মহামারীর থাবায় বিপর্যস্ত দুটি বছর কাটাল আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প। এমনিতেই দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের সংকটের শেষ নেই। তার ওপর লকডাউনের প্রভাবে ২০২০ সালে মুক্তি পায় মাত্র ১৫টি সিনেমা। ২০২১ সালে এসে সংখ্যাটা ৩২ হলেও প্রেক্ষাগৃহ ছিল একেবারেই কম। কয়েক মাস সিনেমা হল চালু ছিল। কিন্তু দর্শককে হলমুখী হতে দেখা যায়নি। ফলে নির্মাণ সম্পন্ন হলেও অনেক সিনেমার মুক্তি পিছিয়ে দিয়েছেন প্রযোজকরা। ২০২২ সাল যদি মহামারী চোখ রাঙানি বন্ধ রাখে, তাহলে দেশের সিনেমাজগতের জন্য বছরটা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা গল্পনির্ভর, বিগ বাজেট ও তারকাবহুল বেশকিছু সিনেমা রয়েছে মুক্তির তালিকায়। নতুন বছরে মুক্তির প্রতীক্ষায় থাকা সিনেমাগুলো নিয়ে জেনে নেয়া যাক—
বঙ্গবন্ধু
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচনায় ছিল বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনার বঙ্গবন্ধু বায়োপিকটি। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মুম্বাইর দাদাসাহেব ফিল্ম সিটিসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সিনেমার ৮০ ভাগ দৃশ্যধারণ সম্পন্ন করেন প্রখ্যাত নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল। করোনার কারণে মাঝখানে বেশ সময় গেলেও গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে সম্পন্ন হয়েছে বিগ বাজেটের এ ছবির দৃশ্যধারণ। পোস্ট-প্রডাকশন শেষে এখন শুধু মুক্তির প্রতীক্ষা। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর বঙ্গবন্ধু সিনেমার মুক্তিকে কেন্দ্র করে বদলে যেতে পারে দেশের সিনেমা অঙ্গনের চেহারা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিশাল ক্যানভাসের সিনেমা, তার ওপর এটি নির্মাণ করেছেন ভারতের প্রখ্যাত নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল, সেই সঙ্গে এ ছবিতে অভিনয় করেছেন ঢাকাই সিনেমা ও নাটকের অসংখ্য জনপ্রিয় মুখ। সব মিলিয়ে ছবিটি নিয়ে বাঙালি সিনেপ্রেমী দর্শকের প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। এ ছবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ।
শান
নতুন বছরে সবার আগে মুক্তি পাবে সিয়াম আহমেদ ও পূজা চেরী অভিনীত সিনেমা শান। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া শান চলচ্চিত্রের শুটিং ২০২১ সালের মার্চে শেষ হয়। করোনার কারণে এতদিন ছবির মুক্তি আটকে ছিল। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা অনুযায়ী শান ৭ জানুয়ারি মুক্তি পাবে দেশের প্রেক্ষাগৃহে। অ্যাকশন থ্রিলার ধাঁচের ছবিটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি হয়েছে। সিয়াম-পূজা ছাড়াও চলচ্চিত্রটিতে আরো অভিনয় করেছেন তাসকিন রহমান, চম্পা, অরুণা বিশ্বাস, সৈয়দ হাসান ইমাম, মিশা সওদাগর, নাদের চৌধুরী, ডন, আরমান পারভেজ মুরাদ প্রমুখ। বছরের শুরুতেই পোড়ামন-২ জুটির হাত ধরে সুবাতাস বইতে পারে চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
মুখোশ
গত বছর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের সবচেয়ে আলোচিত নায়িকা ছিলেন পরীমনি। জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম ও জিয়াউল রোশানকে নিয়ে বড় পর্দায় হাজির হচ্ছেন পরীমনি। মোশাররফ করিমের কারণে হোক আর পরীমনির কারণে হোক, মুখোশ সিনেমাটি দর্শক টানবে তা বলে দেয়া যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ‘মুখোশ’
সিনেমাটি পরিবেশনার দায়িত্ব নিয়েছে প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান কপ ক্রিয়েশন। পরীমনি, মোশাররফ করিম ও জিয়াউল রোশান ছাড়াও সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজাদ আবুল কালাম, ইরেশ যাকের, প্রাণ রায়, রাশেদ মামুন অপু, ফারুক আহমেদ, তারেক স্বপন, এলিনা শাম্মিসহ অনেকেই। মুখোশ মুক্তি পাবে ২১ জানুয়ারি।
পাপ-পুণ্য
মনপুরা, স্বপ্নজাল-এর পর নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের তৃতীয় সিনেমা পাপ-পুণ্য। এটি প্রযোজনা করেছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। মনপুরার অভাবনীয় সাফল্যের পর আবার রুপালি পর্দায় আসছে গিয়াস উদ্দিন-চঞ্চল জুটি। এর সঙ্গে বাড়তি চমক হালের ক্রেজ সিয়াম আহমেদ। আরো রয়েছেন আফসানা মিমি ও সুমি। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি সিনেমাটি মুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া মুক্তির দিন-তারিখ নির্ধারণ না হলেও নিচের ছবিগুলো এ বছরে মুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
লিডার: আমিই বাংলাদেশ
বড় পর্দায় চমক মানেই দেশের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান। সারা বছর তিনি সিনেমা উপহার দিয়ে চাঙ্গা রাখেন প্রেক্ষাগৃহ। করোনার কারণে সে অর্থে গত দুই বছর বড় পর্দায় তার সিনেমা না থাকলেও চলতি বছর তার বেশ কয়েকটি সিনেমা দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম তরুণ নির্মাতা তপু খান পরিচালিত প্রথম সিনেমা লিডার: আমিই বাংলাদেশ। বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত শাকিব খান ছাড়াও ছবিটিতে অভিনয় করেছেন বুবলী, মিশা সওদাগর, শহীদুজ্জামান সেলিম, মাসুম বাশার, মিলি বাশার, প্রীতি, রিমু রেজা খন্দকার, সীমান্ত প্রমুখ। ছবিটি নিয়ে প্রতীক্ষায় আছেন বাংলা সিনেমাপ্রেমীরা।
অপারেশন সুন্দরবন
প্রথম সিনেমা ঢাকা অ্যাটাক নির্মাণ করে নিজেকে চিনিয়েছেন দীপঙ্কর দীপন। র্যাবের সহযোগিতায় তিনি এবার নির্মাণ করেছেন অপারেশন সুন্দরবন। করোনার কারণে গত বছর সিনেমাটি মুক্তি না পেলেও চলতি বছরের যেকোনো সময় মুক্তি পেতে পারে তারকাবহুল এ সিনেমা।
বিউটি সার্কাস
২০২০ সালেই মুক্তির কথা থাকলেও করোনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। চলতি বছর সিনেমাটি বড় পর্দায় দেখতে পারবেন বলে জানিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। মাহমুদ দিদার পরিচালিত এ ছবির নাম ভূমিকায় বিউটি চরিত্রে অভিনয় করছেন জয়া আহসান। আর নায়ক রংলাল চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবিএম সুমন। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন ফেরদৌস, তৌকীর আহমেদ, গাজী রাকায়েত প্রমুখ।
মুক্তির অপেক্ষায় আছে সম্ভাবনাময় অনেক সিনেমা। তার মধ্যে সরকারি অনুদানে নির্মিত টুঙ্গিপাড়ার দুঃসাহসী খোকা, জলে জ্বলে তারা, ভাঙন, দেশান্তর, জয় বাংলা, ছায়াবৃক্ষ, না বলা গল্প, ভালোবাসার প্রীতিলতা ইত্যাদি। অনুদানের ছবি ছাড়াও মুক্তি অপেক্ষায় আছে দুই বছরে জমে থাকা আরো অনেক ছবি। এর মধ্যে মিশন এক্সট্রিম-২, বিদ্রোহী, হাওয়া, রিকশা গার্ল, জ্বীন, ক্যাসিনো, দিন দ্য ডে, বর্ডার, পরান, শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২, ১৯৭১ সেইসব দিন, আদম, ঢাকা ২০৪০, সিক্রেট এজেন্ট, বিক্ষোভ, জেকে ১৯৭১ ছবিগুলোর শুটিং শেষ হয়েছে। কিছু ছবির শুটিং শেষের পথে। আবার কিছু ছবির শুটিং মাঝপথে। সবক’টি ছবিই মুক্তি পেতে পারে এ বছরে।
আশার কথা তো অনেক হলো। দুশ্চিন্তার কথাও বলা দরকার। করোনার তৃতীয় ধরন ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই লকডাউন শুরু হয়েছে। পাশের দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লির সব সিনেমা হল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। করোনা যদি দুই বছরের মতো তার তাণ্ডব অব্যাহত রাখে, তাহলে এ বছরই হতে পারে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে ক্ষতির বছর। কেননা টানা দুই বছর বিগ বাজেটের অনেক সিনেমা নির্মাণ করেও মুক্তি দিতে পারেননি প্রযোজকরা। তাদের বড় অংকের বিনিয়োগ আটকে আছে। এ অবস্থায় লগ্নি করা অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেলে এসব ছবি মুক্তি পাবে না। পাশাপাশি নতুন সিনেমা নির্মাণেও আগ্রহী হবেন না প্রযোজক-পরিচালকরা। এতে চলচ্চিত্র অঙ্গনে বড় সংকট সৃষ্টি হবে। টানা তিন বছর হলে না যাওয়ায় দর্শকদের অভ্যাসের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। সে রকম হলে মুখ থুবড়ে পড়বে বাংলা চলচ্চিত্র। সুতরাং ২০২২ সাল দেশের চলচ্চিত্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর।