কনসার্ট বন্ধে উদ্বেগ ও হতাশায় শিল্পী সমাজ

রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল আলী আজমত অ্যান্ড জেমস: লেজেন্ডস লাইভ ইন ঢাকা কনসার্ট।

রাজধানীর একটি কনভেনশন সেন্টারে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল আলী আজমত অ্যান্ড জেমস: লেজেন্ডস লাইভ ইন ঢাকা কনসার্ট। পাকিস্তানি শিল্পী আলী আজমত কনসার্টে অংশ নিতে তিনদিন আগে ঢাকায় পৌঁছেন। তবে কনসার্টের দিন সকালেই আয়োজক প্রতিষ্ঠান অ্যাসেন বাজ থেকে আসে দুঃসংবাদ। জানানো হয়, অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে কনসার্টটি স্থগিত করা হয়েছে। পরে আয়োজকরা জানান, শিগগিরই অন্য একটি ভেন্যুতে কনসার্টটি আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অ্যাসেন কমিউনিকেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কনসার্টটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

কনসার্ট বন্ধ হওয়ার কারণ নিয়ে গতকাল আয়োজক প্রতিষ্ঠান অ্যাসেন বাজের সাজ্জাদ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি ও প্রশাসনের অনুমতি সবই ঠিক ছিল। কিন্তু ইভেন্টের ঠিক আগের দিন ভেন্যুর কাছে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ হয়। সে ঘটনার পর প্রশাসন থেকে জানানো হয় দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কনসার্টটি আয়োজন করা ঠিক হবে না। এখানে অনেক ভিআইপি ও গুরুত্বপূর্ণ অতিথি আসার কথা ছিল। আর্টিস্ট ও অতিথি সবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই প্রশাসন কনসার্টটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।’

শুরুতে স্থগিত হওয়ার কথা বলা হলেও পরে কেন বাতিল হলো জানতে চাইলে সাজ্জাদ বলেন, ‘আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি যেন কনসার্টটি হয়। যখন আমাদের শুক্রবারের অনুমতি বাতিল করা হয়, তখন আমরা চেষ্টা করেছি শনিবার কিংবা কাছাকাছি সময়ে নিরাপদ জায়গায় আয়োজন করা যায় কিনা। কিন্তু অনিবার্য কারণে সম্ভব হয়নি। অবশেষে আমাদের বাতিল করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।’

এদিকে কনসার্ট বাতিলের বিষয়টি নিয়ে দেশের সংগীতশিল্পীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশের বিভিন্ন শিল্পী ও মঞ্চশিল্পীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, শুধু এ কনসার্টই নয়; সারা দেশে একের পর এক কনসার্ট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। দেশের অনেক স্থানে কনসার্টে বাধা দেয়া হচ্ছে, মব সৃষ্টি করে মঞ্চ ভাঙা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় দেশের কয়েকজন সংগীতশিল্পীর সঙ্গে। সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদার দুঃখ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে কনসার্ট হওয়ার কথা ছিল, সেটি হলো না। এটা সত্যিই খুব দুঃখজনক। কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য মোটেও ভালো সংবাদ নয়। আমরা যারা পারফর্ম করি, গান গাই, আমাদের জন্য এগুলো হতাশার খবর। আমরা দেখতে পাচ্ছি বারবার কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এক-দুটি অনুষ্ঠান কালেভদ্রে হলেও বেশির ভাগ ওপেন শো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তাজনিত কারণে। এটা শিল্পী সমাজের জন্য খুবই খারাপ সিগন্যাল। আমাদের কালচারের ওপর এ ধাক্কা নিঃসন্দেহে একটি খারাপ সংকেত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা এর ওপর ভর করে জীবনধারণ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

এই অচলাবস্থার দ্রুত অবসান প্রত্যাশা করেছেন বাপ্পা মজুমদার। কেননা এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত। তাদের সবার জন্যই কনসার্ট নতুন করে শুরু হওয়া ও চলমান থাকা জরুরী।

সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবীও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্নও। ফাহমিদা বলেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একটু এলোমেলো। আমরা যে যেই সেক্টরে আছি, এ পরিস্থিতি নিয়ে সবাই এক ধরনের চিন্তার ভেতর আছি। আমাদের প্রত্যাশা, সব জায়গায় সবকিছু দ্রুত স্থিতিশীল হোক। শিল্পীদের লক্ষ্যই সৌন্দর্যের দিকে, শিল্পী সমাজ সবসময় মানুষকে বিনোদন দেয়। শিল্পীরা তো দর্শক-শ্রোতাদের জন্যই কাজ করেন।’

জেমস ও আলী আজমতের অংশগ্রহণে কনসার্টটি না হওয়ায় তিনি দুঃখপ্রকাশও করেছেন। তবে আশা প্রকাশ করেছেন সবকিছু দ্রুত ঠিক হওয়ার। শিল্পীদের মূল কাজ মানুষের জন্য এবং এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্পীদের যে মূল লক্ষ্য মানুষকে বিনোদিত করা, তা যেন তারা সুন্দরভাবে পূরণ করতে পারেন—সেই প্রত্যাশাই করছি।’

নব্বইয়ের দশক থেকেই ওপেন এয়ার কনসার্ট দেশের তরুণদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়। কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতির গত কয়েক বছরে কমেছে এমন কনসার্টের সংখ্যা।

সংগীতশিল্পী পুলক অধিকারী বলেন, ‘এ মুহূর্তে দেশের যে পরিস্থিতি তাতে শুধু লেজেন্ডস লাইভ ইন ঢাকা কনসার্টই নয়, অনেক ওপেন কনসার্টও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিছু জায়গায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় প্রোগ্রামের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, আবার কোথাও কোথাও এলাকার মানুষজন কনসার্টে বাধা দিচ্ছে। এমন ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে। এটা আমাদের দেশ ও সংস্কৃতির জন্য এক অশনি সংকেত।’

তিনি মনে করেন ইনডোর কনসার্টের পাশাপাশি ওপেন এয়ার কনসার্টও শুরু করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘গত বেশকিছু দিন দেশে ছোটখাটো ইনডোর প্রোগ্রাম হলেও ওপেন কনসার্ট হচ্ছে না। যে কারণেই হোক, হচ্ছে না। আমি মনে করি, এ বিষয়ে সরকারের নজর দেয়া উচিত।’

দেশের সংগীতাঙ্গনের সঙ্গে অসংখ্য মানুষের জীবিকা জড়িত। তাদের মধ্যে গায়কের পাশাপাশি টেকনিশিয়ানও আছেন। কনসার্টের সঙ্গে এরাও জড়িত। পুলক বলেন, ‘সিঙ্গার, মিউজিশিয়ান, সাউন্ড টিম, লাইট, এলইডি এসবের পেছনে বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষ কাজ করেন। তাদের পরিবারও এ ইন্ডাস্ট্রির ওপর নির্ভরশীল। দেশের যেকোনো সমস্যা হলে অন্য খাত স্থিতিশীল থাকলেও সংগীতের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সরাসরি সমস্যায় পড়ে যান। প্রশাসন চাইলে সবই সম্ভব। আমি মনে করি, সরকারের ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট। প্রত্যাশা করি, যেন দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়।’

আরও