নির্বাচন নিয়ে সব ইন্ডাস্ট্রিতেই সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এইসব সিনেমায় উঠে এসেছে নির্বাচনের নানা দিক। কেবল ভোট কাস্ট, ব্যালট, নির্বাচনী প্রচারণাই না, এসব সিনেমায় দেখা যায় স্থানীয় রাজনীতির নানা বিষয়। হলিউডের বেশকিছু সিনেমায় নির্বাচন প্রসঙ্গ এসেছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের মৌসুমে দেখা যেতে পারে দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট, দ্য আইডস অব মার্চ, দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, প্রাইমারি কালার্সসহ আরো কিছু সিনেমা।
দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট (১৯৬২)
১৯৬২ সাল। কোল্ড ওয়ারের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে মুক্তি পায় দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট। লরেন্স হার্ভে এখানে এক সাবেক সৈনিকের ভূমিকায় অভিনয় করেনঅ তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে বন্দী হওয়ার পর চীনা কমিউনিস্টদের দ্বারা মগজধোলাইয়ের শিকার হন এবং পরে রাজনীতিবিদে পরিণত হন। এরপর তিনি অজান্তেই পরিণত হন এক ‘স্লিপার এজেন্ট’-এ।
সিনেমাটি দক্ষতার সঙ্গে সেই সময়ের শীতল যুদ্ধের আতঙ্ককে তুলে ধরেছিল (এবং ‘ব্রেনওয়াশিং’ বা মগজধোলাই শব্দটিকেও জনপ্রিয় করে তোলে)। কিউবান মিসাইল সংকটের মাঝামাঝি সময়ে এটি মুক্তি পাওয়ায় এর প্রভাব আরও বেড়ে যায়। সিনেমাটিতে রাজনীতি ও নির্বাচনের বিষয়আশয় উঠে এসেছে।
ছবি: ফিল্মগ্র্যাব
২০০৪ সালে লিভ শ্রাইবার ও ডেনজেল ওয়াশিংটনকে নিয়ে সিনেমাটি রিমেক করা হয়। তখন কোরিয়ান যুদ্ধের পরিবর্তে গালফ যুদ্ধ দেখানো হয় এবং কমিউনিস্টদের বদলে এক ভয়ংকর বহুজাতিক কর্পোরেশনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়।
দ্য আইডস অব মার্চ (২০১১)
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমা। পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয় করেছেন জর্জ ক্লুনি। এতে রায়ান গসলিং অভিনয় করেছেন স্টিফেন মেয়ার্স চরিত্রে। তিনি এক আদর্শবাদী তরুণ প্রেস সেক্রেটারি, যিনি পেনসিলভানিয়ার গভর্নর এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মাইক মরিস (ক্লুনি)-এর হয়ে কাজ করেন।
প্রচারণা এগোতে থাকলে মেয়ার্স বুঝতে পারেন যে যাকে তিনি প্রথমে শ্রদ্ধা করতেন, সেই প্রার্থীর অতীতে বেশ কিছু গোপন কেলেঙ্কারি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি তার নেতার।
ছবি: আইএমডিবি
সিনেমার শিরোনামই এর মূল বিষয়—বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্মম রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—ইঙ্গিত করে। ‘আইডস অব মার্চ’ হলো সেই দিন, যেদিন রোমান জেনারেল জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর থেকে এই দিনটি বিশ্বাসঘাতকতা ও পুরনো হিসাব চোকানোর প্রতীক হয়ে আছে।
দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (১৯৯৫)
নির্বাচন নিয়ে নির্মিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই প্রচারণার নাটকীয় দিকটি বেশি গুরুত্ব পায়। ১৯৯৫ সালে রব রেইনার পরিচালিত দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট-এ সেই দিকটি থাকলেও, এটি একই সঙ্গে একটি রোমান্টিক গল্পও। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতিবিদরাও নির্বাচনের সময় মানুষ হিসেবেই থাকেন।
মাইকেল ডগলাস অভিনয় করেছেন প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু শেফার্ডের ভূমিকায়। পরিবেশবাদী কর্মী সিডনি ওয়েড (অ্যানেট বেনিং)-এর সঙ্গে পরিচয়ের পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু এই নতুন সম্পর্ক তার প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর বব রামসন (রিচার্ড ড্রেফাস)-এর রাজনৈতিক আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। ব্যক্তিগত সুখের জন্য কি শেফার্ড তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলবেন?
ছবি: ওয়ার্নার ব্রাদার্স
সিনেমাটির চিত্রনাট্যকার অ্যারন সোরকিন পরে আমেরিকান রাজনীতি ও প্রেসিডেন্সি নিয়ে জনপ্রিয় টিভি সিরিজ দ্য ওয়েস্ট উইং তৈরি করেন, যা হোয়াইট হাউসে কর্মরত ব্যক্তিদের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
অল দ্য কিংস মেন (১৯৪৯)
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি ‘গভর্নর’ নির্বাচনও হয়। এগুলো হলো পৃথক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং সেগুলোও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মতোই নাটক, চক্রান্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ভরপুর।
১৯৪৯ সালে নির্মিত অল দ্য কিংস মেন গভর্নর নির্বাচন নিয়ে তৈরি অন্যতম বিখ্যাত চলচ্চিত্র। এতে ব্রডেরিক ক্রফোর্ড অভিনয় করেছেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিবিদ উইলি স্টার্কের চরিত্রে, যার গল্পটি আংশিকভাবে লুইজিয়ানার বাস্তব রাজনীতিবিদ হিউই লং-এর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত।
ছবি: আইএমডিবি
শুরুর দিকে স্টার্ক একজন আদর্শবাদী রাজনীতিবিদ হলেও, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে ধীরে ধীরে তিনি নির্মম হয়ে ওঠেন। অল দ্য কিংস মেন দেখায় কীভাবে একজন রাজনীতিবিদ ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু করেও ক্ষমতা অর্জনের পথে ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন। এই সিনেমাতে অভিনয়ের জন্য ক্রফোর্ড অস্কার জিতেছিলেন।
‘প্রাইমারি কালার্স’(১৯৯৮)
হলিউডের অন্যতম সেরা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার ধরা হয় এ সিনেমাকে। যা মূলত ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার আদলে নির্মিত হয়েছে। মাইক নিকোলস পরিচালিত এই ছবিটি জো ক্লেইনের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি।
গল্পটি মূলত তরুণ ও আদর্শবাদী প্রচারকর্মী হেনরি বার্টনের (অ্যাড্রিয়ান লেস্টার) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা হয়েছে। তিনি আকৃষ্ট হন আকর্ষণীয় ও ক্যারিশম্যাটিক গভর্নর জ্যাক স্ট্যানটনের (জন ট্রাভোল্টা) প্রচারণায় যোগ দিতে। স্ট্যানটন প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পেতে লড়ছেন।
ছবি: ইউকে জুইশ ফিল্মস
প্রচারণা এগোতে থাকলে হেনরি বুঝতে পারেন যে রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শের পাশাপাশি কৌশল, গোপন সমঝোতা এবং কখনও কখনও নৈতিক আপসও জড়িত। শেষ পর্যন্ত তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—তিনি কি এই জটিল ও আপসকামী রাজনৈতিক খেলায় অংশ নেবেন, নাকি নিজের নৈতিক অবস্থান বজায় রাখবেন?