এ উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়ে বিনোদন অঙ্গনেও। টেলিভিশন, ইউটিউব ও ওটিটির পর্দা ঘিরে তৈরি হয় আলাদা উত্তেজনা, আগ্রহ আর অপেক্ষা। ঈদের কয়েকটা দিন যেন পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি একসঙ্গে নড়েচড়ে বসে। বড় পর্দা ও ওটিটির পাশাপাশি টিভি নাটক ও ইউটিউবেও চলে নানা ধরনের নাটকের সমাহার। ঈদে নাটক এখন আর শুধু উৎসবের বাড়তি বিনোদন নয় বরং একটি বড় ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক বাজার হিসেবেও ধরা হয়, যেখানে তারকা, নির্মাতা, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনদাতা, স্পন্সর, ডিজিটাল প্লাটফর্ম আর কোটি দর্শকের অংশগ্রহণে তৈরি হয় এক বিস্তৃত ও সক্রিয় ইকোসিস্টেম।
ঈদ এলেই নাটকের জমজমাট মৌসুম
একটা সময় এমন ছিল যে ঈদে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের হাতেগোনা কয়েকটি একক নাটক বা একটি টেলিফিল্ম প্রচার করলেই বিশেষ আয়োজন সম্পন্ন হতো। কিন্তু আজকের দিন অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে টেলিভিশন, ইউটিউব চ্যানেল ও বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম মিলিয়ে প্রতিটি ঈদে ১০০-র বেশি বা কখনো কখনো কয়েকশ নাটক, টেলিফিল্ম, ওয়েবফিল্ম ও বিশেষ পর্বও প্রকাশ হচ্ছে।
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা এ দুই উৎসব ঘিরেই বছরের বড় অংশের নাট্যপ্রযোজনা পরিকল্পিত হয়। অন্যদিকে ইউটিউব চ্যানেলগুলো আগেভাগেই টিজার, ট্রেলার ও পোস্টার প্রকাশ করে দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে। ঈদের তিন থেকে পাঁচদিন দর্শক ধরে রাখার জন্য আলাদা প্লে লিস্ট, প্রিমিয়ার কাউন্টডাউন ও প্রচারণা চালানো হয়। ফলে শোবিজ অঙ্গনে ঈদ এখন বিনোদনের পাশাপাশি নাটকের সবচেয়ে বড় মৌসুমি উৎসব ও প্রতিযোগিতার সময় হয়ে উঠেছে।
বাড়তি বাজেট ও প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে ঝুঁকি
ঈদনাটকের বাজেটের বিষয়টি এখন নাট্যাঙ্গনে বড় আলোচনার জায়গা। সাধারণ সময়ে একটি একক টিভি নাটকের বাজেট, যেখানে ৩-৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, ঈদে সেটিই হয়ে যায় ন্যূনতম শুরুর খরচ মাত্র। উন্নত ক্যামেরা, নান্দনিক সেট, আউটডোর লোকেশন, বড় কাস্টিং, দীর্ঘ শুটিং শিডিউল—সব মিলিয়ে ব্যয় দ্রুত বেড়ে হয়ে যায় স্বাভাবিকের চেয়ে ডাবল বা তার চেয়ে বেশি।
ইউটিউবমুখী নাটক বা বিশেষ প্রজেক্টে বাজেট ৮-১০ লাখ টাকায় পৌঁছানো এখন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিছু বড় প্রজেক্টে ১০-১৫ লাখ টাকার বিনিয়োগের কথাও শোনা যায়। তবে নির্মাতারা মনে করেন, একক নাটকে অতিরিক্ত বড় বাজেট তুললে আর্থিক ঝুঁকি বেড়ে যায়। যদি সেটি ধারাবাহিক সিরিজ, সিকুয়াল বা ফ্র্যাঞ্চাইজি আকারে তৈরি না হয়, তাহলে অনেক সময় বিনিয়োগ ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঈদে নাটক মুক্তির আয়োজনের পেছনে থাকে হিসাব-নিকাশ ও নানা কঠিন সমীকরণ।
আয় আসে নানা পথে
ঈদনাটকের আয় কাঠামো বহুমাত্রিক। প্রথমত টেলিভিশন বিজ্ঞাপন। ঈদের আগে-পরে কয়েক দিন চ্যানেলগুলোর জন্য থাকে বিশেষ বাণিজ্যিক সময়। জনপ্রিয় নাটকের আগে ও মাঝখানে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের হার সাধারণ সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একটি ভালো নাটক শুধু দর্শকপ্রিয়তা নয়, চ্যানেলের জন্য বড় অংকের বিজ্ঞাপন আয়ও নিশ্চিত করে।
দ্বিতীয়ত স্পন্সরশিপ ও ব্র্যান্ড ইন্টিগ্রেশন। নাটকের শুরুতে প্রেজেন্টেড বাই বা পাওয়ার্ড বাই উল্লেখ থাকা এখন নিয়মিত চিত্র। অনেক সময় গল্পের ভেতরেও প্রডাক্ট প্লেসমেন্ট রাখা হয়। মোবাইল অপারেটর, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ই-কমার্স বা ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বাজেটের বড় অংশ উঠে আসে।
তৃতীয়ত ডিজিটাল রেভিনিউ। টিভিতে প্রথম প্রচারের পর একই নাটক ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড হয়। ভিউ, বিজ্ঞাপন ও মনিটাইজেশন থেকে আসে বাড়তি আয়। আবার ওটিটি প্লাটফর্মের জন্য এক্সক্লুসিভ রাইটস বিক্রি করেও নির্মাতারা নির্দিষ্ট অংক পান। সব মিলিয়ে একটি নাটক এখন বহু ধাপে আয় করে। তবে সব নাটক সমান জনপ্রিয় হয় না, ফলে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
তারকাবহুল কাস্টিংয়ের চাপ
ঈদনাটকের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ জনপ্রিয় তারকারা। দর্শকের চাহিদা ও বাজারের বাস্তবতায় তারকাকেন্দ্রিক কাস্টিং এখন প্রায় অপরিহার্য। প্রযোজকদের প্রথম পছন্দই থাকে জনপ্রিয় তারকারা। প্রযোজকদের মতে, প্রতিষ্ঠিত নায়কদের পারিশ্রমিক সাধারণত ১-৩ লাখ টাকার মধ্যে। শীর্ষ তারকারা আরো বেশি নেন।
প্রযোজক মহলে প্রায়ই আলোচনায় আসে জিয়াউল ফারুক অপূর্বর নাম, যিনি একটি নাটকের জন্য প্রায় ৪ লাখ টাকা নেন বলে শোনা যায়। একইভাবে মোশাররফ করিম, নিলয় আলমগীর ও মুশফিক আর ফারহানের মতো তারকারাও ঈদ মৌসুমে ব্যস্ত থাকেন এবং উল্লেখযোগ্য পারিশ্রমিক পান।
অনেক ক্ষেত্রে একটি নাটকের মোট বাজেটের বড় অংশ কেবল দুই বা তিনজন তারকার পেছনেই ব্যয় হয়। ফলে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট, শিল্প নির্দেশনা, সাউন্ড ডিজাইন বা পোস্ট-প্রডাকশনের মতো সৃজনশীল খাতে বিনিয়োগ কমে আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানেই তৈরি হয় শিল্প ও ব্যবসার সূক্ষ্ম টানাপড়েন।
দর্শক এখন ডিজিটাল স্ক্রিন-নির্ভর
দর্শকের দেখার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টেলিভিশনে ঈদনাটক দেখত। এখন সেই চর্চা খুব আছে বলে মনে হয় না। তবে শহুরে তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ নাটক দেখে নিজের সুবিধামতো সময়ে।
ইউটিউব ও ওটিটি প্লাটফর্মে অন-ডিমান্ড সুবিধা, মোবাইল স্ক্রিনে সহজ অ্যাকসেস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত শেয়ার করার সুযোগ তাদের টানে।
কর্মসংস্থান তৈরি হয় অনেকের
ঈদনাটকের পেছনে কাজ করে বিশাল একটি টিম। পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সহকারী পরিচালক, ক্যামেরা টিম, আলো-সাউন্ড কর্মী, সম্পাদক, গ্র্যাফিক শিল্পী, মেকআপ আর্টিস্ট, প্রডাকশন ম্যানেজার এমন অনেকেই এ মৌসুমে কাজের সুযোগ পান। ঈদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অস্থায়ী কিন্তু ব্যাপক কর্মসংস্থান।
একই সঙ্গে ঈদনাটক আমাদের সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরে। পারিবারিক সম্পর্ক, প্রবাস জীবন, শহর-গ্রামের ব্যবধান, প্রেম, সামাজিক সংকট বা প্রজন্মের দূরত্ব, এসব বিষয় গল্পের ভেতর দিয়ে দর্শকের সামনে আসে। ফলে বিনোদনের পাশাপাশি তৈরি হয় অনেকের কর্মক্ষেত্র।
প্রয়োজন ভারসাম্য ও পরিকল্পনার
ঈদকে ঘিরে নাটকের এ বড় ব্যবসায়িক বাজারকে টেকসই রাখতে দরকার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। ডেটা-ভিত্তিক বাজেট পরিকল্পনা, পারিশ্রমিকে ভারসাম্য, নতুন মুখ ও নতুন গল্পে বিনিয়োগ সবই এখন সময়ের দাবি। টিভি ও ডিজিটাল প্লাটফর্মের মধ্যে স্বচ্ছ সমন্বয় গড়ে উঠলে প্রযোজক, শিল্পী ও প্লাটফর্ম সবাই লাভবান হবে।
সব মিলিয়ে ঈদনাটক বর্তমানে বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পের এক শক্ত ভিত্তি। এখানে উৎসবের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে বড় অংকের বিনিয়োগ। পাশাপাশি আছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনাও। তাই বলা যায়, ঈদনাটক শুধু বিনোদন নয়, এটি দেশের সমকালীন মিডিয়া অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক বাজার।