আর কয়েক দিন পেরোলেই আসছে নতুন বছর ২০২৬। নতুন বছরের আগমনী বার্তা যখন কানে শোনা যাচ্ছে তখনই মনে পড়ে চলতি বছরের সুখ,–দুঃখ, স্মৃতি ও হারানো মুহূর্তগুলো। এ বছরে যেমন ছিল বিনোদন অঙ্গনের সাফল্য ও অর্জন, তেমনি ছিল হারানোর বেদনা। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও সংগীতাঙ্গন হারিয়েছে একাধিক গুণী ও জনপ্রিয় শিল্পীকে। যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন কাজ করে দর্শক ও শ্রোতাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন। ২০২৫ সালটি তাই শুধু নতুন কাজ, আলোচনায় থাকা সিনেমা বা গান দিয়েই চিহ্নিত নয়, বছরটি স্মৃতি হয়ে থাকবে একাধিক প্রিয় মুখের বিদায়ের জন্যও। এবছর ঢাকাই শোবিজ হারিয়েছে যাদের তাদের নিয়ে এ আয়োজন...
অঞ্জনা রহমান
বছরের শুরুতেই শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলা চলচ্চিত্রে। জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অঞ্জনা রহমান ৪ জানুয়ারি রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নৃত্যশিল্পী হিসেবে তার শিল্পীজীবনের সূচনা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আশি ও নব্বই দশকে একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে তিনি দর্শকদের ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশ ছাড়াও তিনি নয়টি দেশের ১৩টি ভাষার সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও পরিচিত করে তোলে। অভিনয় ও নৃত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ দেশী ও আন্তর্জাতিক বহু সম্মাননা লাভ করেন। তার বিদায়ে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
প্রবীর মিত্র
অঞ্জনা রহমানের মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই শোবিজ অঙ্গনে আসে আরেকটি দুঃসংবাদ। ঢালিউড চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রবীণ ও জনপ্রিয় অভিনেতা প্রবীর মিত্র ৫ জানুয়ারি ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। সংযত, মার্জিত ও চরিত্রনির্ভর অভিনয়ের জন্য তিনি দর্শকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিলেন।
গুলশান আরা আহমেদ
চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী গুলশান আরা আহমেদের মৃত্যুতে শোকাহত হয় নাটক ও সিনেমাপাড়া। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি মারা যান। চলচ্চিত্রে তিনি হৃদয়ের কথা, ডাক্তার বাড়ি, ভালোবাসা আজকাল, লাল শাড়িসহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। টেলিভিশন নাটকেও তিনি ছিলেন পরিচিত ও নিয়মিত মুখ। সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ব্যাচেলর পয়েন্টে কাবিলার মা পলি চেয়ারম্যান চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান। পার্শ্বচরিত্রে তার স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।
জীনাত রেহানা
সংগীতাঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয় প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী জীনাত রেহানার মৃত্যুতে। তিনি ২ জুলাই সকালে মৃত্যুবরণ করেন। সাগরের তীর থেকে গানটির মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতে স্থায়ী পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে তার সংগীতজীবন শুরু হয়। কর্মজীবনের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে নিয়মিত গানে তাকে পাওয়া যায়নি। তবুও তার কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো আজও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
এ কে রাতুল
জুলাইয়ে সংগীতাঙ্গন হারায় আরেক প্রতিভাবান শিল্পী এ কে রাতুলকে। তিনি ২৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। ব্যান্ড ওন্ড-এর ভোকালিস্ট ও বেজিস্ট হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন প্রয়াত চিত্রনায়ক জসীমের পুত্র আধুনিক ব্যান্ডসংগীতে তার অবদান তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
জাহানারা ভূঁইয়া
চলচ্চিত্রে নারীকেন্দ্রিক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পরিচিত অভিনেত্রী জাহানারা ভূঁইয়া ২৫ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি মারা যান। সত্তর ও আশি দশকে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি গীতিকার, নির্মাতা ও প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন। দেশের নারী নির্মাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। চলচ্চিত্রে নারীর গল্প ও অবস্থান তুলে ধরতে তার অবদান চলচ্চিত্রাঙ্গনে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ফরিদা পারভীন
বছরের শেষভাগে এসে দেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে গভীর শোক। কিংবদন্তি লালনসংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন ১৩ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এ নন্দিত শিল্পী। ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্ম নেয়া ফরিদা পারভীন প্রায় ৫৫ বছর সংগীতচর্চায় যুক্ত ছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি দেশাত্মবোধক গান গাইলেও পরবর্তী সময়ে লালনসংগীতের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মিলন হবে কত দিনে ও অচিন পাখির মতো গান তার কণ্ঠে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ হয়ে আছে।
সাঙ্কু পাঞ্জা
ঢাকাই চলচ্চিত্রের পরিচিত খল অভিনেতা সাঙ্কু পাঞ্জা ২৯ মে মৃত্যুবরণ করেন। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বহু চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার অভিনীত চরিত্রগুলো দর্শকের মনে শক্ত ছাপ রেখে গেছে।
তানিন সুবহা
চিত্রনায়িকা তানিন সুবহা ১০ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৩১ বছর। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর প্রথমে চিকিৎসা নেয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। অল্প সময়ের অভিনয়জীবনেই তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে একজন সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।