দেশের প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরার জন্মদিন আজ। প্রায় তিন দশক ধরে দেশের সংগীতাঙ্গনে তার অবদান অনস্বীকার্য। শুধু নজরুলসংগীত নয়, উচ্চাঙ্গসংগীত থেকে আধুনিক সব ধরনের সংগীতে সমানভাবে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন তিনি। তার কণ্ঠ ও সুরের জাদুতে বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন।
শৈশব: প্রাণবন্ত ও দুরন্তপনা
ফেরদৌস আরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবার চাকরির কারণে শৈশব থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করতে হয়েছিল তাকে। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের পৈতৃক বাড়িও তার শৈশবের স্মৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি কৌতূহলী, প্রাণবন্ত ও দুরন্তপনা ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তাকে বলত, মেয়েটি যেন ছেলে হয়ে জন্মেছে। নতুন পোশাক, ছেলেদের মতো খেলা, গাছে ওঠা—সবই ছিল তার নিত্য অভ্যাস। সেই দুষ্টুমি ও সাহসিকতার মধ্যে লুকিয়ে ছিল তার সংগীতপ্রেম, যা পরে তাকে পৌঁছে দেয় অনন্য উচ্চতায়।
সংগীতের সঙ্গে পরিচয়
ফেরদৌস আরা পারিবারিকভাবেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বাবা ছিলেন একজন গায়ক এবং ক্ল্যাসিক্যাল সংগীতের বিশেষজ্ঞ। বাড়িতে রাত জেগে ওস্তাদদের নিয়ে আসর বসত, যা ফেরদৌস আরার সংগীতের প্রতি আগ্রহ আরো তীব্র করেছিল।
ছোটবেলায় তিনি বোনদের সঙ্গে ক্ল্যাসিক্যাল গান শিখলেও আধুনিক সংগীতের প্রতি আগ্রহও কম ছিল না। বাবার কাছ থেকে ক্ল্যাসিক্যাল গান শেখার চেষ্টা তিনি সবসময় অব্যাহত রেখেছেন।
১৯৭২ সালে রেডিও এবং পরে বিটিভিতে অডিশন দিয়ে প্রথমবার দেশের শ্রোতাদের সামনে প্রতিভা প্রদর্শন করেন তিনি। সে অডিশনেই তাকে চলচ্চিত্রে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। ভারতের সমরেশ মজুমদার ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ বিশিষ্ট শিল্পীরাও তাকে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ফেরদৌস আরা সবসময় নিজেকে সংগীতের সঙ্গেই রেখেছেন।
সুরসপ্তক: শিক্ষার মঞ্চ
২০০০ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুরসপ্তক’, যেখানে বহু শিক্ষার্থী ক্ল্যাসিক্যাল ও নজরুলসংগীত শিখেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতি তার ভালোবাসা ও যত্ন তাকে শিক্ষার্থীদের প্রিয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত করেছে।
তার শিক্ষকতা কেবল সংগীত শেখানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, তিনি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাদের সংগীতভিত্তিক চিন্তাভাবনা ও মানসিক উন্নয়নে অবদান রাখেন।
জন্মদিন উদযাপন
ফেরদৌস আরার জন্মদিনে তার শিক্ষার্থীরা বিশেষ আয়োজন করে গান পরিবেশন করেন। চ্যানেল আইসহ বিভিন্ন মিডিয়া তার জন্মদিন উদযাপন করে থাকে, যেখানে শিক্ষার্থী ও সংগীতপ্রেমীরা উপস্থিত থাকেন। প্রতি বছর সুরসপ্তকে শিক্ষার্থীরা জন্মদিনের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আজও তার শিক্ষার্থীরা চ্যানেল আইয়ের আয়োজন করা অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করবেন। দুপুরে তারকা কথন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে শিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা ফেরদৌস আরার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
সংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, নিউহ্যাম ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড, সানরাইজ রেডিও অ্যাওয়ার্ড, জয়নুল আবেদিন পদক, নজরুল পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।
এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগীত মহল থেকে পেয়েছেন নানা সম্মাননা ও পুরস্কার।