২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান

পর্দায় ছাত্র-জনতার ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল

ছাত্র-জনতার ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। এ আন্দোলনে নিহত ও আহত মানুষ, রাজপথে থাকা শিক্ষার্থী, সাধারণ নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশী এবং শহীদ পরিবারের অভিজ্ঞতা উঠে আসছে সিনেমা ও তথ্যচিত্রে। সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নির্মিত এসব তথ্যচিত্র নিয়ে এ আয়োজন।

জুলাই অনির্বাণ

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জুলাই নিয়ে নির্মিত ভিডিওচিত্র ‘জুলাই অনির্বাণ’। এটি ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান ও আন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে নির্মিত একটি স্মারকধর্মী তথ্যচিত্র হিসেবে এটি প্রচার করা হয়েছে। জুলাই অনির্বাণে ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা, নিহতদের স্মৃতি ও তাদের আত্মত্যাগের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের চেষ্টা করা হয়েছে।

জুলাইয়ের বিষাদ সিন্ধু

জুলাই পুনর্জাগরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্মিত ‘জুলাইয়ের বিষাদ সিন্ধু’ বা রিকুইয়েমস ফর জুলাই মার্টাজ। এ তথ্যচিত্রধর্মী কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনরা।

এতে শহীদদের পারিবারিক জীবন, তাদের স্বপ্ন, সামাজিক পরিচয় ও মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর নেমে আসা শোক ও অনিশ্চয়তা তুলে ধরা হয়েছে। শহীদদের শুধু সংখ্যা হিসেবে না দেখিয়ে তাদের মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনদের ব্যক্তিগত স্মৃতি সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

জুলাই মাদার্স

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত জুলাই মাদার্স: দেয়ার আইজ রিমেম্বার তথ্যচিত্র সিরিজ। সিরিজটির প্রথম ছবির নাম ‘উইল ইউ এভার স্লিপ, মা’?—বাংলায় যার ভাবার্থ, ‘তুমি কি আর কখনো ঘুমাতে পারবে, মা?’

এ সিরিজে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের মায়েদের স্মৃতিচারণ, সন্তান হারানোর বেদনা, বিচারপ্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সত্য তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা স্থান পেয়েছে।

হিরোজ উইদাউট কেপস

জুলাই পুনর্জাগরণ কর্মসূচির আওতায় নির্মিত হিরোজ উইদাউট কেপস তথ্যচিত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কীভাবে সংগঠিত হয়েছিলেন, প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন এবং নানা চাপ ও ঝুঁকির মধ্যেও রাজপথে ছিলেন, তথ্যচিত্রটির সেটিই প্রধান বিষয়।

জুলাই ডায়েরিজ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণের উদ্যোগে নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’-এর নির্মাতা লিখন দত্ত। ছবিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেয়া তরুণ, শিক্ষার্থী, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাধারণ নাগরিকের বক্তব্যের মাধ্যমে ছবিটির বয়ান তৈরি হয়েছে।

মুখোমুখি

‘মুখোমুখি’ তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন শাহীন দিল-রিয়াজ। ‘রিমেম্বারিং মনসুন রেভল্যুশন’ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত এ ছবিতে জুলাই আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যের মাধ্যমে সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

রাজপথে থাকা মানুষ কী দেখেছে, কীভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে এবং কোন ভয় ও প্রত্যাশা তাদের আন্দোলনের সঙ্গে ধরে রেখেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে সিনেমাটিতে। সাক্ষাৎকার ও আন্দোলনের বাস্তব ফুটেজের সমন্বয়ে নির্মিত ‘মুখোমুখি’ আন্দোলনের একটি মানবিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বয়ান তৈরি করেছে।

‘রক্তাক্ত মহাসড়ক: যাত্রাবাড়ী হত্যাকাণ্ড’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত ‘রক্তাক্ত মহাসড়ক: যাত্রাবাড়ী হত্যাকাণ্ড’ অনুসন্ধানী চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছে ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ অ্যান্ড জাস্টিস প্রজেক্ট। এতে টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট এবং দি আউটসাইডার মুভি কোম্পানি সহযোগিতা করেছে।

প্রায় ১৫ মিনিটের সিনেমায় বেলা ১টা ৫৬ মিনিট থেকে বেলা ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত যাত্রাবাড়ী থানার সামনে কী ঘটেছিল, তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

বিটিভির প্রামাণ্যচিত্রমালা

বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বেশকিছু প্রামাণ্যচিত্র ও ধারাবাহিক অনুষ্ঠান নির্মিত ও প্রচার হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যাসিবাদের দিনলিপি’, ‘আগামীর বাংলাদেশ’, ‘নিপীড়নের স্মৃতি’, ‘এই ত্যাগ রবে অম্লান’, ‘রক্তে ভেজা বাংলাদেশ’, ‘অদম্য তারুণ্য’ এবং ‘দিয়েছে যে প্রাণ’।

সরকারি আট সিনেমার পরিকল্পনা

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রিমেম্বারিং মনসুন রেভল্যুশন কর্মসূচির অধীনে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে আটটি মাঝারি দৈর্ঘ্যের সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আট বিভাগে কর্মশালা আয়োজন করে এসব চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ছিল। তবে পরিকল্পিত আটটির মধ্যে তিনটি কাজ জমা পড়ে—‘গুম গল্প নয়’, ‘মুখোমুখি’ ও ‘কিল মি লাইক আ ডগ’। বাকি পাঁচটি সিনেমা অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা সমস্যার কারণে শেষ হয়নি। এছাড়া জুলাই-আগস্ট নিয়ে ‘শ্রাবণ বিদ্রোহ’, ‘৩৬ জুলাই’সহ আরো বেশকিছু তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

আরও