রহমান সাহেবের মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। তাদের ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার নাবিল সাহেব আজকে দুপুরে সব স্টাফকে অফিসের টাকায় শুধু লাঞ্চই খাওয়াননি, তাদেরকে জানিয়েছেন, তাদের অফিসের সব ফুল টাইম স্টাফই আগামী মাস থেকে অন্ততঃ একটা ইনক্রিমেন্ট পাবেন। তাদের ব্রাঞ্চের আয় ভালো হওয়ায় হেড অফিস থেকে এই অর্ডার এসেছে। রহমান সাহেব সাহস করে ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন নি যে, তিনি কয়টা ইনক্রিমেন্ট পাবেন। যাইহোক অন্তত একটা ইনক্রিমেন্ট যে পাবেন তাতেই তিনি খুশি। বাড়িওয়ালা গত মাসেই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। ইনক্রিমেন্টের বাড়তি কয়টা টাকায় তার বাড়ি ভাড়ার বাড়তি টাকাটার অন্তত সংকুলান হবে এটা ভেবেই তিনি খুশি।
রহমান সাহেব সাধারণত ক্যাশে কাজ করেন কিন্তু আজ তাদের আইটি অফিসার সাফাত সাহেব অফিসে আসেন নি, তাই ম্যানেজার সাহেব তাঁকে সাফাত সাহেবের কাজ করতে বলেছিলেন। তাদের অফিসের আইটি অফিসারের কাজটা এমন জটিল কিছু নয় । কিন্তু রহমান সাহেব আইটি তে একটু কাঁচা। তাই হাতের কাজ শেষ করতে করতে অনেক দেরী হয়ে গেল। মাঝে তাদের অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ছলিম মিয়া এসে বলেছিল, “স্যার আকাশের অবস্থা তেমন ভালো না। আপনার কি অনেক দেরী হইব, একটু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হইত, নাইলে আবার বাসায় যাওনের সময় কিছুই পামু না”। ছলিমের কথা শুনে রহমান সাহেবের মনেও বাসায় ফেরার সময়ের ভোগান্তির কথা মনে করে একটু শঙ্কা হয় । কিন্তু যখন তার মনে পরে, গত মাসেই তাদের অফিসের দুজনের চাকরি চলে গেছে, তিনি তখন আর বাসায় ফেরার শঙ্কাটাকে আমলে না নিয়ে বলেন, “আরে চিন্তার কি আছে? এই বর্ষা বাদলার দিনে তো আকাশ একটু আধটু খারাপ থাকবেই, বাসায় ফিরতে তো একটু কষ্ট হবেই। কিন্তু তাই বলে তো কাজ শেষ না করে আর বাসায় ফেরা যাবে না। ম্যানেজার স্যার আমাকে যে পেপারগুলো রেডি করে দিতে বলেছেন ,ওগুলা শেষ না করে বাসায় গেলে স্যার অনেক রাগ করবেন। তারচেয়ে বরং দুইকাপ লেবু চা করতো, দুইজনে খেয়ে নিই”। রহমান সাহেবের কথা শুনে ছলিমের মনটা দমে যায়। সে মনে গজগজ করতে করতে দুইকাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসে। ছলিম অল্প কিছুদিন হল নতুন বিয়ে করেছে। সে ভাবছিল আজকে রবিবার, একটু দ্রুত ফিরতে পারলে অন্ততঃ মহাবীর সিরিয়ালটা বউয়ের সাথে বসে দেখতে পারবে। গতকালের এপিসোডটা খুব জমাট এক মহা এপিসোড ছিল। নায়িকা অনিন্দিতার জীবনে এক মহাসংকট চলছে। একদিকে তার স্মৃতি ফিরে আসায় আগের স্বামী মিলনের জন্য তার তীব্র আকুলতা, আবার দুর্ঘটনার পরে ঘটনাক্রমে বিয়ে হওয়া দেবতার মত দ্বিতীয় স্বামী নয়ন, তার নতুন শ্বশুর-বাড়িকেই বা সে কী করে করে অস্বীকার করবে? আজকে মহাবীর সিরিয়ালটির চারশ একতম এপিসোডটা তার নির্ঘাৎ মিস হয়ে যাবে। এখন সিরিয়াল দেখা তো দূরের কথা, তার বাসায় ফিরাই তো দায় হয়ে পড়বে। কাজে মগ্ন থাকায় রহমান সাহেব ছলিমের মুখের দিকে তাকানই নি। তাই ছলিমের বিরক্ত মুখটা তার চোখে পড়ে না ।
তাদের ব্রাঞ্চের ইনটেরিয়রটা এমন যে, তাদের ডেস্কে বসে বাহিরের আবহাওয়া আঁচ করার কোন উপায় নেই। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের এই বহুতল বিল্ডিংয়ে ফুডপান্ডার খাবার আসতে পারে, কাপড় বা কসমেটিকসের অনলাইন ডেলিভারি আসতে পারে, কিন্তু সূর্যের আলো ঢোকার কোন উপায় নেই। কাজ শেষ করে রহমান সাহেব তার হাতের মোবাইলে দেখেন রাত সাড়ে আটটা বাজে। বাসায় সবাই তার জন্য দুশ্চিন্তা করতে পারে। তিনি তার প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করলেন। তিনি দেখেন, তার মোবাইলে এগারটি মিসড কল। তিনি দেখলেন এক দুইটি বাদে, সবই তার বাসার কল৷ অফিসের কলটি তার সমপর্যায়ের কর্মকর্তা সামাদ সাহেবের। তিনি মাত্র চার বার কল করেছেন। অবশ্য সামাদ সাহেবের স্বভাবটাই এমন, তার সব কলই জরুরী কল। তিনি দেখেন যে, তার স্ত্রী শেফালী,দুইবার তার মোবাইলে কল করেছিল। গত মাসেই ম্যানেজার সাহেবের কড়া নির্দেশ পেয়েছেন, তারা শুধুমাত্র কোন জরুরী কল না হলে অফিসিয়াল কল ছাড়া অন্য কোন কল করতে পারবেন না। রহমান সাহেবের মোবাইলে কোন অফিসিয়াল কল আসে না, তাই তিনি মোবাইলের রিংটোনই অন রাখেন না। পাঁচটার পরে মোবাইলে কথা বললে ম্যানেজার সাহেবের আর কিছু বলার কথা না, কিন্তু পাঁচটার পরেও রহমান সাহেব প্রায়ই রিংটোন অন রাখার কথা ভুলে যান। তিনি শেফালীকে কল করতেই শেফালী তাঁকে বলেন, “এদিকে তো অনেক বৃষ্টি হচ্ছে, তুমি কোথায়?” শেফালীর কণ্ঠের উৎকণ্ঠার রেশ শুনে রহমান সাহেব বলেন, “বিয়ের এতদিন হয়ে গেল, এখনো তোমার আমাকে নিয়ে এতো ভয়?” শেফালী বলেন, “আরে নাহ, আমি তোমাকে ফোন করেছিলাম এটা জানাতে যে , বাসায় কিন্তু মাছ মাংস ডিম কিছুই নাই। বাচ্চারা বায়না ধরেছে, তাই খিঁচুড়ি চড়াব। তুমি ডিম বা সস্তায় মাছ পেলে ভাজি করার মতো একটা মাছ কিনো”। তিনি সামাদ সাহেবকেও কল করলেন, কিন্তু কলটা রিসিভ হল না।
ছলিমকে সব কিছু গুছিয়ে রাখতে বলে তিনি অফিস থেকে বের হলেন। বের হয়েই তিনি দেখেন রাস্তায় খানিকটা পানি জমে গেছে। তিনি তাই তার জুতা জোড়া খুলে ব্যাগে রেখে দেন, ব্যাগ থেকে স্পঞ্জের স্যান্ডেলটা বের করেন। তিনি রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার তেমন কোন চাপ দেখলেন না । তিনি হাটঁতে শুরু করলেন। তার অফিস থেকে খানেকটা দূর হেঁটে মিরপুর রোড থেকে সাধারণত তিনি বাসে ওঠেন।
বৃষ্টির গতি তখন অনেক কমেছে, টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তাই তিনি আর ছাতা মেললেন না। কয়েক পা এগুতেই তিনি দেখেন বিভিন্ন সাইজের ইলিশ মাছ নিয়ে ফুটপাতে একজন মাছ বিক্রির আশায় বসে আছে। কিন্তু তার সেখানে কোন ক্রেতা নেই। রহমান সাহেব জিজ্ঞেস করেন, “কি মিয়া, ইলিশের হালি কত?”
“তা স্যার, কয় হালি লইবেন? আর কোনগুলা লইবেন?”, দোকানী রহমান সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন। “এই ধরো, মাঝারি সাইজের বা জাটকাগুলো” “স্যার জাটকা বা মাঝারিগুলা কেন খাইবেন?এই বড় গুলা লন স্যার; একদম খাঁটি ইলিশ স্যার কেনা দামে বেচমু ৫০০০ টাকা হালি হইলেই বেইচ্চ্যা দিমু”।রহমান সাহেব লক্ষ্য করেন, বড় মাছগুলোর পেটে কোন ডিম নেই বলেই তার মনে হয়। তিনি জানেন ডিমওয়ালা ইলিশের স্বাদ কম হয়। তার একবার ইচ্ছা করে দরদাম করে দেখতে কিন্তু এতগুলো টাকা চলে গেলে মাস চলবে কি করে- এ ভাবনা থেকে তিনি আর সে কথা না পেড়ে বলেন, না, জাটকা আর মাঝারিগুলারই দাম কত?”
“স্যার বড়গুলান কিন্তু অনেক ভালা আছিল, স্যার। এমুন কম দামে এই সিজনে আর এমুন ভালা ইলিশ পাইবেন না”।
“না না মিয়া, আমি যেটা চাই, সেটারই দাম কত সেইটা বল?”
“স্যার, জাটকাগুলার হালি পড়ব ২৪০০ টাকা, আর মাঝারিগুলা পড়ব ৩৬০০ টাকা”।
“এইটা তোমার কম দাম? এককথায় কত পড়ব, কইয়া দাও।”
“স্যার আপনার লাইগা প্রতি পিস ৫০ টাকা কমাইতে পারুম, এর বেশী আর কিছু কইয়েন না, স্যার।”
কিছুক্ষণ দামাদামি করে রহমান সাহেব এক হালি জাটকা ১৬০০ টাকায় আর একটা মাঝারি গোছের ইলিশ ৭০০ টাকায় কিনেন।
রাত নয়টা বাজে। এতো রাতেও সেখানে অনেক যাত্রীর জটলা। মিরপুর রোডের বাসস্টপে পৌঁছে দেখেন, রাস্তায় বেশ খানেকটা পানি জমেছে, বেশ জ্যামও পড়েছে।
তিনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কোন বাসেই ওঠতে পারলেননা । তাই তিনি ভাবলেন তিনি হেঁটেই কিছু দূরে এগিয়ে কোন রিকশা করে বাসায় যাবেন। কিন্তু প্রায় এক-দেড় কিলোমিটার গিয়েও তিনি কোন রিকশা পেলেন না। তিনি অনেকটা হাঁপিয়ে উঠলেন। বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টা করার পর একটা সিএনজি পেলেন। তিনি সাধারণতঃ সিএনজিতে চড়েন না । তবুও তার মনে হল, ড্রাইভার বড্ড বেশী ভাড়া নিল। তার ঘড়িতে তাকিয়ে রাত সোয়া দশটা বেজে গেছে দেখে রহমান সাহেবের মনে হল একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। তিনি রিং রোড থেকে নেমে আদাবরে তার গলির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
তিনি লক্ষ্য করলেন গলির ল্যাম্পপোস্টগুলোতে কোন আলো জ্বলছে না। তিনি মোবাইলটা বের করতেই তার দুই পাশে হঠাৎ ভোজবাজির মত দুইজন ইয়াং ছেলে এসে দাঁড়াল। তাদের একজন এসে তার পেটে একটা চাকু ধরে বললো, "বুড়া মিয়া মোবাইল, টাকা- পয়সা সব দিয়া দাও।“ তিনি বিজলীর আলোয় তাকিয়ে দেখলেন চাকুর ধারালো মাথাটা চকচক করছে। তিনি একবার ভাবলেন, যদি তিনি চিৎকার করে ওঠেন, নিশ্চয়ই দুই পাশের বাসা থেকে কেউ না কেউ বের হয়ে আসবে। কিন্তু তৎক্ষনাৎ তিনি সেই চিন্তা বাতিল করে দিলেন। আবার ভাবলেন, তিনি একবার দৌড় দিয়ে দেখবেন কিনা, কিন্তু তার পায়ের ওজন যেন অনেকগুণ বেড়ে গেছে বা গেঁথে গেছে কোন চোরাবালিতে, তিনি পা নাড়াতেই পারলেন না। তিনি আলগোছে হাতে ধরে থাকা মোবাইল, পকেটে থাকা মানিব্যাগটা তাদেরকে দিয়ে দিলেন । তাদের একজন তাঁকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে নিজেরা দুইজন দৌড়ে পাশের একটা গলিতে উধাও হয়ে গেল। রহমান সাহেব ধীরে ধীরে ওঠে দাঁড়ালেন, সজোরে পড়ে গেলেও তিনি শরীরে কোন ব্যথা অনুভব করছিলেন না। তিনি রাস্তায় পড়ে থাকা তার জাটকাভর্তি পলিথিন ব্যাগটাও তুলে ধরলেন।
রহমান সাহেব বাসায় ঢুকতেই শেফালী ও তার ছেলে-মেয়ে চার্জার লাইটের আলোয় তাঁকে দেখে আঁতকে উঠলো।
"কি ব্যাপার তোমার সারা গায়ে ময়লা, কপালে রক্ত? কি হয়েছে তোমার? নিশ্চয়ই তুমি ফোনে কথা বলতে বলতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়ে এটা করেছ? তোমাকে কতবার বলেছি রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মোবাইলে কথা বলবেনা।" শেফালী ফোঁস করে ওঠলেন।
"মা, তুমি চুপ করো তো, আগে বাবাকে হাত-মুখ ধুতে দাও, পিয়ালী তুই বাবাকে তোয়ালেটা দে তো", তার ছেলে রাতুল বলল।
"রহমান সাহেব কিছুই না বলে রান্নাঘরে মাছের ব্যাগটা রেখে টয়লেটে গেলেন।" টয়লেট থেকে ফিরে এসে বেডরুমের মেঝেতে বসে স্ত্রী ও ছেলে মেয়েকে সব কিছু খুলে বললেন।
"কে তোমাকে মাছ কিনতে গিয়ে অত দেরি করতে বলেছিল? যদি আর পাঁচ-দশটা মিনিট আগেও বাসায় ফিরতে তাহলে হয়তো আর এমনটা হতো না। অল্প কিছুক্ষণ আগেই তো ইলেকট্রিসিটি চলে গেল। যদি জায়গাটাতে আলো থাকত, তাহলেই তো শয়তানগুলো এমন কিছু করতে পারত না। এখন বাঁকী মাসটা যাবে কি করে? আর মোবাইল ছাড়াই বা তুমি চলবে কি করে?"
"কি আর করবো বলো, না হয় আমাদের একাউন্ট্যান্ট ফরিদ সাহেবকে বলে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে কিছু টাকা তুলব।" - ম্রিয়মাণ কণ্ঠে বলে গেলেন রহমান সাহেব।
"সে তো তুমি বলেই খালাস, তা এখনই যদি প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে সব টাকা তুলতে থাক, মেয়ের বিয়ে দিবেই বা কিভাবে, আর বুড়ো বয়সে খাবেই বা কি? করো তো ছাই এমন চাকরী যে চার আনার পেনশনও পাবে না।"
"মা, তুমি কিন্তু বাবাকে বড্ড জ্বালাচ্ছ, এমনিতেই বাবার উপর দিয়ে এত বড় একটা ধকল গেল, তাঁকে তো আগে খেতে দিবে, না কি? তবে বাবা, সত্যিই তুমি যদি লোডশেডিংয়ের আগে গলিতে ঢুকতে তাহলে সত্যিই হয়ত এমন একটা বিপদ হতো না।" পিয়ালী বাবাকে বলে।
"আরে রাখ তো, ইলেকট্রিসিটি থাকলেই যেন রাতে ঢাকা শহরে আর ছিনতাই হয় না। তবে হ্যাঁ, বাবা, এটা কিন্তু ঠিক, তুমি যদি একটু বুদ্ধি করে সিএনজিটা বাসা পর্যন্ত নিয়ে আসতে তাহলে কিন্তু এমন কিছু হতো না। না হয় আর সামান্য কিছু ভাড়ার টাকাই যেত।"
খিঁচুড়ির সাথে বাড়তি পেঁয়াজ, মরিচ আর তেল মেখে খাওয়াটা রহমান সাহেবের খুব প্রিয়। শেফালীর যেন তার সাথে হৈ চৈ করে তার প্রতি মায়া জাগে, রহমান সাহেব শুধু খাবার নাড়াচাড়া করছেন, তেমন কিছুই মুখে দিচ্ছেন না দেখে শেফালী নরম কন্ঠে বলেন, “যা হবার হবে, তুমি একটু ভালো করে খাও তো।”
“আমার কাছে খিঁচুড়িটা কেমন যেন তিতা লাগছে, মনে হয় জ্বর আসবে।” বলে রহমান সাহেব ওঠে পড়েন।
রাত যত বাড়তে থাকে, রহমান সাহেবের শরীরের তাপমাত্রাও যেন তত বাড়তে থাকে। শেফালী সারা রাত মাথায় পানি ঢেলে, স্পঞ্জিং করেও তাপমাত্রা তেমন কমাতে পারেন না। সকালে রাতুল অফিসে ফোন করে জানিয়ে দেয় রাতের ঘটনার কথা, বাবার জ্বরের কথা।
রহমান সাহেবের হালকা জ্বর থাকলেও তিনদিন পরে তিনি আর বাসার কারো কথা না শুনে অফিসে গেলেন। অফিসে যেতেই সামাদ সাহেব রহমান সাহেবের ডেস্কে আসেন তার খোঁজ নিতে। তাঁকে আবার সবকিছু খুলে বলতে হয় রহমান সাহেবকে।
"তা ভাই, ভাবী কিন্তু ঠিকই বলেছেন, এমন ঘোর বর্ষার দিনে কেন ভাই গেলেন এতক্ষণ অফিসে থাকতে? এই যে এত অফিস অফিস করলেন, এখন অফিস কি আপনার জন্য কিছু করবে? করবে দুই পয়সার সাহায্য? বড়জোর আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাই আপনাকে দিবে লোন হিসেবে। আর আপনিও বটে ভাই, এই ছিনতাইকারীদের ভয়ে আবার জ্বর বাধিয়ে ফেললেন?”- সামাদ সাহেব বলেন। রহমান সাহেব তাকে একটা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ছলিম এসে জানায় ম্যানেজার সাহেব রহমান সাহেবকে সালাম দিয়েছেন।
ম্যানেজার সাহেব আবার রহমান সাহেবের মুখে সব বৃত্তান্ত শুনে বলেন, “রহমান সাহেব, অফিসের কাজ করেছেন ভাল কথা, কিন্তু বুঝতে তো হবে, দিনকাল ভালো না। এমন বর্ষা-বাদলার দিনে এমন একটা ঘটনা তো ঘটতেই পারে। একবার ভাবুন তো যদি ওই ব্যাটা ছিনতাইকারীরা আপনার পেটে চাকুটা চালিয়ে দিত আপনার পরিবারের সর্বনাশ হতই, এ অফিসেরও একটা ব্যাড পাবলিসিটি হোত। আমি ফরিদ সাহেব কে বলে দেব যাতে আপনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাটা দ্রুত পেয়ে যান। আর একটু বুঝে-শুনে চলাফেরা করবেন, বুঝেছেন?”
“জ্বি স্যার”, বলে রহমান সাহেব নিজের ডেস্কে ফিরে আসেন।
“স্যার আপনার কপালটা অনেক ভালো। এসব ছিনতাইকারীরা তো প্রায়ই নেশাখোর হয়, কথায় কথায় মানুষের পেটে চাকু চালিয়ে দেয়। তয় স্যার, আমি কিন্তু আপনারে আগেই কইছিলাম, আকাশের গতিক ভালো না, লন বাড়িত যাই গা । গরীবের কথা বাসি হলে ফলে।”
রহমান সাহেবের যেন এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তিনি ছলিমকে কড়া ধমক দিতে গিয়ে বুঝতে পারেন, আসল পাপটা তো তারই, নিশ্চয়ই সবাই ভুল বলতে পারেনা, তিনি যদি দ্রুত বাসায় ফেরার চেষ্টা করতেন, তাহলে তো কিছুই হত না। তিনি ছালিমের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলেন, কিন্তু ছলিম তার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝে না। রহমান সাহেব নিজেই কি ছাই বোঝেন? তিনি শুধু বুঝতে পঝেন, তিনি বড্ড পাপী।