‘প্যারানয়েড’: এক রিফ, এক ট্র্যাক আর হেভি মেটালের জন্মকথা

তার কণ্ঠে ‘প্যারানয়েড’ হয়ে ওঠে এক ভয়াল উপাখ্যান — যেন মানসিক রোগ, সমাজবিরোধিতা আর আত্মপ্রশ্নের সুর বাজছে ভারী গিটারের তালে।

বলা হয়, মূলত প্যারানয়েডের সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নিল রক মিউজিকের নতুন জনরা বা সঙ্গীতধারা— হেভি মেটাল। এমন ব্যান্ড খুব কমই আছে যাদের সঙ্গে কোনো একটি সঙ্গীতধারা এতটা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু ব্ল্যাক স্যাবাথ যা করেছিল, তা পরবর্তীতে মোটরহেড, এসি/ডিসি, মেটালিকা থেকে শুরু করে গানস এন’ রোজেস পর্যন্ত সকলের জন্যই তৈরি করে দিয়েছিল অন্ধকার টানেলের গায়ে প্রতিধ্বনিত গমগমে শব্দের এক নতুন পথ।

১৯৭০ সালের এক সাধারণ সকাল। চার ইংরেজ তরুণ — ওজি, টনি, গিজার আর বিল ঢুকলেন রেকর্ডিং স্টুডিওতে। নতুন ব্যান্ড তাদের। নাম ব্ল্যাক স্যাবাথ। উদ্দেশ্য ছিল একটা ‘ফিলার ট্র্যাক’ বানানো। সবগুলো গান দিয়ে দেয়ার পরও ফিতায় বাকি রয়ে গেছে মিনিট তিনেক সময়। সে জায়গা ভর্তি করতে লাগত আরেকটি ট্র্যাক। মাত্র ২০ মিনিট পর তৈরি হলো সেটি, নাম ‘প্যারানয়েড’। ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া রিফভিত্তিক সেই রক গানটি এখনো ঢেউ তোলে লাখ লাখ হেডব্যাঙ্গারের কান-মাথা ও মনে। এটাই সেই গান, যাকে অনেকেই বলেন হেভি মেটালের জন্মরেখা।

অ্যালবামের শিরোনাম ঠিক করা ছিল ‘ওয়ার পিগস’। কিন্তু সিঙ্গেল ট্র্যাক হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার পর প্যারানয়েডের জনপ্রিয়তা দেখে রেকর্ড লেবেল আবদার করে বসে, অ্যালবামের নামটাও যেন প্যারানয়েড রাখা হয়। অতঃপর সেটাই হয়ে গেল অ্যালবামের নাম এবং সবচেয়ে বড় হিট ট্র্যাকটাও ‘প্যারানয়েড’।

গানটির কথা লিখেছিলেন বেজিস্ট গিজার বাটলার, যিনি নিজেই তখন অবসন্নতায় ভুগছিলেন। ব্যান্ডের বাকি সদস্যরা গিজারকে ডাকত ‘প্যারানয়েড’ বলে, মূলত যেখান থেকে এসেছে ট্র্যাকের নাম। তবে গিজার নিজেও জানতেন না শব্দটার অর্থ! এই গানে তার কিশোর বয়সের মানসিক দ্বন্দ্ব, আত্মঘাতী চিন্তা এবং বোধের বিপর্যয় উঠে এসেছে কাঁচা অথচ আগুনঝরা ভাষায়।

এই গানেই টনি আয়োমির গিটার রিফ তৈরি করে হেভি মেটালের টেমপ্লেট। ভারী শব্দ, ডিস্টিউনড কর্ড প্রগ্রেশন আর স্ট্রোকগুলো যেন সরাসরি বুকে ধাক্কা দেয়। এই টোনের পেছনে ছিল তার কষ্ট — একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে গিয়ে টনির দুই আঙুলের অগ্রভাগ কেটে গিয়েছিল। গিটার বাজানোর আশা শেষ? মোটেও না!

তিনি নিজেই বানালেন প্লাস্টিকের কৃত্রিম থিম্বল, আলগা করলেন গিটারের স্ট্রিংস এবং গড়ে তুললেন সেই গর্জন-ধ্বনি, যেটা আজকের হেভি মেটালের বীজ। তার নামটাও 'প্যারানয়েড রিফ'!

ব্ল্যাক স্যাবাথের 'প্যারানয়েড' অ্যালবাম আর্ট। ছবি- রক অ্যান্ড রোল গ্লোব

সেই সঙ্গে ওজি অসবোর্নের কণ্ঠে আধিভৌতিক আবেশ। বলা হয়, মূলত প্যারানয়েডের সঙ্গে সঙ্গেই জন্ম নিল রক মিউজিকের নতুন জনরা বা সঙ্গীতধারা— হেভি মেটাল। এমন ব্যান্ড খুব কমই আছে যাদের সঙ্গে কোনো একটি সঙ্গীতধারা এতটা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু ব্ল্যাক স্যাবাথ যা করেছিল, তা পরবর্তীতে মোটরহেড, এসি/ডিসি, মেটালিকা থেকে শুরু করে গানস এন’ রোজেস পর্যন্ত সকলের জন্যই তৈরি করে দিয়েছিল অন্ধকার টানেলের গায়ে প্রতিধ্বনিত গমগমে শব্দের এক নতুন পথ।

বাদ্যযন্ত্রের ভিন্নতার বাইরে প্যারানয়েডে আরো কিছু ছিল— সেটা গানের কথায়। ইউটিউবে প্যারানয়েডের আদি ভার্শনের কমেন্ট সেকশনে গেলে পরিষ্কার হয় এর বিশেষত্ব। এই লাইনগুলো শুধু একটা গানের কথা নয় — তা যেন হয়ে উঠেছিল একটা প্রজন্মের ভেতরকার চিৎকার। প্রেম, অবসাদ, আত্মবিভ্রম — সব কিছুই উঠে এসেছে মাত্র ২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডে।

তার সঙ্গে আসতে বাধ্য ব্ল্যাক স্যাবাথের কিংবদন্তি ভোকাল ওজি অসবোর্নের কণ্ঠ— যেন তারুণ্যের তীব্র উন্মাদনার এক প্রতিধ্বনি। তার কণ্ঠে ‘প্যারানয়েড’ হয়ে ওঠে এক ভয়াল উপাখ্যান — যেন মানসিক রোগ, সমাজবিরোধিতা আর আত্মপ্রশ্নের সুর বাজছে ভারী গিটারের তালে।

তিনি নিজেই বলেছেন, ‘এই গানটা ছিল আসলেই একটা উপহার। কোনো প্ল্যান ছাড়াই এসেছিল। হুট করে ভাসতে ভাসতে গান চলে আসা কোনো নিত্যদিনের ব্যাপার নয়।‘

‘প্যারানয়েড’ রিলিজ হতেই ব্রিটেনে শব্দের তীব্রতা কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল কিনা জানা না থাকলেও বলা যায়— হেভি মেটাল যেন এক রাতেই পেয়ে গেল নিজের জাতিসত্তা। এরপর ‘আয়রন ম্যান’, ‘ওয়ার পিগস’, ‘চিলড্রেন অব দ্য গ্রেইভ’— একের পর এক হেভি মেটাল অ্যান্থেম। কিন্তু প্যারানয়েড রয়ে গেল চিৎকার ও হৃদয়গত আগুনে গড়া প্রথম তলোয়ার, যেটা দিয়ে শুরু হলো মেটালের রাজত্ব।

আজ ৫০ বছরেরও বেশি কেটে গেছে। মেটাল এসেছে-গেছে, কিন্তু ‘প্যারানয়েড’ এখনো ঝড় তোলে মঞ্চে। মৃত্যুর সপ্তাহ তিনেক আগেই বার্মিংহামে ব্ল্যাক স্যাবাথের ফেয়ারওয়েল কনসার্টে প্যারানয়েড গেয়েছেন ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ ওজি। আর মেটালিকা থেকে মেগাডেথ, স্লিপনট থেকে সিস্টেম অব আ ডাউন — সবাই কোনো না কোনোভাবে ঋণী এই গানটির কাছে। মেটালিকার ড্রামার লার্স উলরিখ বলেছিলেন, ব্ল্যাক স্যাবাথ যদি না থাকত, হার্ড রক ও হেভি মেটালের রূপ একদমই এমন হতো না।

আর নিজের ভেতরকার দানবের সঙ্গে দেখা করার আহ্বান প্রথমবারের মতো জানিয়ে ব্ল্যাক স্যাবাথ কি প্যারানয়েড দিয়ে নিজেদেরই পাল্টে ফেলেনি?

আরও