সাম্বা থেকে বাউল: কোক-স্টুডিওর সুরে বিশ্ব ভ্রমণ

কোক স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়েছিল এমন এক অসাধারণ ভাবনা নিয়ে, যেখানে একটি দেশের আঞ্চলিক সঙ্গীতকে বৈশ্বিক মহলে পৌঁছে দেয়া হবে। ২০০৭ সালে ব্রাজিলে ‘কোকা-কোলা জিরো স্টুডিও’ নামে এক প্রচারমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে জন্ম নেয় এই ধারণা।

কোক স্টুডিও বাংলার তৃতীয় সিজনে মুক্তি পেয়েছে 'মহা জাদু' শিরোনামের একটি গান। বাংলার বাউলিয়ানা আর ফারসি কবিতার অদ্ভুত এক আবেশ সৃষ্টি হয়েছে এ গানে। বাউল সাধক দুরবীন শাহ-এর শিষ্য, গীতিকবি খোয়াজ মিয়ার কথা আর হাবিব ওয়াহিদ ও তাজিকিস্তানের শিল্পী মেহেরনিগরি রুস্তামের কণ্ঠে গানটি হয়ে উঠেছে প্রেম আর অনুভূতি প্রকাশের নতুন সুর। এরই মধ্যে গানটি সংগীতপ্রেমীদের হৃদয় স্পর্শ করেছে। সম্প্রতি এ প্ল্যাটফর্মের 'লং ডিসট্যান্স লাভ' গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গানের সেট, কস্টিউম এবং কোরিওগ্রাফি—সবকিছুতেই ছিল এক নস্টালজিক আবহ। এর আগে 'বাজি' গানটিও শ্রোতাদের হৃদয়ে বাজিমাত করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে কোক স্টুডিওর তৃতীয় সিজন চলছে। এর আগে দুটি সিজনে 'নদীর কূল', 'একলা চল রে', 'কথা কইও না', 'নাসেক নাসেক'—এসব গান শ্রোতাদের মন জয় করেছে। প্রতিটি গানেই ছিল বাংলার সংস্কৃতির শিকড়ের সঙ্গে আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। আর এটাই কোক স্টুডিওর আসল বৈশিষ্ট্য—লোকজ সুরকে আধুনিক আঙ্গিকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন।

কোক স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়েছিল এমন এক অসাধারণ ভাবনা নিয়ে, যেখানে একটি দেশের আঞ্চলিক সঙ্গীতকে বৈশ্বিক মহলে পৌঁছে দেয়া হবে। ২০০৭ সালে ব্রাজিলে ‘কোকা-কোলা জিরো স্টুডিও’ নামে এক প্রচারমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে জন্ম নেয় এই ধারণা। কোকা-কোলা কোম্পানি তখন নোকিয়ার একটি নতুন মিউজিক ফোনের সঙ্গে যৌথভাবে ভিন্নধর্মী বিপণন কৌশল খুঁজছিল। প্রচলিত বিজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়, একটি লাইভ মিউজিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে, যেখানে দর্শকরা আরো ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত হতে পারবেন।

তখনও এটি ছিল মাত্র এককালীন একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু ব্রাজিলের সংগীতপ্রেমীরা ফিউশন সংগীত পছন্দ করায় সাম্বা, বসা নোভা, ফ্রেভো ইত্যাদি জনরার মিশ্রণে তৈরি সেই এক্সপেরিমেন্ট ব্যাপক সাড়া ফেলে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কোকা-কোলা জিরোকে তরুণ প্রজন্মের চোখে 'কুল' ও 'আধুনিক' ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করা। তবে দর্শকের বিপুল সাড়া দেখে এককালীন সেই আয়োজন আর থেমে থাকেনি—এটি পরিণত হয় এক ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক যাত্রায়।

এরপরের বছর, ২০০৮ সালে, পাকিস্তানে শুরু হয় 'কোক স্টুডিও'—একটি লাইভ মিউজিক টেলিভিশন রিয়েলিটি শো। ২০০০ সালের দিকে পাকিস্তানের সফট ড্রিঙ্কস বাজারে আধিপত্য ছিল পেপসির। তারা আগে থেকেই জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ক্রিকেট ও মিউজিককে বেছে নিয়েছিল, যেমন—২০০২ সালের 'ব্যাটল অব দ্য ব্যান্ডস' আয়োজন। ফলে তরুণদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিল পেপসি।

এই পরিস্থিতিতে কোকা-কোলার পাকিস্তান অফিসের মার্কেটিং প্রধান নাদিম জামান উদ্যোগ নেন নতুন পরিকল্পনার। তিনি সঙ্গীতজ্ঞ রোহেল হায়াত ও তার স্ত্রী উম্বর হায়াতকে যুক্ত করেন, যারা আঞ্চলিক গান নিয়ে কাজ করছিলেন। তারা ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানের সুফি, কাওয়ালি, গজল ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী ধারাকে আধুনিক ফিউশনে উপস্থাপন করেন। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—হারিয়ে যাওয়া ধ্রুপদি ও আঞ্চলিক সংগীতের ধারা আবার ফিরে আসে আলোচনায় এবং তরুণ প্রজন্মকে মুগ্ধ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই উপমহাদেশজুড়ে কোক স্টুডিওর ভক্তসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে পাকিস্তানে চলছে এর ১৫তম সিজন।

পাকিস্তানের সাফল্যের পর কোক স্টুডিও ছড়িয়ে পড়ে ভারত, বাংলাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায়। ভারতে ২০১১ সালে কোকা-কোলা ইন্ডিয়া ও এমটিভি ইন্ডিয়ার যৌথ উদ্যোগে শুরু হয় 'কোক স্টুডিও এমটিভি', আর ২০২৩ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় 'কোক স্টুডিও ভারত'। ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রয়েছে দুই প্রধান শাস্ত্রীয় ধারা—হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটকী সঙ্গীত—সঙ্গে রয়েছে লোকসঙ্গীতের বিশাল ভাণ্ডার। এই প্ল্যাটফর্ম হারিয়ে যাওয়া বহু সঙ্গীতধারাকে ফিরিয়ে এনেছে নতুন প্রজন্মের কাছে। বর্তমানে সেখানে চলছে এর তৃতীয় সিজন।

কোক স্টুডিও কেবল ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের পুনর্জাগরণই ঘটায় না, বরং প্রতিটি সেশনে ব্যবহার করে স্থানীয় বাদ্যযন্ত্র ও সঙ্গীতধারা। বিভিন্ন ভাষা, স্টাইল ও জনরার সমন্বয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য মিউজিক এক্সপেরিমেন্ট। মূলধারার জনপ্রিয় গায়কদের পাশাপাশি লোকসংগীত, গজল বা অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত শিল্পীদেরও সুযোগ দেয় এই মঞ্চ, যা তাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।

আরও