মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গান শোনে। তবে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত গান শোনাকে অভ্যাসই বলা যায়। আমার এমন এক অভ্যাস আছে। বিকালে অফিসের কোলাহল সরিয়ে কাজে মনোযোগ দিতে গানের আশ্রয় নেয়া; হেডফোনে গান শোনা। একের পর এক গান বেজে যায়, আমার সেদিকে খেয়াল থাকে না। বেশির ভাগ সময়ই পরিচিত গানগুলো ঘুরেফিরে বাজতে থাকে; নতুন গান এড়িয়ে চলি। কেননা নতুনত্ব সবসময় তার দিকে মনোযোগ নিয়ে যেতে চায়। এর পরও কোনো কোনোদিন পুরনো গানেরই কোনো কথা নতুন করে আকৃষ্ট করে। ক’দিন আগেও এমনটা ঘটল। কি-বোর্ডে চলমান আঙুল থেমে গেল শুনে, ‘কাজাল নেহি ম্যায়, গালো কা তিল হুঁ, মিট তা নেহি ম্যায়, কিতনা মিটা লো/মেরা তো হাটনা মুশকিল বাড়া হ্যায়, তুম সামনে সে শিশা হাটা লো’। অর্থাৎ যদি প্রেয়সীকে দূরে রাখতে চাও তবে নিজের সামনে থেকে আয়না সরাতে হবে। এ যেন প্রেমের নিবেদন, একই সঙ্গে প্রচ্ছন্ন এক ব্যথার আভাস। মূলত এভাবেই বারবার আবিষ্কার করেছি ইরশাদ কামিলকে। গান বা গানের কথা শুনে গীতিকারকে খুঁজতে গিয়ে বেশির ভাগ সময় পেয়েছি ইরশাদ কামিলের উপস্থিতি। কামিল লিখলেন, ‘পাল ভার ঠেহের যাও, দিল ইয়ে সাম্ভাল যায়ে, কেইসে তুমহে রোকা কারু’; যেন যদি কোনো উপায় না থাকে ফেরানোর তবে প্রেমিকের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে এক জীবন।
ইরশাদ নতুন করে আলোচনায় এসেছেন পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’র তেরে পাস ম্যায় গানের মধ্য দিয়ে। তবে তিনি কখনো আলোচনার বাইরে থেকেছেন কিনা তা নিয়েও সন্দেহ হয়। কেননা সিনেমার জগতে পা রাখার পর থেকে গীতিকার ইরশাদ কামিল প্রেম, প্রার্থনা, বিরহ-বাসনার মতো মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত সব অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন কালির আঁচড়ে। দরগায় বসে ‘কুন ফায়া কুন’, কিংবা প্রেমিকার সামনে বসে ‘কউন তেরে বিন মেরা’ গাওয়া যেন একই অসহায়ত্ব, বাসনার প্রকাশ ঘটায়।
২০০২ সালে সুরকার সন্দেশ শান্ডিল্যর সঙ্গে পরিচয়, যিনি তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তরুণ পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর কাছে। গীতিকার হিসেবে নয়, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন কবি হিসেবে। সেই প্রথম আলাপন থেকেই তাদের মধ্যে গভীর এক ভরসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই ভরসাই ইরশাদকে গান লেখার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল, যা আজ অবধি বজায় আছে। আর ইরশাদ সেই ভরসাকে বৃথা যেতে দেয়নি। পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর বেশির ভাগ সিনেমার গানের কথা লিখেছেন ইরশাদ এবং প্রায় সবগুলো গান ভিন্ন জনরায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। ২০০৭ সালের জাব উই মেট সিনেমার ‘তুম সে হি’ বা ২০১১ সালের রকস্টার সিনেমার ‘কুন ফায়া কুন’ বা ‘নাদান পারিন্দে’, ২০১৪ সালের হাইওয়ে সিনেমার ‘পটাখা গুড্ডি’, ২০১৫ সালের তামাশার ‘আগার তুম সাথ হো’ বা ২০২৬-এর ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গার ‘তেরে পাস ম্যায়’ সেই জনপ্রিয় গানের তালিকার খুবই ছোট একটা অংশ। ইমতিয়াজ আলীর বাইরেও যেসব পরিচালকের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন, সেখানেও উপহার দিয়েছেন এমন গান যা খ্যাতির রেকর্ড গড়েছে। গত বছর মোহিত সুরির পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া ‘সাইয়ারা’ সিনেমার টাইটেল ট্র্যাক তার অন্যতম উদাহরণ। এ প্রসঙ্গে আনন্দ এল রায়ের রানঝানা সিনেমার টাইটেল ট্র্যাকের কথা না বললেই নয়। সালমান খান ও আনুশকা শর্মা অভিনীত সুলতান সিনেমার ‘বুল্লেয়া’ গানও এক অনন্য উদাহরণ। এভাবেই বলিউডে পা রাখার পর থেকে একের পর এক গান উপহার দিচ্ছেন ইরশাদ। সেখানে আছে আধ্যাত্মিকতা, সুফিবাদের সুরও।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চামেলি’ সিনেমার গান লেখার মধ্য দিয়ে তার বলিউডে অভিষেক ঘটে। এ সিনেমার অন্যতম খ্যাতি পাওয়া গান ছিল ‘ভাগে রে মান কাহি’, যেটা চিত্রায়িত হয় কারিনা কাপুরের ওপর। এমনকি ইরশাদ লিখেছেন বলিউডের ‘সোয়্যগ সে কারেঙ্গে সাবকা সুয়াগাত’-এর মতো গানও। একজন মানুষ এত ভাব, এত বোধ গানে সাজিয়ে আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন তা ভেবে অবাক হতে হয়।
ভিন্ন গান তিনি কীভাবে লেখেন সে প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইরশাদ কামিলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজেও ঠিক জানেন না এটা কীভাবে ঘটে। জেনে ফেললে সেটা হয়তো একটা ফর্মুলায় পরিণত হতো। আর ফর্মুলায় সৃজনশীলতা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই তিনি নিজেকে বরং ওই চরিত্রের জায়গা রাখেন, যাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে গানে। তার ভাষ্য, ‘তিনি নিজেই জর্ডান হয়ে যান, বেদ হয়ে যান, আদিত্য কিংবা সুলতান হয়ে যান। সেসব চরিত্রের জায়গায়, তাদের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তবেই তিনি লিখতে পারেন।’
আজ এ খ্যাতিমান গীতিকারের জন্মদিন। তার গানের কথা দিয়েই তাকে শুভেচ্ছা জানানো যায়, ছোট হোক বা বড়, ইরশাদ কামিলের গল্প থেকে যাবে গানের জগতে।