পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ইশা সাহা। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু কাকতালীয়ভাবে অভিনয়ে আসা। এরপর অভিনয়ই পেশা। টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল’ দিয়ে অভিনয়ে অভিষেক ইশার। বড় পর্দায় অভিষেক হয় অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘প্রজাপতি বিস্কুট’ দিয়ে। অভিনয় করেছেন ৩০-এর বেশি কনটেন্টে। এর মধ্যে ‘গুপ্তধনের সন্ধানে’, ‘সোয়েটার’, ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’, ‘বুড়ো সাধু’, ‘গোরা’ ও ‘ইন্দু’ দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ছেলেবেলা, অভিনয়, অবসরসহ নানা বিষয়ে ইশার কথা হয়েছে বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদুর রহমান
বনেদি বাড়ির বউ থেকে প্রায়-গোয়েন্দা, ‘ইন্দু’র চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে প্রথম কী মনে হয়েছিল?
ইন্দুর স্ক্রিপ্টটা যখন হাতে আসে, আমার কাছে ভীষণ ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। এমন একটা গল্প, এমন একটা ব্যাকগ্রাউন্ড, এমন একটা মেয়ে, যে নিজের পারসোনাল ক্রাইসিস থেকে বিয়ে করে এবং তারপর বাড়িতে এসে এক অদ্ভুত সিচুয়েশনের মুখোমুখি হয়। ভালো লাগার মতোই।
নারীকেন্দ্রিক এ গল্প দর্শকের ওপর বেশ প্রভাব ফেলেছে। পুরো বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
যখন প্রথম স্ক্রিপ্টটা পেয়েছিলাম, তখনই মনে হয়েছিল এটা খুব ইউনিক একটা গল্প। টিভি বা সিনেমায় আমরা বহুবার নারীকেন্দ্রিক গল্প দেখেছি। ওটিটির ক্ষেত্রে ট্রেন্ডটা আসলে আমরাই প্রথম সেট করেছি অথবা ইন্দুই প্রথম সেট করেছে। যেখানে একদম পাশের বাড়ির এক মেয়ের জীবনে এতকিছু ঘটে। নিজের বোন, বাবা-মা, সমাজ সবার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে এ গল্প।
ইন্দু সিরিজের দৃশ্যে ইশা সাহা
আপনার অভিনয় জীবন শুরু ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল দিয়ে। ক্যামেরার সামনে আসার আগের ইশা সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার ছেলেবেলা, পড়াশোনা...
এটা একটা ভীষণ বড় কাকতালীয় ঘটনা। আমার কখনই অভিনয় করার কথা মনে হয়নি। মায়ের শাড়ি পরে সাজগোজ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করিনি কখনো। কোনো ধারণাই ছিল না যে এমন একটা জগৎ আছে। কারণ আমাদের বাড়িতে খুব বেশি টিভি দেখা হতো না। নাটক বা থিয়েটার করার সংস্কৃতি ছিল না, কেউ করতও না। আমার কোনো বড় ভাইবোন ছিল না, আমিই বাড়িতে বড়। পিসির ছেলেরা ব্যস্ত থাকত ব্যবসায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত, কেউ আবার অন্য দেশে পড়াশোনা করত।
আমি একটু বড় হওয়ার পর সিনেমার গান, একটু একটু টিভি দেখা এভাবে ধীরে ধীরে বিনোদনের জগৎ চিনলাম। মনে আছে, তখন ক্লাস এইট বা নাইন; যে সময় মেয়েরা প্রেম বোঝে, লাভ স্টোরি কি জিনিস বোঝে, সিনেমার নেশা কি এসব অনুভব করতে শেখে। সে সময়ই শাহরুখ খানের প্রতি এক অদ্ভুত ভালোবাসা জন্মেছিল। তার আগে বা পরে সিনেমার জগৎটা আমার কাছে ছিল ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে।
আমি খুব সাধারণ ছিলাম। কখনো মনে হয়নি যে আমি অভিনয় করব বা করা সম্ভব। আমাদের কাছে এমন কোনো অপশনই ছিল না। আমি বই পড়তাম, খুব বাধ্যগত ছিলাম। তেমন দুষ্টামি করতাম না। স্কুলও ছিল খুব কাছে। কখনো সাইকেল চালাতেও দেয়া হয়নি, দরকার পড়েনি।
জীবনে আফসোস আছে অনেক। ছোটবেলায় এসব না হওয়ার কারণে। আমি শান্ত স্বভাবের ছিলাম, সব কিছু মেনে নিতাম, কোনো প্রশ্ন করতাম না। প্রেমটাও তেমন হয়নি ছোটবেলায়। কলেজে উঠেই প্রেম হয়েছে। তখন খুব ভীতু ছিলাম, যদি কেউ বাবা-মাকে বলে দেয়! বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতাম, ওরা আমাকে চিনত, কিন্তু অপরিচিত কারো সঙ্গে চলাফেরা করতাম না।
কোনো শখ?
আমি আঁকতে ভালোবাসতাম, বাধ্য ছিলাম বলে পড়াশোনাও হতো। বড় হলাম আস্তে আস্তে। তারপর গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলাম। হঠাৎ করেই ল (আইন)-এর প্রতি খুব আগ্রহ জন্মাল। ল পড়া শুরু করলাম। মনে আছে, গ্র্যাজুয়েশনের সময় খুব একটা পড়াশোনা করতাম না। কলেজে উঠলে যেমন সবার পাখনা গজায়, আমারও গজিয়েছিল। একদম পড়তাম না। বেশ ফাঁকি দিতাম, যদিও ক্লাস কখনো বাদ দিইনি। সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য ক্লাস ফাঁকি দেয়া আমার হয়নি। তবে যখন ল পড়া শুরু করি, তখন সত্যি সত্যি মন দিয়ে পড়তাম। ভাবতাম হয়তো একদিন জজ (বিচারক) হব। জজ হওয়ার স্বপ্ন ছিল। লইয়ার হওয়ার কথা খুব একটা ভাবিনি।
অথচ সেখান থেকেই অভিনয়ে চলে এলেন।
হ্যাঁ। সে জায়গা থেকে হঠাৎই এ জগতে চলে আসা, পুরোটাই কাকতালীয়। তখন আমি লয়ের লাস্ট ইয়ারে। একদিন একটি চ্যানেলের এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমার নাম্বার নেন। কিছুদিন পর তিনি ফোন করে অডিশনে যেতে বললেন। কিন্তু আমি তখন অলরেডি কলেজ থেকে সুপ্রিম কোর্ট ভিজিটে ছিলাম, তাই যেতে পারিনি।
দুই মাস পর আবার তারা যোগাযোগ করেন এবং একবার অন্তত অডিশনে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তখন আমি প্রশ্ন করেছিলাম, অডিশনটা আসলে কী! তারপর গেলাম। মনে আছে, আমি একটুও মেকআপ করে যাইনি। যিনি অডিশন নিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যাগে কাজল আছে?’ বললাম, নেই। তিনি নিজের কাজল দিলেন। বললেন, ‘এটা একটু লাগাও, তারপর ক্যামেরার সামনে এসো।’ আমি কাজল লাগিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। তখনই মনে হয়েছিল, এটা আমি পারব না।
কিন্তু কয়েক দিন পরই সারপ্রাইজিংভাবে কল এল, আমি সিলেক্টেড, আমাকে ওয়ার্কশপে যোগ দিতে হবে। তারা আমাকে চ্যানেলের অডিশনের জন্য প্রস্তুত করবে।
ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল টিভি সিরিজে ইশা ছবি: জিও হটস্টার
তার পরই ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল?
একদম। ওভাবেই শুরু হয়েছিল কাজটা। আমি একটু নিজের মতো করে এক্সপেরিমেন্ট করতে চেয়েছিলাম, দেখি কী হয়। অন্যথায় আমি তো হাইকোর্টে ইন্টার্নশিপ করছিলাম। আমার সবসময় মনে হতো, গিয়ে দেখি কী হয়।
ওয়ার্কশপে গিয়ে আমার দারুণ লেগেছিল। এমনিতে আমি খুব ইন্ট্রোভার্ট ছিলাম। সেখান থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে এক্সপ্রেস করতে শেখা, এটা একেবারেই নতুন লাগত। শুরুতে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাইনি। আর কোর্টে ফেরা হয়নি। সেই থেকে আজও কাজ করছি।
তদন্তভিত্তিক গল্পে বেশকিছু কাজ আপনি করেছেন। বিশেষত ‘সোনাদা’ সিরিজ, তারপর ‘ইন্দু’। আবার একাডেমিক দিক থেকে আইনের ছাত্রী আপনি। সিনেমা সিরিজে তদন্তভিত্তিক গল্পে কাজ করতে গিয়ে বিষয়গুলো কখনো আইন বা আইনজীবীর দৃষ্টিতে দেখেছেন?
আমার মনে হয়, সোনাদার ক্ষেত্রে গল্পগুলোয় তদন্ত ঠিক খুব একটা নেই। গল্পগুলো ইতিহাসনির্ভর। পুরোটাই সোনাদা সামলাচ্ছে। ঝিনুক, আবির অবশ্যই মাথা খাটাচ্ছে, কিন্তু সোনাদাই আসল কাজটা করছে। কিন্তু সেটা তদন্ত ঠিক নয়। ইন্দু যেটা করেছে, সেটাও তদন্ত বলতে পারি না। ইন্দু তো গোয়েন্দা না। ইন্দুর ভাবার ধরন একটু ভিন্ন। আপনি যেটাকে তদন্ত বলছেন, এটাকে আমি তদন্ত বলতে রাজি নই। যদি তদন্তও বলি, সেটার ধরনটা ভীষণ আলাদা। সোনাদা এক ভাবে ভাবে আর ইন্দু আরেক ভাবে রহস্য উন্মোচন করে।
আরেকটা বিষয় হলো, এ চরিত্রগুলো তৈরি হয়ে আসে। যারা লেখেন, তারা অনেক ভেবে-চিন্তে চরিত্র ও গল্প তৈরি করেন। অভিনয় করতে গিয়ে আমরা সেটাই অনুসরণ করি। সে জায়গা থেকে আমার মনে হয়নি যে আমার আইনের ডিগ্রি আছে বলে আমার একটু বেশি সুবিধা হচ্ছে। তবে হ্যাঁ, আইনজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একটু ডিফারেন্ট অবশ্যই হতো।
ছবি: অভিনেত্রীর ফেসবুক
অর্থাৎ অভিনেতা নিজেকে চরিত্র অনুসারে তৈরি করেন। সেখান থেকেই আরেকটি প্রশ্নে আসি। এখন অবধি আপনাকে নানা চরিত্রে দেখা গেছে। প্রজাপতি বিস্কুটে এক রকম, ইন্দুতে আরেক রকম। সোয়েটারের টুকুকে দর্শক মনে রাখবে অনেক দিন। এক-একটা চরিত্রের জন্য নিজেকে কীভাবে তৈরি করেন?
আমার মনে হয়, দর্শক সারা জীবন মনে রাখবে সোয়েটারের জন্য। বলে না, নিজের অভিনীত সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কোনটা তা কখনও বলা যায় না। আমার কাছে সব চরিত্রই আমার নিজের বাচ্চা-কাচ্চা। আমার অভিনীত চরিত্রগুলো আমারই সন্তান। সে জায়গা থেকে প্রত্যেকটা চরিত্রই আমার ভীষণ কাছের।
আমি ট্রেইনড অ্যাক্টর নই। থিয়েটার করিনি। আমি রিঅ্যাক্ট করি। আমাদের বলা হয় অভিনয় মানে রিঅ্যাক্ট করা। এটাই আমি শিখেছি। আমার মনে হয়, অভিনয় যত স্বাভাবিক হবে, তত বেশি দেখতে ভালো লাগবে।
আমার প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় স্ক্রিপ্ট দিয়ে। স্ক্রিপ্টেই সব লেখা থাকে। রাইটার আর ডিরেক্টরের হেল্প তো পুরো শুটিংয়েই পাই। সে জায়গা থেকে কোথাও একটা চরিত্রের গ্রাফ তৈরি হয়ে যায়। একটু মাথা পরিষ্কার করে নিয়ে স্ক্রিপ্টটা ভালোভাবে পড়লে আমি মনে করি স্ক্রিপ্টই বাইবেল, সবকিছু তার মধ্যেই আছে। বাকিটা নিজে থেকে হয়ে যায়। ফ্লোরে গেলেই জাস্ট হয়ে যায়।
অভিনয়ের প্রসেস জানলাম। এবার আপনার শখ, অবসর যাপন, ভ্রমণ ও পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে জানতে চাই।
এখন অবসরে নানা কনটেন্ট দেখতে থাকি। আমার মনে হয়, আমাদের পেশায় যারা আছি, তাদের মাথা খালি রাখা খুব জরুরি। আমি মাঝে মাঝে সত্যিই কিছু করি না। বাড়িতে সারা দিন পড়ে থাকি। কখনো নিজের জন্য রান্না করি, বাড়ি পরিষ্কার করি। কখনো শুধু বাড়িতে অলস বসে থাকা ভালো লাগে। গান শুনি, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করি, কারণ সারা বছর কাজের ব্যস্ততায় সেটা হয় না।
আমি ঘুরতেও খুব পছন্দ করি। মাঝে মাঝে চেষ্টা করি পালিয়ে যাওয়ার। যখন মনে হয়, একটা প্রজেক্ট শেষ হয়েছে আর খুব তাড়াতাড়ি আরেকটা শুরু হবে, বা যখন মনে হয়, একটি প্রজেক্ট খুব বেশি হিট করেছে এবং এবার আমার একটা বিরতি দরকার, তখন আমি কলকাতা থেকে বেরিয়ে যাই।
বই পড়তে এখনো ভালো লাগে। চেষ্টা করি বই পড়ার, যদিও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ঘর সাজাতে ভালো লাগে। বাগান করতে ভালো লাগে। এগুলোই আমার শখের মধ্য পড়ে।
নতুন কী কাজ আসছে?
ডিসেম্বরে আসছে ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’। সৃজিত মুখার্জি পরিচালনা করেছেন। আগামী বছরও কিছু কাজ আসবে। বছর দুয়েক আগে কৌশিক গাঙ্গুলির ‘অসুখ বিসুখ’ নামে একটি সিনেমায় কাজ করেছিলাম। এখনো রিলিজ হয়নি। আমি প্রতি বছরই আশা করি যে রিলিজ হবে। মনে হচ্ছে, আগামী বছর হয়তো মুক্তি পেতে পারে।
এছাড়া রোহান সেনের পরিচালনায় ‘নায়িকা’ নামে একটি সিনেমা করেছিলাম। সেটিও আগামী বছর রিলিজ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ‘তেজপাতা’ নামের আরো একটি সিনেমা রেডি হয়ে আছে। আপাতত এ চার সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় আছে।
বাংলাদেশে কখনো আসা হয়েছে? বাংলাদেশের কনটেন্ট দেখা হয়?
আমি বাংলাদেশ থেকে অনেক মেসেজ পাই। ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে অসংখ্য মেসেজ পেয়েছি। অনেক প্রশংসাই পেয়েছি। আমার বাংলাদেশে যাওয়া হয়েছে, তবে কোনোবারই কাজের সূত্রে নয়। আর আমি বাংলাদেশের সিনেমা দেখি, নাটকও দেখি। তবে এখন কিছুটা কমে গেছে। কভিডের সময় প্রচুর দেখতাম।
বাংলাদেশের দর্শকের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
বাংলাদেশের সব দর্শককে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ, কারণ আপনারা এত দূরে বসে আমার কাজ দেখেন, অ্যাপ্রিশিয়েট করেন। কার না ভালো লাগে অ্যাপ্রিশিয়েশন পেতে! আমারও দারুণ লাগে। সেটা যদি পাশের দেশ থেকে আসে, তাহলে তো অনুভূতিটা আরো বিশেষ হয়ে যায়।