বাংলাদেশের সিনেমা হলে বলিউডের সিনেমা মুক্তির সুযোগ নেই। তাই বলে বলিউডের সিনেমা কোনো কালেই থেমে থাকেনি। স্যাটেলাইট টিভি হোক কিংবা ভিসিআর-সিডি হোক, এ দেশের একশ্রেণীর দর্শক বিনোদনের জন্য আশ্রয় নিয়েছে বলিউডের সিনেমায়। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইমসহ ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর হাত ধরে সিনেমার বিশ্বয়ান হয়েছে খুব সহজেই। এখন মুম্বাই কিংবা চেন্নাইয়ের দর্শক যখন বলিউডে মুক্তি পাওয়া সিনেমা দেখতে পায়, ঢাকার দর্শকও একই সময়ে দেখতে পায় ঘরে বসেই।
বলিউড সিনেমার এ দাপট শুধু বাংলাদেশেই না। উপমহাদেশের যেকোনো দেশেই। শাহরুখ, আমির, সালমান, অক্ষয়দের ভক্ত নেই এমন দেশ উপমহাদেশে পাওয়া যাবে? বলিউডের দাপটে অনেক দেশের নিজস্ব চলচ্চিত্র শিল্পকে ধুঁকতে হয়েছে, যার বড় উদাহরণ বাংলাদেশ।
কে জানত সিনেমার এ বিশ্বায়নের যুগে এসে প্রতাপশালী বলিউডকে টেক্কা দেবে ভারতেরই আঞ্চলিক কয়েকটি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি? অদ্ভুত শোনালেও হয়েছে তা-ই। বলিউডের বিগ বাজেট আর সুপারস্টারদের চোখ রাঙাচ্ছে তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালয়ালমের মতো দক্ষিণ ভারতের ‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র’
ইন্ডাস্ট্রি।
শাহরুখ খান, আমির খান, সালমান খান, অক্ষয় কুমারদের সিনেমা মুক্তি দিতে তাকাতে হচ্ছে রজনীকান্ত, মোহনলাল, প্রভাষ, আল্লু অর্জুন, রমচরণ, জুনিয়র এনটিআরদের দিকে। তাদের সঙ্গে সিনেমা মুক্তি দিতে ভাবতে হচ্ছে কয়েকবার।
ডিসেম্বরের আছে আর কয়টা দিন। এরপর নতুন বছর। মুক্তি প্রতীক্ষিত সিনেমার তালিকা করলে স্পষ্টই ফুটে ওঠে দক্ষিণী সিনেমার দাপটের কাছে বলিউডের অসহায়ত্ব। দক্ষিণের পুষ্পা, আরআরআর, কেজিএফ: চ্যাপ্টার টুর মতো সিনেমাগুলো মুক্তির মিছিলে। পুষ্পার ট্রিজার কিংবা কেজিএফ: চ্যাপ্টার টুর ট্রেলার যে পরিমাণ উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে, গত দুই বছরে বলিউডের কোনো সিনেমাও সে পরিমাণ উন্মাদনা সৃষ্টি করতে পারেনি। বলিউডের মুক্তির মিছিলে আছে অনেক সিনেমা। উল্লেখ করতে গেলে ‘৮৩’ আর ‘লাল সিং চাড্ডা’র নাম বলার পর মাথায় হাত দিয়ে বসে যেতে হয়। বাজেট, গল্প, স্টারকাস্ট কিংবা উন্মাদনা কোনো দিক দিয়েই কেজিএফ: চ্যাপ্টার টু কিংবা পুষ্পার মতো উন্মাদনা সৃষ্টি করা সিনেমা নেই বলিউডের হাতে।
একসময় দক্ষিণের সিনেমা বলতে চোখে ভাসত পদার্থ বিদ্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ধুন্ধুমার মারপিট। এখন সে অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। এ বছর মুক্তি পাওয়া ‘মালিক’
ও ‘জয় ভীম’
আলোড়ন তুলেছে মূলত গল্প, নির্মাণ, আয়োজন ও অভিনয়ের জন্য। দুলকার সালমান অভিনীত চার্লি কিংবা বিজয় সেতুপতির ভিক্রম ভিদা সিনেমাটা বারবার দেখেন ওই একই কারণে। বরং বলিউডপ্রেমীরা এখন বিব্রত হন অযৌক্তিক অ্যাকশন, বস্তাপচা গল্প, চিরাচরিত প্রেম আর চেতনার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ার জন্য। সুপারস্টাররাও অভিযুক্ত বিরক্তিকর অভিনয়ের দায়ে। নতুন যারা আসছেন তারাও খুব বেশি সৃজনশীলতা দেখাতে পারেননি। একজনের নাচ ভালো তো অ্যাকশন ভালো না। অ্যাকশন ভালো তো অভিনয় ভালো না। অন্যদিকে দক্ষিণী সিনেমায় এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন রজনীকান্ত, কমল হাসান, নাগার্জুন, পবন কল্যাণ, মোহনলাল, মামুত্তি কিংবা চিরঞ্জীবীরা। তাদের ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ধানুশ, সুরিয়া, চিয়ান বিক্রম, থালাপতি বিজয়, রবি তেজা, বিজয় সেতুপতি, বিশাল, আল্লু অর্জুন, জুনিয়র এনটিআর, রামচরণ, মহেশ বাবু, নাগা চৈতন্য, নানি, কিচা সুদীপ, প্রভাষ, যশ, বিজয় দেবরকোন্ডা, দুলকার সালমান, পৃথ্বিরাজরা। দক্ষিণী তরুণদের খ্যাতির ভিড়েই যেন হারিয়ে যেতে বসেছেন শাহরুখ, সালমান, আমিরদের মতো সুপারস্টার।
নয়নতারা, আনুশকা শেঠি, কাজল আগরওয়াল, সাই পল্লবী, সামান্থা আক্কিনেনি, কীর্তি সুরেশ, রাশমিকা মান্দানা, রাশি খান্না, পূজা হেগড়ের মতো নায়িকারা অভিনয়ের পাশাপাশি রূপের দ্যুতি দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করছেন। সেদিক থেকে আলোচনা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছেন কারিনা কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ কিংবা আলিয়া ভাটের মতো অভিনেত্রীরা।
একসময় দক্ষিণী তারকারা মুখিয়ে থাকতেন বলিউডে ডাক পাওয়ার জন্য। সে অবস্থাও পাল্টেছে। সাইফ আলী খান, অজয় দেবগন, সুনিল শেঠি, আলিয়া ভাটদের ভিড় করতে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণী সিনেমায়। অন্যদিকে সিনেমা হিট করতে অসিন, সামান্থা, প্রভাষদের ডাক পড়ছে বলিউডে। শুধু তা-ই নয়, সুপারস্টাররা রিমেক করছেন দক্ষিণী সিনেমা। তেলেগু ভাষার ‘অর্জুন রেড্ডি’
সিনেমার রিমেক ‘কবির সিং’। ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি আয় করা ও আলোচিত সিনেমা ছিল এটি। এছাড়া শহীদ কাপুরের পরবর্তী সিনেমা ‘জার্সি’ও দক্ষিণী সিনেমার রিমেক। শোনা যাচ্ছে, সাড়া জাগানো তামিল সিনেমা ‘ভিক্রম ভিদা’
রিমেক হচ্ছে বলিউডে।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নিয়ে বেশকিছু ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। দেশে দক্ষিণী সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে এসব গ্রুপের ভূমিকাও কম নয়। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে দক্ষিণী সিনেমার সাবটাইটেল তৈরি করেন। চলচ্চিত্রের গ্রুপগুলোয় বেশির ভাগই দেখা যায় দক্ষিণী সিনেমার ইতিবাচক রিভিউ। দর্শকও অপেক্ষা করে দক্ষিণী সিনেমাগুলোর জন্য। বিগত বছরগুলোয় দেখা গেছে বলিউডের চেয়ে বাংলাদেশের দর্শক বেশি আলোচনা করেছে দক্ষিণী সিনেমা নিয়ে। প্রভাষের ‘বাহুবলী’
সিনেমাটি এক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। এরপর যশ অভিনীত ‘কেজিএফ: চ্যাপটার ওয়ান’
সেই উন্মাদনার পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে। তারও আগে ‘এগা’ বা ‘মাক্ষী’,
রামচরণের ‘মাগাধীরা’
কিংবা দুলকার সালমানের ‘চার্লি’
সিনেমাপ্রেমীদের জন্য সে পথ তৈরি করে দিয়েছিল।
সম্প্রতি ধানুশ অভিনীত ‘আসুরান’
কিংবা ‘কারনান’
সিনেমাপ্রেমীদের মগজে নতুন করে ভাবনা তৈরি করছে। আলোচনায় উঠে এসেছে সুরিয়ার ‘সুরারোই পোট্রু’। মুভি ডাটাবেজ আইএমডিবির জরিপে সবচেয়ে বেশি রেটিং পাওয়া সিনেমার দৌড়ে তৃতীয় এটি। মহেশ বাবুর মহর্ষি, ভারত আনে নেনু, ফাহাদ ফাসিলের মালিক কিংবা সুরিয়ার জয় ভীমের মতো সিনেমাগুলোয় সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে দেখে দর্শক হয়তো মনে মনে বলছে, চলচ্চিত্র মানে যদি হয় জীবনের প্রতিচ্ছবি তাহলে দক্ষিণের সিনেমাগুলোতেই তা বেশি দেখা যায়। সিনেমাগুলোর সিনেমাটোগ্রাফি কিংবা অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে মুগ্ধ হচ্ছে সিনেমাপ্রেমীরা। বলিউড যেখানে একের পর এক বায়োপিক ঘরানার সিনেমা দিয়ে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে দক্ষিণী সিনেমাগুলো গল্প ও অভিনয় দিয়ে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে সিনেমাবোদ্ধা ও দর্শকদের। এর প্রকৃত উদাহরণ হতে পারে কয়েকদিন আগে মুক্তি পাওয়া ‘দৃশ্যম-টু’।
নির্মাণ, গল্প, অভিনয়, আবহ সংগীত তো আছেই। এছাড়া দক্ষিণের চলচ্চিত্র এত বেশি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে ধরা যায় তারকাদের নিজস্ব ফ্যানবেজ। হালের আল্লু অর্জুন কিংবা প্রভাষের একটি সিনেমার জন্য দর্শক সানন্দে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে রাজি। প্রভাষ পাঁচ বছর কোনো সিনেমায় অভিনয় করেননি বাহুবলীর জন্য। পাঁচ বছর দর্শক অপেক্ষা করেছে। ঠিকই বাহুবলী মুক্তির পর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বলিউডে এমন কোনো তারকা আছেন, যার জন্য দর্শক পাঁচ বছর অপেক্ষা করবে? বরং পাঁচ-ছয় বছর সিনেমা মুক্তি না পেলে হয়তো ভুলেই যাবে শাহরুখ, সালমান, সাইফ, অক্ষয়, আমিরদের।