নারীদের ভাবনায় নারীর অগ্রগতি

প্রান্তিক পর্যায়ের নারীর কথাও ভাবতে হবে দিলারা জামান, অভিনেত্রী অনেক বছর ধরেই আমাদের দেশে নারী দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু সার্বিক অর্থে নারীর অগ্রগতি কতটা? আমি মনে করি, শুধু দেশের সফল ও শিক্ষিত নারীদের কথা ভাবলে চলবে না।

প্রান্তিক পর্যায়ের নারীর কথাও ভাবতে হবে

দিলারা জামান, অভিনেত্রী

অনেক বছর ধরেই আমাদের দেশে নারী দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু সার্বিক অর্থে নারীর অগ্রগতি কতটা? আমি মনে করি, শুধু দেশের সফল ও শিক্ষিত নারীদের কথা ভাবলে চলবে না। যারা প্রান্তিক পর্যায়ে বসবাস করেন, গ্রামেগঞ্জে, মিল-কারখানায়, বাসাবাড়িতে খেটে খায় যে মেয়েরা, শ্রমিক যারা আছেন, রাস্তার পাশে একজন পুরুষের সমান শ্রম দেন যে নারী, তাদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। একজন নারীর সবচেয়ে বেশি দরকার নিরাপত্তা। খেটে খাওয়া নারী কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ নয়, এমনকি রাতে যখন সে বাড়ি ফেরে, সেখানেও সে নিরাপদ নয়। শারীরিক-মানসিকসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে এখনো।

আমাদের সমাজে পুরুষদের মধ্যে এখনো নারীকে নিয়ে সঠিক বোধের অভাব আছে। ফলে নারী দিবস পালন হচ্ছে, কিন্তু তার সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। নারী দিবসের তাত্পর্য অনুভব করতে পারছে না তারা। যারা নারী সমাজকে নিয়ে কাজ করছেন, তারাও সমাজের খেটে খাওয়া প্রান্তিক নারীদের কাছে পৌঁছাতে আমি দেখিনি। মিল-কারখানায় যে মেয়েরা কাজ করেন, রাস্তায় পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে যারা কাজ করেন, তাদের স্যানিটেশনের মতো ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিরও সুব্যবস্থা করতে পারিনি। কাজেই নারী দিবস পালন করলেই শুধু হবে না, এজন্য যে প্রচার, যে আন্দোলন, কর্মক্ষেত্রে যারা নিয়োগ দেয়, তাদের মধ্যে মেয়েদের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদি এসব দিকে নজর দিতে হবে।

সবার আগে সম্মান পাওয়া উচিত পরিবার থেকে

চয়নিকা চৌধুরী, চলচ্চিত্র ও নাট্য নির্মাতা

একজন নির্মাতা হিসেবে বলতে পারি, দেশের মিডিয়ায় পথচলা নারীদের জন্য কখনো কঠিন আবার কখনো সহজ। নারী নির্মাতা হিসেবে কাজ করাটা বেশ কঠিনই। আমার ক্ষেত্রে সহজ হলেও অন্যদের জন্য পথটা খুবই পিচ্ছিল। একজন নারীকে সবকিছু ম্যানেজ করে তার পরই তার সৃষ্টির ব্যাপারে মন দিয়ে কাজ করতে হয়। একজন নারী নির্মাতাকে একজন পুরুষের মতো একই কাজ করতে হয়। এখানে কাজের কোনো জেন্ডার নেই। নারী নির্মাতার কাজের পাশাপাশি বাসায় ফেরার তাড়া থাকে। পরিবারের সদস্যদের বাঁকা চোখ থাকে তার দিকে। বাসার দরজা খোলা পাবে কিনা সে চিন্তা করতে হয়। আমি যেমন পরিবার থেকে সাপোর্ট পাচ্ছি, অনেক নারী নির্মাতাই সাপোর্টটা পান না। একজন নারীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা অনেক বেশি জরুরি। সমাজের চেয়ে পরিবারের সাপোর্টটা অনেক বড় ব্যাপার।

এছাড়া মেয়েদের মধ্যে কোমলতার বিষয়টা সহজাতভাবে থাকে। এজন্য নারীর কোমলতাকে পুরুষ দুর্বলতা ভাবে। এটা ভুল। প্রত্যেকটা নারী যদি আত্মবিশ্বাসী হয় এবং এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে তার কাজটা বের করে আনতে পারে সেটাই স্বার্থকতা। পাশাপাশি এটাও ঠিক, একা কখনো ভালো কাজ হয় না। সবার সাহায্য লাগে। সবাই মিলে কাজ করাটাই আসল কথা। কিন্তু আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে একটা মেয়ে লিড দিচ্ছে সেটা অনেকে মেনে নিতে পারে না। আমাদের দেশ উন্নত হচ্ছে। নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসছে। এটা শুধু বাংলাদেশে না। সারা বিশ্বেই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন, অনেক সুনাম অর্জন করছেন। এটা অবশ্যই ভালো দিক। তার পরও আমি বলব, যেসব পরিবারে একজন ভাই তার বোনকে সম্মান দেবে, স্বামী তার স্ত্রীকে সম্মান দেবে, তখন দেখা যাবে কাজের ক্ষেত্রে কলিগরাও তাকে সম্মান দিচ্ছে। সম্মানবোধ আসেই পরিবার থেকে।

আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি

ন্যান্সি, কণ্ঠশিল্পী

মেয়েদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আমি যে এলাকায় থাকি বের হলে দেখি কফিশপগুলোয় মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হচ্ছে। আড্ডা দিচ্ছে। নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছে। যেটা আগে এভাবে দেখা যেত না। আমার মনে হয়, আমরা আসলেই অনেক এগিয়ে গেছি। তার পরও কিছু সংকট আছে। এটা নারীদের জন্য যেমন আছে পুরুষের জন্যও আছে। সংকট সবসময়ই থাকে। আমি দেখি সব পেশাতেই নারীর সংখ্যা বেড়েছে। সাংবাদিকতা আগে পুরুষদের জন্যই চ্যালেঞ্জিং ছিল। এখন অনেক নারী আসছেন এ পেশায়। এভাবে ফটোগ্রাফার পেশায় দেখেন, নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। ব্যাংকিং, করপোরেটসহ প্রায় সব পেশাতেই নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটা তো অবশ্যই নারী অগ্রগতির উদাহরণ। মফস্বলের নারীরাও এখন চাকরি করছেন। এনজিওর ফিল্ড লেভেলেও নারীরা কাজ করছেন।

হ্যাঁ, কিছু যে অঘটন ঘটছে না তা কিন্তু না। এমন দু-একটা উদাহরণ সব দেশেই আছে। শতভাগ মানুষ তো আর জ্ঞানের আলোয় আসবে না। হয়তো একসময় পারব এবং সেই পথেই আছি আমরা। নারী শিক্ষায় তো বাংলাদেশ আগে থেকেই এগিয়ে। আমি নিজে ছোটবেলা থেকে শুনছি দেশে নারী শিক্ষার হার বেশি। প্রতি বছর যে রেজাল্ট প্রকাশিত হয়, এতে দেখা যায় নারীর রেজাল্ট ভালো, পাসের হার বেশি। তার মানে বাবা-মায়েরা মেয়েদের পড়াশোনার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছেন। অনেক মেয়ে হয়তো পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করছেন না, কিন্তু শিক্ষিত তো হচ্ছে।

তার পরও আমার মনে হয়, নারী দিবসটা দরকার। একটা দিন যদি নারীদের জন্য রাখা হয় ক্ষতি কি? আমরা ভালোবাসা দিবস পালন করছি। প্রতিদিনই তো ভালোবাসার, এর পরও একটা দিন আয়োজন করে ভালোবাসার দরকার।

তবে এটাও ঠিক, আমরা একই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এটা দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যখন কারো ছবিতে বাজে কমেন্ট আসে, তখন আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই। তবে আমি খেয়াল করে দেখেছি সামাজিক মাধ্যমগুলোয় শুধু পুরুষরাই যে বাজে কমেন্ট করে তা নয়, অনেক মেয়েও এসবে অংশ নেয়। এছাড়া নারীর আয় সংসারে ব্যবহার করলে সেটা নিয়ে খুব চর্চা হয়। মনে করা হয় সংসার শুধু পুরুষই চালাবে। এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন জরুরি।

বৈষম্য অনেকটাই দূর হয়েছে

দিলরুবা দোয়েল, মডেল অভিনেত্রী

একজন নারীর জন্য দেশে যেকোনো কাজ করাইটাই চ্যালেঞ্জ। আমরা মিডিয়ায় কাজ করাটা বেশি চ্যালেঞ্জের মনে করি। কারণ মিডিয়া সবসময় সামনে থাকে, মানুষের আগ্রহের জায়গায় থাকে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়াটাই প্রত্যেক মানুষের সার্থকতা।

স্বাধীনতার এ সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমার মনে হয়েছে, দেশ উন্নতির দিকে যেমন এগিয়েছে, তেমনি মানুষের পরিবর্তনও হয়েছে। এ অবস্থায় নারীকে নারী হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আমি অন্যদের কাছে যা প্রত্যাশা করি, অন্যরাও আমার কাছে ঠিক সেই প্রত্যাশাই রাখে, এমনটা ভাবলেই সবকিছু সহজ হয়ে যায়। একসময় নারী-পুরুষের পারিশ্রমিকের বৈষম্য ছিল। এখন ব্যাংক থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোয় নারী-পুরুষের পারিশ্রমিক বৈষম্য নেই বললেই চলে। একইভাবে মিডিয়ায়ও এখন বৈষম্য নেই বললেই চলে। বরং বলা হয়, মেয়েরা মিডিয়ায় সুযোগ-সুবিধা বেশিই পায়। তার পরও আমি মনে করি, নারীদের শ্রমের মর্যাদা রক্ষায় নারীকেই বেশি সচেতন হতে হবে। নারী বলে ছোটখাটো সুযোগ-সুবিধা নিতে গেলে সেটা পুরুষদের মাথায় গেঁথে যায়। মিডিয়ায় যারা মেধা নিয়ে কাজ করতে আসেন, মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে বৈষম্য করার সুযোগ থাকে না। তবে দু-একটা ভিন্ন দৃশ্য যে নেই তাও কিন্তু না। তার পরও বলব, নারী সচেতন হলে তাকে কেউ ঠকাতে পারে না।      

আরও