পপ সংগীতের ইতিহাসে মাইকেল জ্যাকসনের অবস্থান একদমই আলাদা। তাই তাকে নিয়ে তৈরি যেকোনো বায়োপিকের ক্ষেত্রে দর্শকের প্রত্যাশাও থাকে অন্যরকম। আমরা যেমন তার বিখ্যাত পারফরম্যান্সগুলো আবার দেখতে চাই, তেমনি চাই ব্যক্তিগত জীবনের অজানা বা অদেখা দিকগুলোও জানতে আগ্রহী। ‘মাইকেল’ সিনেমাটি এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছে, যদিও সেটি সব জায়গায় সমানভাবে সফল হয়েছে এমন নয়।
আন্তোনি ফুকুয়া পরিচালিত ছবিটি মূলত একটি ‘মিডল অব দ্য রোড’ বায়োপিক। এটি খুব বেশি গভীরে যায় না, আবার পুরোপুরি ভাসা ভাসাও থাকে না। নিরাপদ পথে পরিচিত ঘটনাগুলোকে সাজিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত দিক পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু হওয়া শিশু যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। ফলে গল্পের মাঝে কিছুটা শূন্যতা অনুভূত হতে পারে। তবে নির্মাতারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এখানে তার উজ্জ্বল যাত্রাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে এখানেই ছবির একটি স্পষ্ট অবস্থান বোঝা যায়। এটি মাইকেলের ‘ডার্ক সাইড’ নয়, বরং তার শিল্পীসত্তা ও আত্মমুক্তির গল্প বলতে চায়।
ছোট্ট মাইকেলের চরিত্রটি খুব সংবেদনশীলভাবে দেখানো হয়েছে। সে অন্য শিশুদের মতো নয়—একটু আলাদা, একা। এই একাকীত্বই তাকে স্টেজের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। এ অংশগুলো সিনেমার আবেগ তৈরি করে এবং দর্শককে গল্পের সঙ্গে যুক্ত করে
’মাইকেল’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য। ছবি: ইউনিভার্সাল
সিনেমার শুরুটা খুবই শক্তিশালী। ১৯৬৬ সালে ইনডিয়ানায় ছোট্ট একটি বাড়িতে জ্যাকসন পরিবারকে কঠোর এক বাস্তবতায় লড়তে দেখা যায়। পাঁচ ছেলেকে দিয়ে কঠোর অনুশীলন করাচ্ছেন বাবা জো জ্যাকসন, যেন একটি সামরিক প্রশিক্ষণ চলছে। তার লক্ষ্য একটাই— পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে তুলে আনা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের পথে ছিল নির্মমতা। ছোট্ট মাইকেলকে মারধর, কঠোর নিয়ন্ত্রণ সবকিছুই স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ছোট্ট মাইকেলের চরিত্রটি খুব সংবেদনশীলভাবে দেখানো হয়েছে। সে অন্য শিশুদের মতো নয়—একটু আলাদা, একা। এই একাকীত্বই তাকে স্টেজের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে সে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। এ অংশগুলো সিনেমার আবেগ তৈরি করে এবং দর্শককে গল্পের সঙ্গে যুক্ত করে।
এরপর গল্প দ্রুত এগিয়ে যায় ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে, যখন মাইকেল একক ক্যারিয়ার শুরু করেন। এ অংশে প্রযোজক কুইন্সি জোনসের সঙ্গে তার কাজের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখানো হয়েছে। ‘অফ দ্য ওয়াল’ থেকে শুরু করে ‘থ্রিলার’—যা পরবর্তীতে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অ্যালবাম হয়, এ সময়টা সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ।
‘মাইকেল’-এর সবচেয়ে বড় চমক হলো নাম ভূমিকায় জাফর জ্যাকসনের অভিনয়। তিনি সম্পর্কে মাইকেলের ভাতিজা এবং এটাই তার প্রথম বড় পর্দার কাজ। কিন্তু জাফরের পারফরম্যান্স এতটাই স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য যে অনেক সময় মনে হয় সত্যিকারের মাইকেলকেই পর্দায় দেখা যাচ্ছে। তার কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি, এমনকি মাইকেলের সেই অদ্ভুত ভঙ্গুরতা ও আত্মবিশ্বাসের মিশ্রণ সবকিছুই তিনি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।
ছবিতে একের পর এক আইকনিক মুহূর্ত দেখানো হয়েছে। ‘বিলি জিন’-এর ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স, ‘বিট ইট’-এর নাচের অনুপ্রেরণা, কিংবা এমটিভিতে ভিডিও প্রচারের লড়াই। এ দৃশ্যগুলো অনেকটা ‘ফ্যান সার্ভিস’ হলেও সিনেমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিনেমাটি মাইকেলের জীবনের সমস্ত জটিলতা একটি জায়গায় এনে ফেলেছে। তা হলো বাবার সঙ্গে সম্পর্ক। জো জ্যাকসন এক ধরনের ‘ভিলেন’ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। মাইকেলের জীবনের সব চাপ, ভয়, ট্রমা—সবকিছুর মূল উৎস হিসেবে তাকে দেখানো হয়েছে। বাস্তব জীবনে বিষয়টি হয়তো আরো জটিল ছিল, কিন্তু সিনেমাটি গল্পকে সহজ রাখার জন্য এ পথ বেছে নিয়েছে।
ছবিতে একের পর এক আইকনিক মুহূর্ত দেখানো হয়েছে। ‘বিলি জিন’-এর ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স, ‘বিট ইট’-এর নাচের অনুপ্রেরণা, কিংবা এমটিভিতে ভিডিও প্রচারের লড়াই। এ দৃশ্যগুলো অনেকটা ‘ফ্যান সার্ভিস’ হলেও সিনেমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে
মাইকেল জ্যাকসনের পারফরম্যান্স নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে সিনেমাটি। ছবি: ইউনিভার্সাল
ছবিতে মাইকেলের অদ্ভুত জীবনযাপনও উঠে এসেছে। তার বাড়িতে পশুপাখি রাখা। যেমন ‘বুবলস’ নামের শিম্পাঞ্জি একদিকে তার একাকীত্বের প্রতীক, অন্যদিকে তার মানসিক জগতের অদ্ভুত দিকগুলোকে ইঙ্গিত দেয়।
পেপসি বিজ্ঞাপনের সময় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার দৃশ্যটি সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী মুহূর্ত। আগুনে তার চুল পুড়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি শারীরিক দুর্ঘটনা নয়, বরং তার জীবনের মানসিক ক্ষতগুলোর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ছবির শেষ অংশে ‘ভিক্টরি ট্যুর’ ও ‘ব্যাড’ যুগের কিছু অংশ দেখানো হয়। এখানে দেখানো হয় কীভাবে মাইকেল ধীরে ধীরে নিজের পথ বেছে নিচ্ছেন এবং পরিবারের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসছেন। তবে গল্পটি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায় ‘হিজ স্টোরি কন্টিনিউস...’ লেখার মাধ্যমে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে নির্মাতারা হয়তো ভবিষ্যতে এর পরবর্তী অংশ বানানোর পরিকল্পনা করছেন।
সব মিলিয়ে ‘মাইকেল’ নিখুঁত বায়োপিক নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে গেছে, কিছু জায়গায় খুবই সরলীকরণ করেছে। কিন্তু এর বড় শক্তি হলো, মাইকেল জ্যাকসনের শিল্পীসত্তার ‘তীব্রতা’কে ধরে রাখতে পেরেছে।
যারা তার গান, নাচ ও পারফরম্যান্স ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি দারুণ অভিজ্ঞতা। আর যারা তার জীবনের গভীর, বিতর্কিত দিকগুলো জানতে চান, তাদের হয়তো এই সিনেমা পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারবে না।
‘মাইকেল’ মূলত নতুন কিছু জানায় না বা শেখায় না, কিন্তু পুরোনো অনুভূতিগুলোকে আবার জাগিয়ে তোলে। আর কখনো কখনো, সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় সাফল্য।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে