লেখক
বিষণ্ন বৈশাখ না বলে স্মরণীয় বৈশাখ বলা যেতে পারে। হয়তো আজি হতে বহু বছর পরে নাতি-পুতিকে এ অন্ধকার বৈশাখের গল্প শোনাবেন বয়োবৃদ্ধরা। তারা বিশ্বাস করতে চাইবে না। তারপর গুগল করে দেখবে অতীত। যে অবিশ্বাস্য শূন্যতা নিয়ে নতুন বছর শুরু হতে চলেছে, হয়তো শেষটায় আনন্দের গোলায় পূর্ণ হবে সেটাই প্রত্যাশা করি।
শাহনেওয়াজ কাকলী, নির্মাতা ও লেখিকা
আনন্দ দেখতেও ভালো লাগে, আনন্দ করতেও ভালো লাগে। আসলে আনন্দ মানুষকে বাঁচায়, দুঃখ কখনো বাঁচাতে পারে না। দুঃখ চিন্তা কখনই মানুষকে সুস্থ রাখতে পারে না। তাই পৃথিবী সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় আমরা। তখন আবার আমরা ১৬ কোটি মানুষ এক হয়ে বৈশাখী উত্সবে মেতে উঠব। আমরা চারুকলা থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিছু অভিনব মাস্ক তৈরি করেছি। ছোট পরিসরে আমরা আমরাই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। তবে তা খুব সচেতন হয়ে। বৈশাখ মঙ্গলের প্রতীক, বাঙালির নববর্ষ। তাই বৈশাখের রঙ যেন থাকে বাঙালির ঘরে ঘরে।
রওনক হাসান, অভিনেতা
মাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে এলাম। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা শুরু হলো কেবল। প্রতিদিন আমাদের কারো না কারো বাবা, মা, প্রিয়জন চলে যাচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে! আইসিইউ তো দূরের কথা, আমার মায়ের জন্য একটি বেড পেতে যে কষ্ট করতে হয়েছে তা বলে বোঝানো যাবে না। মিতা ভাবি চলে গেলেন। হেলাল ভাই, ফরিদ ভাই, আরো কত কতজন। মাথা কাজ করতে চায় না, কিন্তু আমি জানি এখনই মাথা অনেক বেশি ঠাণ্ডা আর কার্যকর রাখতে হবে। নয়তো এই মহামারী আমরা অতিক্রম করতে পারব না। সবাই সাবধানে থাকুন। নিরাপদ থাকুন। নিরাপদ রাখুন। যারা চলে গেলেন তাদের আত্মার শান্তি হোক। যারা আক্রান্ত তাদের দ্রুত আরোগ্য প্রার্থনা করছি। আমার মায়ের জন্য পারলে একটু দোয়া করবেন।
আজমেরী হক বাঁধন, অভিনেত্রী
গত বছরও তো হয়নি। এ বছরও হচ্ছে না। গত বছর বৈশাখে ঘরবন্দি ছিলাম, কিন্তু খুব বেশি একটা টের পাইনি। তবে এ বছর খুবই বিষণ্নতায় ভুগছি। যেহেতু লকডাউন শুরু হলো আবার, এবার তো আরো ভয়াবহ অবস্থা। কী যে হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজের পরিবারকে সময় দেব। ঘরে থাকব বাবা-মা আছে। রান্না করব। কিন্তু কোথায় যেন কী নেই। চারপাশে কাছের মানুষের মৃত্যুর সংবাদ পাচ্ছি। গুণীজনেরা চলে যাচ্ছেন। কী হবে এখনো বুঝতে পারছি না। প্রত্যাশা, প্রার্থনা, সচেতনতাই কেবল পারবে সবাইকে রক্ষা করতে। এটাই কামনা করছি, এ বিষণ্নতা যেন কেটে যায়। আমরা যেন আবারো সুস্থ স্বাভাবিকভাবে আগামীতে একটু আনন্দে বাঁচতে পারি। এছাড়া আর কিছু চাওয়ার নেই।
আশনা হাবিব ভাবনা, অভিনেত্রী ও লেখিকা
গত বছরের চেয়ে এবার আরো বেশি ভয় হচ্ছে। তবু আমি সবসময় পজিটিভ। বাঙালি আমি, বাঙালিয়ানা আমার প্রাণ। কিন্তু এ বছরও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে পারছি না। চারদিকে মৃত্যুর সংবাদে মাথাটা ঝিম ধরে মাঝে মাঝে। কিন্তু নিজের কাজের মধ্যেই ব্যস্ত থাকতে হয়। লেখালেখি করতে হয়, আঁকাআঁকি, নাচ, তারপর এক্সাম শেষ করেছি মাত্র। সামনে আরো অ্যাসাইনমেন্ট আছে। হাজার হাজার শব্দ লিখতে হবে। লকডাউনে সব মিলিয়ে ঘরের বাইরে আর বের হওয়া হচ্ছে না এবারো। ভার্চুয়ালি পালন করব। হয়তো শাড়ি পরে একটা ছবি পোস্ট করব। আগের মতো করে তো আর পালন করতে পারব না। চারদিকের খবরে দুঃখবোধ কাজ করে। মানুষের দুঃখে দুঃখ পাই। আগের মতো কোনো আমেজ নেই। খুব ইচ্ছে করে যেন আগের মতো বের হতে পারি। একটা সুস্থ পৃথিবী কামনা করি।