না-মানুষী গোয়েন্দারা জানাল, হত্যাকারী কে

ছোট একটা মফস্বল শহর ডেনব্রুক। একদিন সেখানে একটি মৃত্যু হয়। সবাই স্বাভাবিক মৃত্যু ভাবলেও কেউ কেউ বলে লোকটিকে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ সে কথা মানে না। ডেনব্রুকে হুট করেই এসে পড়ে এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ, এরকুল পোয়ারোর মতো কেউ কিংবা প্রদোষ মিত্রর মতো। প্রচলিত ধারার হলে এভাবেই এগোত গল্পটা, কিন্তু এখানে তেমনটা হয় না। ডেনব্রুকের ভেতরেই চলে তদন্ত, এতে পুলিশ অফিসারকে সাহায্য করে কিছু ভেড়া। তারাই শিপ ডিটেকটিভ।

ডেনব্রুকের এক রাখাল জর্জ হার্ডি। সে একাই বসবাস করে। বিস্তীর্ণ মাঠের এক পাশে তার থাকার জায়গা। সকাল থেকে সন্ধ্যা কাটে ভেড়াদের পরিচর্যা করে। জর্জ তার প্রতিটি ভেড়াকে একটি নাম দিয়েছে। কেননা জর্জ মনে করে, এ ভেড়ারা প্রত্যেকেই এক একটি সত্ত্বা। এদের নাম থাকা উচিত। ভেড়াদের সঙ্গে জর্জের দারুণ সখ্য। সন্ধ্যায় সে ভেড়াদের সামনে বসে পড়ে শোনায় গোয়েন্দা কাহিনী।

জর্জ হয়তো জানে না, তার ভেড়ারা আসলেই গোয়েন্দা গল্পগুলো বুঝতে পারে। কিন্তু তারা আসলেও পারে। কেননা ক্লিফ হ্যাঙ্গারে কাহিনী রেখে জর্জ উঠে গেলে সবার মধ্যেই একটা চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তারা জানতে চায়, কে আসলে অপরাধী। শেটল্যান্ড শিপ লিলি তখন নানা যুক্তি দিয়ে অপরাধী কে তা বলে। পরদিন দেখা যায়, লিলির যুক্তিই ঠিক। ভেড়াদের মতে, লিলিই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান ভেড়া।

এ রকম গল্প নিয়েই লিওনি সোয়ানের বই ‘থ্রি ব্যাগস ফুল: আ শিপ ডিটেকটিভ স্টোরি’। সে গল্প অবলম্বনে কাইলি ব্যলদা নির্মাণ করেছেন অ্যানিমেশন লাইভ অ্যাকশন ‘দ্য শিপ ডিটেকটিভস’, যেখানে জর্জের পালিত ভেড়াগুলোই সত্যিকারের গোয়েন্দা। তাদের রাখাল জর্জ মারা গেলে যখন সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে, লিলিই বুঝতে পারে সে মারা যায়নি। তাকে আসলে হত্যা করা হয়েছে। এরপর স্থানীয় পুলিশকে এ ভেড়ারাই নানাভাবে প্রমাণাদি দিয়ে হত্যাকারীর কাছে নিয়ে যায়।

কাইলি ব্যলদার সিনেমাটি নানা কারণেই ভিন্ন। প্রথমত, এ সিনেমায় আমরা না-মানুষী গোয়েন্দাদের দেখি। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভেড়াদের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি সম্ভব কিনা? প্রচলিত আছে ভেড়া প্রাণীটি গাধার মতোই বোকা। সে কারণেই ‘ভেড়ার পাল’ বাগধারাটি আমরা ব্যবহার করি। কিন্তু এ গল্প দেখায় প্রাণীদের মধ্যে সামান্য হলেও বুদ্ধিমত্তা যেমন আছে, তেমনি আছে মমত্ববোধ, কৃতজ্ঞতা, সহমর্মিতা।

জর্জের মৃতদেহ দেখে সব ভেড়া যখন মনে করে সে মারা গেছে, তখন লিলি জানায় জর্জের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তাকে সবাই সমর্থন করেনি। লিলি তার মতে অনড় থাকে। গল্পে দেখানো হয় এ ভেড়াদের মধ্যে একটা প্রথা আছে, তারা কষ্টের স্মৃতি ভুলে যায়। এক দুই তিন গোনার সঙ্গেই তারা একটা ঘটনা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু জর্জের মৃত্যুর শোক ভুলতে দেয়নি লিলি। কেননা সবকিছু ভুলে যেতে হয় না। ভুলে গিয়ে সুখে থাকা গেলেও কিছু বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।

এখানেই শেষ নয়, দ্য শিপ ডিটেকটিভস তার দর্শককে দেখায়, চাইলে সীমানা পেরিয়ে অনেক কিছু অর্জন করা যায়। এ সিনেমার ভেড়াগুলো একটা মাঠের বাইরে কখনো যায়নি। কিন্তু জর্জের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তাদের একটি পিচের রাস্তা পার হতে হয়। যে রাস্তা পার হতে তাদের ভয়। কেননা মাঠের বাইরের জীবন তাদের অজানা। একবার সে ভয়কে জয় করার পর তাদের কল্যাণেই ধরা পড়ে জর্জের খুনি।

সিনেমায় উইন্টার শিপ থাকে দুটো, সেবাস্তিয়ান নামের ক্যাসলমিল্ক মুরিট ও একটি ল্যাম্ব (লিলি যাকে জর্জ নাম দেয়)। ভেড়ার জন্ম সাধারণত বসন্তকালে হয়। শীতে জন্ম নেয়া অনাহূত ভেড়াদের ব্রাত্য ধরা হয়। কিন্তু এ গল্প দেখায় উইন্টার শিপ ব্রাত্য নয়, তারা পুরো পালেরই অংশ। লিলি ও মোপল বিপদে পড়লে তাদের বাঁচাতে সেবাস্তিয়ানই নিজের প্রাণ দেয়। শেষমেশ জর্জ হার্ডির হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে ছোট জর্জ।

জর্জ হার্ডির চরিত্রে খুব অল্প স্ক্রিন টাইম ছিল হিউ জ্যাকম্যানের। তবে তার মতো অভিনেতার নিজের রেশ ছড়িয়ে দিতে বেশি সময় লাগে না। সহজ সরল পুলিশ অফিসারের চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন নিকোলাস ব্রাউন। খল চরিত্রে নিকোলাস গ্যালিটজিনও ভালো। নিজ নিজ চরিত্রে ঠিকঠাক পারফর্ম করেছেন মলি গর্ডন, হং চৌ, এমা থম্পসন ও তোলি কোল। ভেড়াদের কণ্ঠ দিয়েছেন অনেকে, তবে এর মধ্যে লিলির জন্য জুলিয়া লুইস-ড্রেফস, সেবাস্তিয়ানের জন্য ব্রায়ান ক্র্যানস্টন, মোপলের চরিত্রে ক্রিস ও’ডওড, ক্লাউডের চরিত্রে রেজিনা হিল ও স্যার রিচফিল্ড চরিত্রে স্যার প্যাট্রিক স্টুয়ার্ট দুর্দান্ত। ক্রেইগ মাজিনের চিত্রনাট্যে দারুণ কিছু কমিক টাইমিং দর্শককে হাসায়, আবার কখনো কিছু সংলাপ আবেগীও করে তোলে।

সবশেষ বলা ভালো, দ্য শিপ ডিটেকটিভস একটা ফিল-গুড সিনেমা। ডেনব্রুক, জর্জ হার্ডি ও তার ভেড়াদের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও সিনেমায় সবই বাস্তব হয়ে ওঠে। ডেনব্রুকের মাঠে চড়ে বেড়ানো ভেড়াগুলোকে পরিচিত মনে হয়। তাদের একত্র তদন্ত বুঝিয়ে দেয়, একসঙ্গে কাজ করলে ভেড়ার পালও চমৎকার কিছু করতে পারে।

আরও