কিন্তু এ দীর্ঘ সংকটের মাঝেও শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কখনো পুরোপুরি থেমে থাকেনি। বরং বহু ক্ষেত্রে সংকটই মধ্যপ্রাচ্যের শিল্পীদের নতুন ভাষা, নতুন প্রতীক ও নতুন গল্পের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাতারা যুদ্ধ, নির্বাসন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত বেদনা ও মানবিক সংকটকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলাদা মর্যাদা অর্জন করেছে।
এ অঞ্চলের চলচ্চিত্রের কথা উঠলে সবার আগে আসে ইরানের নাম। বাস্তবধর্মী নির্মাণশৈলী, প্রতীকী ভাষা এবং গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইরানি সিনেমা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দুইবারের অস্কার জয়ী ইরানি নির্মাতা আসগর ফরহাদির ‘আ সেপারেশন’ কিংবা জাফর পানাহির চলচ্চিত্রগুলো শুধু শিল্পমানের জন্য নয়, বরং সমাজ ও মানুষের অন্তর্গত সংকটকে তুলে ধরার জন্যও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। একইভাবে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া কিংবা তুরস্কের অনেক নির্মাতাও সংঘাত ও বাস্তবতার ভেতর থেকে শক্তিশালী চলচ্চিত্রভাষা তৈরি করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাস্তবতা পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং দেশটির পাল্টা প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু কূটনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি; এর প্রভাব পড়েছে পুরো অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র অঙ্গনেও। চলচ্চিত্র উৎসব, আন্তর্জাতিক বাজার, যৌথ প্রযোজনা, শিল্প বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি, বিমান চলাচলের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ জটিল হয়ে পড়ায় অনেক নির্মাতা ও শিল্পী তাদের পরিকল্পনা বাতিল বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও গত কিছুদিনে যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে, কিন্তু সংকট কাটেনি এখনো।
এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রবাজারেও। হংকংয়ের ফিল্মআর্টের মতো বড় চলচ্চিত্রবাজারে এ বছর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারেনি। অঞ্চলটির প্রযোজক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের একটি অংশ নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে সফর বাতিল করেছিলেন। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগেও বড় ধরনের ভাটা পড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণকে নয়, এর বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তুলছে।
সম্প্রতি দ্য হলিউডে রিপোর্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে মধ্যপ্রাচ্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রযোজনার নতুন কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছিল। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রযোজনার জন্য আধুনিক স্টুডিও, ট্যাক্স সুবিধা এবং উন্নত লোকেশন অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল। হলিউড ও ইউরোপের অনেক বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও এ অঞ্চলে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই অগ্রগতিকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদনটিতে পোলিশ-অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত চলচ্চিত্র প্রযোজনা নির্বাহী ন্যান্সি প্যাটনের মন্তব্য উল্লেখ করা হয়। তিনি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক স্বাধীন চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ‘ডেজার্ট রোজ ফিল্মস’-এর প্রতিষ্ঠাতা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন ন্যান্সি।
ন্যান্সি জানান, বহু বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক চলচ্চিত্র অবকাঠামো এখন চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তাকেও এ অঞ্চল ছাড়তে হয়েছে। তার মতে, এ সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সৃজনশীল পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নির্মাতারা এখন স্বাধীনভাবে পরিকল্পনা করতে পারছেন না, আন্তর্জাতিক প্রযোজকরাও নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে অনেক চলচ্চিত্র প্রকল্প স্থগিত হয়ে যাচ্ছে কিংবা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছে।
এ বাস্তবতার প্রভাব ইরানের অভ্যন্তরীণ চলচ্চিত্র শিল্পেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের ‘ফজর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ কিছু নতুন চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হলেও দেশটির বাণিজ্যিক সিনেমা মুক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে অনেক নির্মাতা এখন আন্তর্জাতিক উৎসবনির্ভর হয়ে পড়ছেন। কেউ দেশের ভেতরে সীমিত পরিসরে কাজ করছেন, কেউ বিদেশে গিয়ে তুলনামূলক স্বাধীনভাবে নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছেন, আবার অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোনো প্রকল্পে যুক্ত হতে পারছেন না।
শিল্পীদের অবস্থানও এখন দ্বিধাবিভক্ত। কেউ রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কেউ নির্বাসনে থেকে নিজের শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ইরানি নির্মাতা জাফর পানাহি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সিনেমা শুধু শিল্প নয়, এটি নীরব প্রতিবাদের ভাষা।’ অন্যদিকে আসগর ফরহাদি মনে করেন, রাজনৈতিক চাপ গল্প বলার স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। সম্প্রতি ভ্যারাইটিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফরহাদির মন্তব্য উল্লেখ করা হয়। বিশ্বজুড়ে শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ফরহাদি বলেন, ‘এ সংকটময় সময়ে সবাইকে কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে হবে, যাতে ধ্বংসাত্মক আগ্রাসন বন্ধ করা যায়।’ তার মতে, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা কেবল স্থাপনা ধ্বংস নয়, এটি মানবজীবন ও মর্যাদার ওপরও বড় আঘাত।
তার পরও মধ্যপ্রাচ্যের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি পুরোপুরি থেমে নেই। কান, বার্লিন, ভেনিস ও লোকার্নোর মতো আন্তর্জাতিক উৎসবে এখনো ইরানি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। যদিও এসব কাজের বড় অংশ এখন প্রবাসে নির্মিত বা বিদেশে সম্পাদিত। সংকটের ভেতর দিয়েই এ অঞ্চলের শিল্পীরা নতুন বাস্তবতা, নতুন প্রতিরোধ এবং নতুন ভাষা খুঁজে নিচ্ছেন। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তা হয়তো তাদের পথ কঠিন করে তুলছে, কিন্তু শিল্পচর্চার শক্তিকে এখনো থামিয়ে দিতে পারেনি।