অধরা আলোর পথে অনিশ্চিত যাত্রা

বোমাবর্ষণে গুঁড়িয়ে গেল শিশু হাসপাতাল। সে ধ্বংসস্তূপের ছাই, ছেঁড়া সাদা চাদর, মগজ আর পোড়া গন্ধের মাঝে থাকা একটা ক্ষত-বিক্ষত টেডি বিয়ার কি কবিতার জন্ম দিতে পারে?

বোমাবর্ষণে গুঁড়িয়ে গেল শিশু হাসপাতাল। সে ধ্বংসস্তূপের ছাই, ছেঁড়া সাদা চাদর, মগজ আর পোড়া গন্ধের মাঝে থাকা একটা ক্ষত-বিক্ষত টেডি বিয়ার কি কবিতার জন্ম দিতে পারে? বলতে পারে—সবকিছু মনে রাখা হবে? খণ্ড-বিখণ্ড দেহ, আর্তনাদে ফেটে পড়া পলায়নপর মানুষ, কান ফাটানো শব্দে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শকওয়েভে কাঁপতে থাকা দালানকোঠা দেখেও না দেখার ভান করাটা হয়তো ধারাপাতের মতো সহজ। তবু এভাবে একদিন মরে যাবে জেনেও মানুষ মানুষকে পড়ছে। তারপর প্রেমের কথা বলছে, শিল্পের কথা বলছে। কিন্তু যুদ্ধের কথাটা নানা পথ ঘুরে ঠিকই সামনে এসে পড়ছে। যেন যুদ্ধে আহত, নিহত মানুষ কিংবা তাদের স্মৃতি সমস্ত অ্যালঝেইমারের রোগী! সমস্ত পথ ঘুরে ঘুরে ফিরছে কিন্তু নিজের ঘর খুঁজে পাচ্ছে না। ‘অল দ্য লাইট উই ক্যান নট সি’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই দগদগে স্মৃতি নিয়ে ফিরেছে। ফিরেছে ‘সি অব ফ্লেইম’ নামের এক অভিশপ্ত হীরার কাহিনী নিয়ে।

লোকমুখে কথিত, সমুদ্রের দেবতাকে জাদুকরী হীরাটি উপহার দিয়ে যেন এক টুকরো সমুদ্রই দিয়েছিলেন প্রেমিকা। এ অলৌকিক হীরা সর্বরোগ বিনাশী। অন্দরমহল থেকে সেটাকে চুরি করে নিয়ে যায় এক অভিলাষী রাজকুমার। রাগে অন্ধ দেবতা অভিশাপ দেন রত্নটাকে। অধিকারীকে এ রত্ন অমরত্ব দান করবে, কিন্তু অমর হয়েও আপনজনের সবাইকে হারাতে হবে। একটু একটু করে সে জ্বলতে থাকবে নিঃসীম যন্ত্রণার শিখায়। প্যারিসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরে সংরক্ষিত এ কিংবদন্তির হীরকখণ্ডকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এ সিরিজের কাহিনী।

জাদুঘরটির দায়িত্ব নিয়েছে মারির বাবা। অন্ধ মারি জ্যোৎস্না দেখে না। বাবা শুধু শেখান, কীভাবে পৃথিবীর আলো না দেখেও নিজের অন্য সব ইন্দ্রিয়ের জ্যোতিতে দেখে নিতে হয় আশপাশের সবটাকে। যুদ্ধাক্রান্ত ফ্রান্সে জার্মানরা ঢুকে পড়লে মেয়েকে নিয়ে তিনি পালিয়ে যান সেইন্ট মালোর সমুদ্রতীরে। ওদিকে জার্মানির এক ছোট্ট মফস্বলের পথে ঘুরে এক অনাথ শিশু ভার্নার। রেডিওর প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণ। রেডিও শুনতে, মেরামত করতে ভালোবাসে ভীষণ। চৌকোনা অ্যান্টেনাওয়ালা বাক্সটার স্ট্যাটিক আওয়াজ তার মনে নেশা ধরিয়ে দেয়। প্রতি রাতে প্রগলভ কিশোরের পাশে থাকা গ্যাস স্টোভ নিঃশব্দে নিভে যায়। কোথাও যুদ্ধের দামামা বাজে।

যে শিশুদের সবুজ মাঠে ফুল হওয়ার কথা ছিল, তারা পোড়া ঘাস হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। গুমোট মেঘেরা জন্ম দেয় বিবমিষাময় বর্ষার। তখন ভার্নার যোগ দেয় নাৎসি বাহিনীতে। কিন্তু এক তুমুল দোটানা তাকে চারদিক থেকে চেপে ধরে। পার্টির আদর্শ নিয়ে মনে অজস্র প্রশ্ন দানা বাঁধতে থাকে। সেই সঙ্গে যুদ্ধ চলে কোনো নিয়ম না মেনে। মারি রেডিওতে পাঠাতে থাকে গোপন বার্তা। ভার্নার খুঁজে ফেরে সে ব্রডকাস্টের উৎসমুখ। ক্রমেই মনে হয়, গল্পটা আসলে কার? মারি-ভার্নারের? নাকি যুদ্ধের ভয়াবহতার? হয়তো একটা প্রেমের কবিতার? মারির চোখে জ্যোতিহীন টানেলের প্রান্তে শেষ বেলার সেই আলো দেখা যায়, যার অস্তিত্বে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।

পুলিৎজারজয়ী অ্যান্থনি ডোয়েরের জাদুকরী উপন্যাসটিকে ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলেন স্ট্রেঞ্জার থিংসখ্যাত শন লেভি। নজরকাড়া সিনেমাটোগ্রাফি, মর্মস্পর্শী গল্প, পায়াভারী কলাকুশলী থাকা সত্ত্বেও চার পর্বের সিরিজটা মার খেয়ে গেছে কাহিনীর ব্যাপ্তিকে ধারণ করতে না পেরে। ঘটনাহীন, ধীরগতির দৃশ্যায়নের কারণে শুধু ব্যাপ্তিকে দৈর্ঘ্যে বাড়ালে এ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা যায় না। কিছু চরিত্রে গভীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তা অধরা রয়ে গেছে চিত্রনাট্যকার স্টিভেন নাইটের কলমে। পরীক্ষার হলে নকল করার যাবতীয় পদ্ধতি জানা সত্ত্বেও আধখেঁচড়াভাবে সব প্রশ্ন ছুঁয়ে এলে যা হয়, চিত্রনাট্যটা হয়েছিল ঠিক সে রকম অগভীর। কিছু জায়গায় সংলাপ অতিরঞ্জিত। অথচ সিরিজটিতে মারির চরিত্রে আরিয়া লোবার্তি নিজের অভিষেকেই বাজিমাত করেছেন।

ভীষণ বাস্তবসম্মত অভিনয়ে রক্তমাংসের হয়ে উঠেছে মারি। নৈতিকতা আর বাধ্যতার মাঝে খেই হারানো ভার্নার চরিত্রটিকে প্রাণ দিয়েছেন লুই হফম্যান। বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা মার্ক রুফালো। হিউ লরিকেও ভোলা যায় না। সেইন্ট মালোর ধ্বংসাবশেষ, আলো-ছায়া আর রেডিওর শিল্পিত ব্যবহার মনকে স্থির করে দেয়। আবহসংগীত ও শব্দ পরিকল্পনা দৃশ্যগুলোর থিতিয়ে আসা বিষাদে খানিকটা হলেও গতি আনে। কিন্তু এ আয়োজন কি শেষমেশ টানেলের শেষে আলো হতে সক্ষম হয়? প্লে বাটনে চাপ দেয়ার যুগে উপন্যাসটির রুপালি সংস্করণ জরুরি ছিল, তা প্রশ্নাতীত। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এমন পরিশোধিত রূপ আর চিত্রনাট্যের অযত্নের ফলাফল হিসেবে এ দৃশ্যায়ন আসলে কতটা জরুরি? প্রশ্নবোধক চিহ্নটা শুধু বড় হতে থাকে।

আরও