ইতিহাসের এক ভুলে যাওয়া অধ্যায়কে নতুন করে সামনে আনবে সিনেমাটি। প্রচারণার অংশ হিসেবে ২৫ জুলাই প্রকাশ করা হয়েছে সিনেমাটির প্রথম পোস্টার। ২৫ জুলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। অনম বিশ্বাস পরিচালিত সিনেমাটির পোস্টার প্রকাশের মধ্য দিয়ে এবার দর্শকের সামনে নির্মাণের গল্প তুলে ধরার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ টিম। সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছেন আরিফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়া
১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবগাথা নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’। এরই মধ্যে মুক্তির প্রস্তুতি শুরু করেছে সিনেমা টিম। প্রচারণার অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক ২৫ জুলাইকে বেছে নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে সিনেমাটির প্রথম পোস্টার। ১৯৭১ সালের এই দিনে ভারতের নদীয়া ফুটবল একাদশের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মাঠে নামার সে ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। পোস্টারে উঠে এসেছে সিনেমার গল্পের আবহও। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পানিতে ডুবে থাকা জনপদের সামনে দাঁড়িয়ে এক ফুটবলারের ভাস্কর্য, আকাশে যুদ্ধবিমান আর পাশে উড়তে থাকা লাল-সবুজের পতাকা মিলিয়ে ফুটে উঠেছে যুদ্ধের সময় ফুটবলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক অন্য রকম প্রতিরোধের ইঙ্গিত।
যেভাবে জন্ম নিল সিনেমার ভাবনা
নিজের আগের সিনেমা ‘দেবী’র সূত্র ধরে শোনা একটি গল্প থেকেই ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’-এর বীজ বোনা শুরু, সে কথাই জানান পরিচালক। সিনেমা বানানোর ভাবনা নিয়ে অনম বিশ্বাস বলেন, ‘এটা খুব ইন্টারেস্টিং। দেবী বানানোর পর আমার কাছে বিভিন্ন মানুষ গল্প শোনাতে আসত, আমিও শুনতাম—কিউরিওসিটি থেকে, আবার ভালো লাগলেও শুনতাম। একবার তীর্থ নামে একটা ছেলে আমাকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিমের প্রথম ম্যাচের গল্প শোনায়। তখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, কিন্তু সে ম্যাচের সময় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এ গল্প শুনে আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, সেখান থেকেই মনে হয় এ গল্প নিয়ে সিনেমা বানালে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সেটা কানেক্ট করতে পারবে। এরপর নানা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অনেক দিন পর এসে সিনেমাটি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।’
বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে ইতিহাসের সংযোগ
এ সিনেমা নিছক অতীতের কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বর্তমান সময়ের সঙ্গেও এর একটা গভীর যোগসূত্র আছে বলে মনে করেন নির্মাতা। তিনি বলেন, ‘এ সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে নতুন করে জানা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে সংযুক্ত করার একটা প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। মনে হয় আমরা এখন সঠিক সময়েই দাঁড়িয়ে আছি, যখন মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধ হিসেবে, যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর মানুষ অংশ নিয়েছে এবং ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা নতুন প্রজন্মের জানা জরুরি।’
সিনেমায় ফুটবল আর যুদ্ধের মেলবন্ধন
যুদ্ধ আর ফুটবলকে পর্দায় একসঙ্গে তুলে ধরার প্রক্রিয়া খুব একটা সহজ ছিল না। তবে অভিনেতাদের ফুটবল মাঠে দক্ষ করে তুলতে বিশেষ প্রস্তুতির আয়োজন করা হয়েছিল, যাতে পর্দায় খেলাটা যতটা সম্ভব বাস্তব লাগে। যুদ্ধ আর ফুটবলকে পর্দায় একসঙ্গে তুলে ধরার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্মাতা বলেন, ‘ফুটবল টিমের জন্য অভিনেতা এবং কিছু প্রকৃত খেলোয়াড়কে একসঙ্গে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিনেতারা নিয়মিত ফুটবল খেলায় অভ্যস্ত নন—অনেকে ছোটবেলায় খেলেছেন, বছরের পর বছর খেলা হয়নি—তবু সবাই অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন, যাতে খেলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক লাগে।’ শুটিংয়ের পুরো অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বলেই মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘যুদ্ধ আর ফুটবলকে একসঙ্গে পর্দায় তুলে ধরার অভিজ্ঞতাটা আসলে ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন, সিনেমাটা না দেখলে এটা বোঝানো সম্ভব না।’
সিনেমার কুশীলব
‘ঠিকানা বাংলাদেশ’-এ অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, নুসরাত ফারিয়া, রেজওয়ান পারভেজ, খায়রুল বাসার, ইরফান সাজ্জাদ, আজাদ আবুল কালাম, শতাব্দী ওয়াদুদসহ একঝাঁক অভিনয়শিল্পী। প্রধান দুই তারকার নিষ্ঠা আর সহযোগিতামূলক মনোভাব বিশেষভাবে চোখে পড়েছে পরিচালকের। কাস্ট নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অনম বিশ্বাস বলেন, ‘আরিফিন শুভ ও নুসরাত ফারিয়া অসম্ভব সিনসিয়ার এবং কো-অপারেটিভ ছিলেন। দর্শক তাদের এমন একটা লুকে দেখবেন, যেভাবে আগে কখনো দেখেননি।’
মুক্তি নিয়ে যা জানালেন নির্মাতা
‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ শুধু মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মাঠের লড়াই, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরির সে প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। চলতি বছরের মধ্যেই সিনেমাটি মুক্তি দেয়ার আশা প্রকাশ করেন পরিচালক। তবে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলতে চাননি তিনি। মুক্তির সময়সীমা নিয়ে জানতে চাইলে অনম বিশ্বাস বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো সময় বলতে চাই না, কারণ অনেক কিছু পিছিয়ে যায়। যত দ্রুত সম্ভব, পারলে এ বছরই মুক্তি দেয়ার চেষ্টা করছি।’ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এ বছর সিনেমাটি পর্দায় এলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গল্প বড় পরিসরে দেখার সুযোগ পাবে দর্শক।