বনলতা এক্সপ্রেস

হমায়ূনের উপন্যাস থেকে মনে রাখার মতো সিনেমা

উপন্যাস থেকে সিনেমা নির্মাণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা দর্শকের মনে পরিতৃপ্তি আনতে পারে না।

বই পড়ার রেশ কাটিয়ে নতুন উপলব্ধি তৈরি করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাস ঘিরে একই নামে ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমার কথা মনে পড়ে। আবার এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। এক্ষেত্রে ‘চোখের বালি’ উপন্যাস ও সিনেমার কথাই বলা যায়। উপন্যাসে যেমন রবীন্দ্রনাথের স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট। সিনেমায় ঋতুপর্ণ ঘোষের নির্মাণশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। ফলে পাঠক ও দর্শক মনে দুটোরই ভিন্ন রেশ তৈরি হয়। তবে এটি তখনই ঘটে, যখন কেউ বইও পড়ে এবং বইভিত্তিক সিনেমাটিও দেখে। ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি আগেই পড়ার কারণে বনলতা এক্সপ্রেস দেখতে সিনেমা হলে প্রবেশের সময় তাই সবার আগে প্রশ্ন জেগেছিল, এ সিনেমা কি হতাশ করবে নাকি পরিতৃপ্তির অনুভব দেবে?

এক কথায় বললে পরেরটিই উত্তর। সে পরিতৃপ্তির পেছনে অবশ্যই বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।

‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসটি পড়ে পাঠকের মনে হতে পারে মানবজীবন এক প্রকার ভ্রমণ, অনেকটা ট্রেনে চেপে দূর গন্তব্যে যাত্রা করার মতো। একেকটা বয়সের যেমন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকে, তেমনি ট্রেনের বগি ও কামরাগুলোও হরেক রকমের হয়। এসব কামরায় নানা রঙের মানুষ কিছুক্ষণ ঠাঁই নেয়। তবু এ অল্প সময়ের যাত্রা নানা কারণে হয়ে উঠতে পারে ঘটনাবহুল। এরই সাবলীল উপস্থাপন দেখা যায় কথাসাহিত্যিক হমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসে।

আবার কোনো যাত্রী এক স্টেশনে নেমে গেলে তার কাছে যেমন অন্য যাত্রীর আর খোঁজ থাকে না, তেমনি উপন্যাসটি পড়ে শেষ গন্তব্য অব্দি যাওয়া পর্যন্ত ট্রেনযাত্রীদের কী পরিণতি হয়েছিল সেটাও জানা যায় না। ঔপন্যাসিক এর শেষটা রেখেছিলেন ‘ওপেন এন্ডিং’। এ ধরনের উপন্যাসে যেমন ভাবের জগতে পাঠকের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়, তেমনি কিছুটা অতৃপ্তিও থাকে—শেষ দেখতে চাওয়ার সহজাত বাসনা। সে আকাঙ্ক্ষা অনেকটাই সফলতার সঙ্গে পূরণ করেছেন পরিচালক তানিম নূর ও তার দল। আয়মান আসিব, সামিউল ভুঁইয়ার লেখা চিত্রনাট্য ও সংলাপে পরিপক্বতা ছিল। তার চেয়ে বেশি লক্ষণীয় ছিল প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা। সে চেষ্টাই দর্শককে হাসিয়েছে, একই সঙ্গে ভাবগাম্ভীর্যেও নিয়ে গেছে। তবে চিত্রনাট্য ও সংলাপ যত ভালোই হোক না কেন, অভিনয়শিল্পীর নিপুণতা ছাড়া তা সার্থকভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা যায় না। তাই এবার সে প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।

বনলতা এক্সপ্রেসের প্রধান যাত্রী (প্রোটাগনিস্ট) কে বা কারা তা বলা যায় না, যেমন ট্রেনের যাত্রীদেরও একটাই পরিচয় থাকে, তারা সবাই যাত্রী। সে বিবেচনায় বলা যায়, প্রতিটি ক্যারেক্টার যতটা স্ক্রিনটাইম পেয়েছে, নিজেদের সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্র বেশ মানানসইভাবে রুপালি পর্দায় এসেছে। এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার হলেন কাস্টিং ডিরেক্টর তানিয়া রহমান। অধ্যাপক আবদুর রশিদের চরিত্রে মোশাররফ করিম, শিক্ষামন্ত্রী আবুল খায়ের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, সুরমা চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন, চিত্রা চরিত্রে সাবিলা নূর ও তার বড় চাচার চরিত্রে ইন্তেখাব দিনার, আফিয়া চরিত্রে জাকিয়া বারী মম, আজিজ চরিত্রে শ্যামল মাওলা এবং তাদের মেয়ের চরিত্রে ত্রিধা পাল মান, ডাক্তার আসহাব হিসেবে শরিফুল রাজ এবং তার মায়ের চরিত্রে শামীমা নাজনীনসহ বাকিদের অভিনয়ও ছিল প্রশংসনীয়। তবে শ্যামল মাওলার অভিনয় বেশ ভালো হলেও তার চরিত্র নিয়ে আরো কিছুটা কাজ করা যেত বলেই মনে হয়েছে। উপন্যাসের মৌলভির চরিত্র পাল্টে ভিন্নভাবে তাকে উপস্থাপনের চিন্তা ও চেষ্টা সিনেমাকে প্রাসঙ্গিক হতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। তবে সে চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বা স্ট্রাগল আরো স্পষ্ট করার সুযোগ ছিল। সেক্ষেত্রে কিছুটা হতাশ হতে হয়েছে। এর বাইরে চিত্রা চরিত্রকে আরো বাস্তবিক করা গেলে ভালো হতো। এ চরিত্রের গল্পের সঙ্গে শুরুর দিকে সাবিলা নূরের অভিনয় ও মেকআপ নিয়ে কাজ করা যেত। হয়তো বিবাহবিভ্রাটের জট সিনেমার শেষে সামনে আনার জন্য সেটি করা হয়নি। তবে শুরুতে এর একটা আঁচ বা এ নিয়ে এক ধরনের দ্বিধা তৈরি করা গেলে শেষের সঙ্গে যোগসূত্রটা আরো গভীর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

এ তো গেল পর্দার চরিত্রের কথা। পর্দায় না থেকেও দর্শককে আনন্দে আপ্লুত করেছেন নুহাশ হমায়ূন। সিনেমাটি শুরুই হয় তার ন্যারেশন ও বিভিন্ন ট্রেনের দৃশ্যের বর্ণনার মধ্য দিয়ে। বাচনভঙ্গিতে তিনি কেবল সাবলীলই নন, তার স্বরের ওঠানামাও ছিল যথাযথ। তবে কোনো কোনো দৃশ্যে তার ন্যারেশনের উচ্চারণ নিয়ে খটকা লাগে। কিন্তু সেটাও সিনেমা শেষে পরিষ্কার হয়; বিদেশে বড় হওয়া সন্তানের বাংলা উচ্চারণে এ ধরনের প্রভাব দেখা যায়।

গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপ, অভিনয় এগুলোর বাইরে সিনেমাকে সিনেমা করে তোলে সিনেমাটোগ্রাফি। এটি আবার সেট ডিজাইনের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে আবার ‘স্পেস’ অনেক গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষত প্রতিটি চরিত্রকে পর্দায় যথাযথভাবে উপস্থানে। ট্রেনে স্বাভাবিকভাবেই জায়গা কম থাকে। ফলে এমন কম স্পেসে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নির্ধারণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হয়। সে বাড়তি সতর্কতার প্রতিফলন পাওয়া যায় প্রায় সবখানেই। সেটা ট্রেনের কামরার বাইরের সংকীর্ণ যাতায়াতের পথে চিত্রা ও ডা. আসহাবের কথোপকথনের দৃশ্যে হোক বা অধ্যাপকের কামরায় একাধিক চরিত্রের উপস্থিতিতে আজিজের হাত বেঁধে রাখার দৃ্শ্য হোক। বরকত হোসেনের সিনেমাটোগ্রাফিতে তার সৃজনশীলতার ছাপ দেখা যায়। সেই সঙ্গে শিল্প নির্দেশনাও ছিল নান্দনিক। রাতের ট্রেনে আলো-আঁধারির খেলা মনোরম লেগেছে। যদিও জঙ্গলের দৃশ্যের আলোর মেকি ভাবটা কাটানো গেলে সেটা আরো মনোরম হতে পারত। তবে এসব দৃশ্যের সঙ্গে সুরের সংযোগ বেখাপ্পা ছিল না; ছিল পরিমিত ও প্রয়োজনমাফিক।

সব মিলিয়ে বলা যায় ঈদের সিনেমা হিসেবে ভালো উপহার পেয়েছে ঢাকাই চলচ্চিত্র ও দর্শক।

আরও