তারা নাচছেন ‘আজ কার তেরে মেরে পেয়ার কে চারচে’ গানের তালে। ১৯৬৮ সালে ‘ব্রহ্মচারী’ সিনেমায় মোহাম্মদ রফির সঙ্গে এ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সুমন কল্যাণপুর। আজও সে গানের তালে অনেকে নাচেন। অথবা ‘না তুম হামে জানো’ শুনে আজও গুমরে মরে প্রেমিক হৃদয়। এমনই ছিলেন সুমন কল্যাণপুর। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন অসাধারণ সব গান। মারা গেলেন ৮৯ বছর বয়সে, গত ৩১ মে।
ভারতীয় সিনেমার প্লেব্যাকের কিংবদন্তি শিল্পীদের একজন সুমন কল্যাণপুর। প্রায় চার দশকজুড়ে বিস্তৃত সংগীতজীবনে তিন হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন বিভিন্ন ভাষায়। সুমনের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে মধুর, কোমল ও আবেগঘন সুর। ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের স্বর্ণযুগে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্তের মতো কিংবদন্তিদের সামসময়িক হয়েও তিনি নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন।
সুমন কল্যাণপুরের জন্ম পূর্ব বাংলায়। ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ভারত ভাগের আগে তার পরিবার পশ্চিম ভারতে চলে যায়। তারা ছিলেন পাঁচ বোন ও এক ভাই। তাদের নিয়ে ১৯৪৩ সালে তার বাবা শঙ্কর রাও তৎকালীন বোম্বে চলে যান। সেখানেই বেড়ে ওঠেন সুমন।
সুমনের হয়তো কণ্ঠশিল্পী হওয়ার কথা ছিল না। তিনি ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। কিন্তু কৈশোরে তাকে নূর জাহানের গান আকর্ষণ করল। স্কুল, বাড়ির অনুষ্ঠানে তিনি গাইতেন। মারাঠি সংগীত পরিচালক কেশবরাও ভোলেয়ের চোখে পড়েন এভাবেই। সুমনের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে তিনিই গান শেখানো শুরু করেন।
পঞ্চাশের দশকে প্লেব্যাকে আসেন সুমন। প্রথম প্লেব্যাক মারাঠি সিনেমায়। সে সময় প্লেব্যাকে লতা মঙ্গেশকর পূর্ণ চাঁদের মতো বিকশিত। আছেন শমশাদ বেগম, গীতা দত্ত। এর মধ্যেই সুরকার ও সংগীত পরিচালকদের নজরে পড়েন তিনি।
ষাট ও সত্তরের দশকে হিন্দি সিনেমার প্লেব্যাকের অন্যতম শিল্পী হয়ে ওঠেন সুমন কল্যাণপুর। তবে এজন্য বেশ বেগ পেতে হয়েছে তার। কেননা অন্য শিল্পীদের রমরমা সময় বাদেও তার আরেকটি চ্যালেঞ্জ ছিল। লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের সঙ্গে তার কণ্ঠের মিল ছিল। আজও তার গাওয়া অনেক গান শুনে শ্রোতারা মনে করেন গানটি লতার গাওয়া। এ সাদৃশ্য একদিকে সুমনকে পরিচিতি এনে দিলেও অন্যদিকে তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে তা মোকাবেলা করে তিনি প্রিয় হয়ে ওঠেন সেকালের সংগীত পরিচালকদের।
১৯৫৪ সালে ‘মঙ্গু’ নামের সিনেমার মাধ্যমে হিন্দিতে প্লেব্যাক শুরু করেন সুমন। এরপর তিনি শঙ্কর-জয়কিষাণ, রোশন, মদনমোহন, শচীন দেব বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ওপি নায়ার, নওশাদের মতো বাঘা বাঘা সংগীতকারদের সঙ্গে কাজ করেছেন। মোহাম্মদ রফির সঙ্গে তার জুটি রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় কিছু পেশাগত কারণে রফি ও লতা মঙ্গেশকর একসঙ্গে গান রেকর্ড করা বন্ধ করলে সুরকাররা রফির সঙ্গে যুগলকণ্ঠ হিসেবে সুমন কল্যাণপুরকেই বেছে নিতে শুরু করেন। তারা প্রায় ১৪০টি ডুয়েট গেয়েছেন।
তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ‘দিল এক মন্দির হ্যায়’, ‘না না কারতে’, ‘জিন্দেগি জুলম সহি’, ‘পর্বতো কে পেড়ো’, ‘রাহে না রাহে’ গানগুলোর নাম করা যায়। অবশ্য এমন আরো অনেক গান আছে। নাম নিতে গেলে নাম না নেয়ার গানের সংখ্যাই বেশি মনে হবে।
তাছাড়া সুমন কেবল হিন্দিতে গাননি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি, অসমিয়া ও অন্যান্য ভাষায়ও গান গেয়েছেন। বাংলার কথাই ধরা যাক। তার গাওয়া ‘তোমার আকাশ থেকে’, ‘কান্দে কেন মন’, ‘ব্যথা হয়ে কেন ফিরে এলে বঁধূয়া’, ‘পায়ের চিহ্ন নিয়ে’, ‘মনে করো আমি নেই’ গানগুলো জনপ্রিয়।
মারাঠি সংগীতেও তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মারাঠি ভাবগীত ও আধুনিক গানে তিনি এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেন।
বহু পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন সুমন কল্যাণপুর। এর মধ্যে ভারত সরকার ২০২৩ সালে তাকে পদ্মভূষণ সম্মাননা দেয়। তবে রাষ্ট্র বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার ও সম্মাননার চেয়েও তার জীবনে বড় হয়ে উঠেছে শ্রোতাদের ভালোবাসা। প্লেব্যাক থেকে অনেক আগেই দূরে সরে গেলেও সংগীত থেকে দূরে থাকেননি সুমন। তিনিও জানেন, তার কণ্ঠ আরো বহুদিন শুনবে শ্রোতারা।