বড় পর্দায় নারীর উপস্থিতি এখন আর শুধু গল্প বা নির্মাতার শৈল্পিক ভাবনার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে দর্শকের রুচি, বাজারের হিসাব-নিকাশ ও অর্থলগ্নি করার ঝুঁকি। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কখনো নারী হয়ে ওঠেন গল্পের মূল চালিকাশক্তি, আবার কখনো তার উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকে পুরুষ দর্শককে আকর্ষণের উপাদান হিসেবে। আর এমন উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা শুরু হলেই নির্মাতাদের যুক্তি—‘দর্শক তো এমনটাই দেখতে চায়!’ কিন্তু চলচ্চিত্রের এ ব্যবসায়িক কৌশল মেনে নিতে রাজি নন বলিউড অভিনেত্রী তাপসী পান্নু।
নতুন অ্যাকশন থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘গান্ধারী’র প্রচারে জুম টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন ও তাদের সিনেমায় অর্থায়নের দ্বিমুখী বাস্তবতা নিয়ে মুখ খুলেছেন তাপসী।
সম্প্রতি রাম চরণের ‘পেড্ডি’ এবং ইয়াশের ‘টক্সিক’-এর মতো বড় বাজেটের সিনেমায় নারী চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম বিতর্ক তৈরি হয়। ‘পেড্ডি’ সিনেমায় জাহ্নবী কাপুরের চরিত্রকে অতিরিক্ত যৌন আবেদনময়ভাবে উপস্থাপন ও ব্যক্তিত্বের বদলে শারীরিক সৌন্দর্যে জোর দেয়ার অভিযোগে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরে বিতর্কিত দৃশ্যগুলো সরিয়ে পরিচালক ক্ষমা চাইলেও বিতর্কের অবসান ঘটেনি। একইভাবে ‘টক্সিক’ সিনেমাতেও নারী চরিত্রকে মূলত গ্ল্যামার ও পুরুষ চরিত্রের অনুষঙ্গ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ ওঠে।
তাপসীর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ সমালোচনা বাস্তব বাজারে বড় প্রভাব ফেলে না। কারণ এক দল দর্শক যখন প্রতিবাদ করেন, অন্য দল ঠিকই সেই সব দৃশ্য বা ছবি ভাইরাল করতে থাকেন। ফলে নির্মাতারা এটিকে চাহিদা ও জোগানের সহজ সমীকরণ হিসেবে ধরে নেন। নির্মাতারা মনে করেন—জনতা যখন এমনটা চাইছে, তখন তা সরবরাহ করতে হবে; নইলে ব্যবসা হবে কীভাবে? কিন্তু এ চিন্তাধারার কারণে শিল্প ও নির্মাণশৈলী অনেক পিছিয়ে পড়ে। কভিড-পূর্ববর্তী সময়ে ভারতীয় সিনেমা যে পথে এগিয়েছিল, এ ব্যবসায়িক মানসিকতার কারণে তা আবার পিছিয়ে পড়ছে। নির্মাতারা দায় চাপান দর্শকের ঘাড়ে, আর এতে অভিনয়শিল্পীরা অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ দর্শক সক্রিয়ভাবে শৈল্পিক কনটেন্ট বেছে না নিলে এ লড়াইয়ে শিল্পীদের জেতা অসম্ভব।
নারীকে পণ্য হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি নারীপ্রধান সিনেমার অর্থায়ন নিয়েও মূল্যায়নের দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট। পুরুষপ্রধান অ্যাকশন সিনেমার গল্প সাধারণ মানের হলেও তা গ্ল্যামার ও অ্যাকশনের জোরে ব্যবসা করে ফেলে। কিন্তু নারীপ্রধান চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে পরিমাপের স্কেলটি বদলে যায়; সেখানে প্রযোজক ও দর্শককে সন্তুষ্ট করতে সিনেমাটিকে হতে হয় নিখুঁত।
সম্প্রতি আলিয়া ভাট ও শর্বরী ওয়াঘ অভিনীত ‘আলফা’ বক্স অফিসে আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। তাপসী জানান, এ ধরনের বড় তারকাদের একটি সিনেমা ব্যর্থ হলে তার খেসারত দিতে হয় গোটা নারীপ্রধান প্রজেক্টের বাজারকে। বিনিয়োগকারীরা সঙ্গে সঙ্গে পিছু হটেন এবং ধরে নেন নারীপ্রধান সিনেমার বাজার এখন খারাপ। ফলে বাজারে থাকা অন্য অনেক সম্ভাবনাময় প্রজেক্টও বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; যখন কোনো নারীপ্রধান সিনেমা সফলতা পায়, তখন আবার রাতারাতি নতুন প্রজেক্টের দরজা খুলে যায়।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস