ভারতে পুনর্জন্ম নিয়ে নির্মিত সিনেমার সংখ্যা কম না। ৭৩ বছর আগে অশোক কুমার ‘মহল’ দিয়ে বলিউডে যে ট্রেন্ড শুরু করেন তা এখনো চলমান। শাহরুখ খান, সালমান খান থেকে শুরু করে প্রেম ও প্রতিশোধের নেশায় পুনর্জন্ম নিতে দেখা যায় ভারতের আঞ্চলিক নায়কদেরও। সৃজিতের জাতিস্মর যার বড় উদাহরণ। পুনর্জন্ম জনরার সর্বশেষ সংযোজন দক্ষিণ ভারতের শ্যাম সিংহ রায়। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা নানিকে পুনর্জন্ম দেয়া তরুণ পারিচালকের নাম রাহুল সাংকৃত্যান।
রাহুল তার নায়ককে পুনর্জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হননি। নানির মুখ থেকে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছেন একঝাঁক সাহসী বার্তা। জাতপ্রথা, ধর্মীয় কুসংস্কার, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের দাস বানিয়ে রাখা, পরিবারের সম্মান বিবেচনায় পরিবারের সদস্যকে খুন (অনার কিলিং), নারীমুক্তিসহ
ভারতীয় সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসা কালো অধ্যায় যেভাবে সামনে এনেছেন তা অনেক প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদেরও আনতে দেখা যায় না। মাত্র তিন-চারটা সিনেমা বানানো এক তরুণের আত্মায় কী পরিমাণ সাহস জমলে এসব বিষয় সামনে এনে সিনেমা বানানো যায়!
শ্যাম সিংহ রায় সিনেমার নায়কের নাম ভাসু। সে বর্তমানের একজন স্বপ্নবাজ চলচ্চিত্র পরিচালক। আপাতত শর্টফিল্ম বানিয়ে নিজের জাত চেনাবেন, তারপর প্রযোজক পেলে বানাবেন সিনেমা। ভাসু সফল হয় কিনা, সফল হলে কতটা হয়, ব্যর্থ হলে তার ভাগ্যে কী জোটে, এসব চিন্তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, কে রোজী? ভাসু যে নামের মানুষকে চেনে না, বিশেষ মুহূর্তে তার নাম মুখে আসে কেন? এসব প্রশ্ন যদি আপনার কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে বলা যায় আপনি কেবল প্রশ্নের সৈকতে পা রেখেছেন। সামনে পড়ে আছে মহাসাগর।
ভাসু ও শ্যাম সিংহ রায় চরিত্রে নানি, রোজি চরিত্রে সাঁই পল্লবী, দেবেন্দ্র সিংহ রায় চরিত্রে কলকাতার যিশু সেন গুপ্ত থেকে শুরু করে একেবারে গুরুত্বহীন চরিত্রটাও; কে কার চেয়ে ভালো অভিনয় করবে সেই প্রতিযোগিতাই যেন করে গেলেন। এ প্রতিযোগিতায় নানি প্রথম হলেন, না সাঁই পল্লবী আরো শক্তপোক্তভাবে প্রথম হলেন? সাঁইয়ের মিষ্টি হাসি, চঞ্চল চোখ, লাজুক অভিব্যক্তি দর্শকদের প্রেমে ফেলে দেবে।
নানি যতক্ষণ ভাসু চরিত্রে অভিনয় করেছেন, ডায়ালগগুলো ছিল সাদামাটা। গল্পের চাহিদা মেনেই সংলাপ লেখা হয়েছে। জোর করে রঙ দেয়ার চেষ্টা না করার জন্য গল্পের লেখক সত্যদেব একটা বাহবা পেতেই পারেন। কিন্তু নানি যখনই হয়ে যান শ্যাম সিংহ রায়, তার প্রতিটা সংলাপ দাঁড়িয়ে স্যালুট জানানোর মতো। কে বেশি শক্তিশালী? শ্যাম সিংহ, নাকি তার মুখের ভাষা, এটা ভেবে একসময় দর্শক দ্বিধায় পড়ে যাবে।
এত নয়নাভিরাম কোরিওগ্রাফি ও ফিল্মোগ্রাফি সম্প্রতি দেখিনি আমি। দেখলেও সেগুলো এতটা হূদয়গ্রাহী লাগেনি। পশ্চিমবঙ্গের শান্ত নদী, রাতের নদীতে ভাসা ডিঙি নৌকা, পানিতে গলতে থাকা চাঁদ কিংবা ভারতনাট্যমের সঙ্গে সাঁই পল্লবীর মুখের নাচন নান্দনিকভাবে ক্যামেরায় ধরেছেন সানু জন ভার্গিস। নিউজ টিমের টেকনিশিয়ান থেকে আজ তিনি তামিল, তেলেগু, মালয়ালম ও হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ভিডিওগ্রাফার। বাধাই হো, জার্সি ও মালিকের মতো সিনেমার দৃশ্যায়নের ভার সামলেছেন।
আপনার কাছে যখন মনে হবে শ্যাম সিংহ রায় পুনর্জন্ম নিয়ে তৈরি হওয়া আর দশটা সিনেমার মতোই গতানুগতিক, তখনই পরিচালক তার ভাণ্ডার থেকে একের পর এক টুইস্ট ছুড়তে শুরু করবেন। মেরুদণ্ড শীতল করে দেয়া এসব টুইস্টে আপনি কখনো আবেগী হয়ে পড়বেন, কখনো হবেন ভাবাবেগশূন্য, স্তম্ভিত! সিনেমার গানগুলো নিয়ে আলাদা করে লেখা যায়। যেমন লিরিক, তেমন কণ্ঠ। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিংবা গানের কম্পোজিশন, যত্নের একটুও ঘাটতি রাখেননি মিউজিক ডিরেক্টর।
এত সুন্দর একটা সিনেমা বক্স অফিস কাঁপানো দূরে থাক, নির্মাণ ব্যয় তুলতেই হিমশিম খেয়েছে। যদিও নেটফ্লিক্সে মুক্তি দিয়ে কিছুটা পুষিয়ে নিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা নিহারিকা এনটারটেইনমেন্ট।
সর্বশেষ বলতে চাই, সিনেমা আমরা দুভাবে দেখি। এক. বিরক্তির সাথে; দুই. প্রেমের সাথে। শ্যাম সিংহ রায় প্রেমের সাথে দেখার মতো একটি সিনেমা। প্রেমে পড়িয়ে দেয়ার মতো সিনেমা।