সুন্দর পোশাক নয়, চরিত্রকে জীবন্ত করে কস্টিউম

চরিত্রের পরনের পোশাক, রঙ, ধরন কিংবা সাজসজ্জা দেখেই অনেকটা বোঝা যায় চরিত্রটি কেমন, তার সামাজিক অবস্থান কী কিংবা গল্পে তার গুরুত্ব কোথায়।

চলচ্চিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান কস্টিউম। পর্দায় একটি চরিত্রকে নানা পোশাক ও সাজে দেখা যায়। চরিত্রের পরনের পোশাক, রঙ, ধরন কিংবা সাজসজ্জা দেখেই অনেকটা বোঝা যায় চরিত্রটি কেমন, তার সামাজিক অবস্থান কী কিংবা গল্পে তার গুরুত্ব কোথায়। পর্দায় যতটা সহজে একটি চরিত্রকে তার নির্দিষ্ট অবয়বে দেখা যায়, সে রূপ তৈরি করার নেপথ্যের কাজ ততটা সহজ নয়। একটি সিনেমা নির্মাণের আগে চরিত্রের সময়, সামাজিক অবস্থান, পেশা, জীবনযাপন, পরিবেশ এমনকি মানসিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে কস্টিউম পরিকল্পনা করা হয়। একজন অভিনয়শিল্পীর কস্টিউম ডিজাইন কীভাবে নির্ধারণ হয়, একটি চরিত্রের জন্য পোশাক বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কেমন? জানব এ প্রতিবেদনে—

চরিত্র নির্মাণে কস্টিউম

পর্দায় একটি চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে শুধু অভিনয়ই যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি দরকার তার হাঁটা, কথা বলা, মুখের অভিব্যক্তি। পর্দায় একটি চরিত্রের পোশাকও তার হয়ে কথা বলে। কখনো একটি চশমা, মাফলার কিংবা সাধারণ একটি শার্টও হয়ে উঠতে পারে চরিত্রের পরিচয়ের অংশ। বাংলাদেশের সিনেমায় সময়ের সঙ্গে বদলেছে কস্টিউম ব্যবহারের ভাবনা।

বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে আলাদা কস্টিউম ডিজাইনের ধারণা ছিল না। ১৯৫৬ সালে নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের পোশাকে উঠে এসেছে সে সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ জীবনের পরিচিত চিত্র। শাড়ি, পাঞ্জাবি, লুঙ্গি কিংবা সাধারণ সুতির কাপড়ই ছিল পর্দার মানুষের স্বাভাবিক পোশাক। অভিনয়শিল্পীরা অনেক সময় নিজেদের পোশাকই ব্যবহার করতেন, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালক বা প্রযোজনা দলের নির্দেশনাও অনুসরণ করতেন।

পরবর্তী কয়েক দশকেও চলচ্চিত্রের পোশাকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রভাব ছিল স্পষ্ট, ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় যেমন পোশাকের মধ্য দিয়ে ষাটের দশকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। তবে আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বিস্তারের সঙ্গে পোশাকে আসে পরিবর্তন। বলিউডের প্রভাব, উজ্জ্বল রঙ, অলংকার ও অপেক্ষাকৃত আড়ম্বরপূর্ণ পোশাকের ব্যবহার বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে নির্মাতারা বুঝতে শুরু করেন, গল্পের সময় ও পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে পোশাকের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

২০০০ সালের পর সে ধারণায় আরো পরিবর্তন আসে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ, ওয়েব ফিল্ম ও নাটকেও কস্টিউম নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়। পোশাককে শুধু অভিনেতাকে পরানোর বিষয় হিসেবে না দেখে চরিত্র ও গল্প বলার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।

পোশাক থেকে চরিত্র

পরিচালক অনম বিশ্বাস মনে করেন, কস্টিউম চরিত্র নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বলেন, ‘একটি চরিত্রের উপস্থিতি তৈরি হয় পোশাক, মেকআপ, গেটআপ ও কথা বলার ধরন মিলিয়ে। ‘দেবী’ নির্মাণের সময়ও চরিত্রগুলোর পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছিল চরিত্রের ব্যক্তিত্ব ও পরিবেশ বিবেচনায়।’

দেবীর মিসির আলী চরিত্রের পোশাকের বর্ণনা দিতে গিয়ে অনম বিশ্বাস বলেন, ‘মিসির আলী চরিত্রটি যেমন বুদ্ধিদীপ্ত ও আধুনিক, তেমনি তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মাটির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। এ দুই দিক একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে পোশাকে বেছে নেয়া হয়েছিল বাদামি, খয়েরি, ফ্যাকাশে সাদা ও অফ হোয়াইটের মতো রঙ। হাফহাতা শার্ট, সাধারণ কাপড়ের প্যান্ট, স্যান্ডেল, চশমা ও ছোট ব্যাগ—সব মিলিয়ে তৈরি করা হয় তার স্বতন্ত্র অবয়ব।’

শুধু পোশাকের ধরন নয়, রঙ ও কাপড়ের টেক্সচারও চরিত্রের অনুভূতি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। একটি নীল ঘরে হলুদ পোশাক পরা চরিত্রের যে অনুভূতি তৈরি হতে পারে, হলুদ ঘরে একই পোশাকে সেটি নাও হতে পারে। আবার সুতি, খাদি ও সিল্কের কাপড়ও পর্দায় আলাদা আবহ তৈরি করে। কস্টিউমের সঙ্গে সেট, আলো, রঙ ও দৃশ্যের সময়ও মিলিয়ে নিতে হয়।

স্ক্রিপ্ট থেকেই শুরু

কস্টিউম ডিজাইনার ফারজানা সান। যিনি ‘আয়নাবাজি’, ‘শনিবার বিকেল’, ‘তুফান’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’ সিনেমার কস্টিউম ডিজাইন করেছেন। তার কাছে একটি সিনেমার কস্টিউমের কাজ শুরু হয় পরিচালকের ভাবনা বোঝার মধ্য দিয়ে। এরপর স্ক্রিপ্টের চরিত্র, তার পেশা, সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান, সময়, পরিবেশ ও অন্য চরিত্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে তিনি সিনেমার কস্টিউম পরিকল্পনা করেন।

ফারজানা সান বলেন, ‘স্ক্রিপ্ট থেকে চরিত্রের পোশাক ও দৃশ্যগত রূপ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমেই পরিচালকের ভাবনা বোঝার চেষ্টা করি। গল্পের পরিবেশ ও মেজাজ অনুযায়ী চরিত্রগুলোর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এরপর গল্পটি কোন সময়ের এবং কোন জায়গার, সেটি দেখা হয়। গ্রাম, শহর বা বিশেষ কোনো ভৌগোলিক পরিবেশ—প্রতিটি বিষয়ই পোশাকের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ।

‘চরিত্রের আর্থিক সক্ষমতা, ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া, কাজের ধরন ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওপর ভিত্তি করে পোশাকের ধরন ও উপকরণ নির্বাচন করা হয়। একই সঙ্গে চরিত্রের থাকার জায়গা, ঘরের সাজসজ্জা ও আলোর সঙ্গে পোশাকের সামঞ্জস্য বজায় রেখে কস্টিউম পরিকল্পনা করা হয়।’

রঙ ও পোশাকের আলাদা ভাষা

আয়নাবাজিতে এ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রটির চরিত্র ও জগতের জন্য শুরুতেই একটি রঙের প্যালেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় চরিত্র আয়না নানা মানুষের চরিত্র ধারণ করে। তাই তার পোশাকও এক রকম ছিল না। তবে প্রতিটি পোশাকের পেছনে ছিল নির্দিষ্ট চরিত্রের সামাজিক ও মানসিক অবস্থান।

ফারজানা সান জানান, আয়না মূলত একজন সাধারণ ও সাদামাটা মানুষ, যে অভিনয়ের শিক্ষকও। তাই তার পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছিল সাধারণ রঙ, সরল নকশা ও খুব স্বাভাবিক কাট। অন্যদিকে কারাগারে সে যেসব মানুষের চরিত্র ধারণ করে, তাদের প্রত্যেকের পোশাকে আলাদা রঙ, ধরন ও বৈচিত্র্য রাখা হয়েছিল। ফলে একই অভিনেতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ দর্শকের কাছে আলাদা হয়ে উঠেছে।

বাস্তবতার পোশাক

এদিকে, ‘প্রিয় মালতী’, ‘নোনা জলের কাব্য’র মতো সিনেমার কস্টিউম ডিজাইনার ইদিলা ফরিদ তুরিন কস্টিউম ডিজাইনের কাজ শুরু করেন স্ক্রিপ্ট দিয়ে। গল্পের সময়, জায়গা, চরিত্রের বয়স, পেশা, আর্থিক অবস্থা ও পারিবারিক পরিবেশ বোঝার পর তৈরি হয় তার পোশাকের পরিকল্পনা। কারণ একটি চরিত্র কথা বলার আগেই তার পোশাক দর্শককে অনেক তথ্য দিতে পারে।

এ জায়গায় নোনা জলের কাব্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। উপকূলের বাসিন্দাদের নিয়ে তৈরি গল্পে পোশাক নতুন বা সাজানো মনে হলে পুরো জগৎটাই অবিশ্বাস্য হয়ে উঠতে পারে। তাই চরিত্রগুলো যেন সত্যিই বহু বছর ধরে সেই পরিবেশে বসবাস করছে, পোশাকে সেটিই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তুরিন। কাপড়ের রঙ ফ্যাকাশে হওয়া, ব্যবহারের ছাপ, ধুলো-ময়লা, ঘাম, কাপড়ের ভাঁজ ও ফিটিং—সবকিছুই ছিল পরিকল্পনার অংশ।

ইদিলা ফরিদ তুরিন বলেন, ‘একই গ্রামের বা একই আর্থিক অবস্থার মানুষের পোশাকও হুবহু এক হতে পারে না। বয়স, পেশা, ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে তাদের পোশাকে সূক্ষ্ম পার্থক্য থাকবে। সে পার্থক্যগুলোই চরিত্রকে আলাদা করে। আমার কাছে কস্টিউমের মূল লক্ষ্য কাউকে সুন্দর পোশাক পরানো নয়, বরং এমনভাবে পোশাক তৈরি করা, যাতে মনে হয় সেটিই ওই চরিত্রের নিজের পোশাক।’

রয়েছে সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে কস্টিউম ডিজাইনের ধারণা এগোলেও কাজটির কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা এখনো রয়েছে। বিশেষ করে সত্তর, আশি বা নব্বইয়ের দশকের পোশাক নিয়ে কাজ করতে গেলে নির্ভরযোগ্য ভিজুয়াল আর্কাইভের সংকট দেখা দেয়। শুধু ইন্টারনেটের ছবি দিয়ে সবসময় একটি নির্দিষ্ট সময় ও শ্রেণীর পোশাকের সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। পুরনো ছবি, সংবাদপত্র, সাময়িকী, বিজ্ঞাপন, বিটিভির নাটক, সিনেমার পোস্টার, ক্যালেন্ডার কিংবা পরিবারের পুরনো অ্যালবামও তখন গবেষণার উপকরণ হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে আছে সময় ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা। কোনো চরিত্রের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের পোশাক তৈরি করতে হলে অনেক সময় কাপড় খুঁজে বের করা, রঙ বদলানো, পুরনো দেখানো কিংবা পোশাক নতুন করে বানানোর প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত প্রি-প্রডাকশন সময় না থাকলে সে কাজও কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও