অ্যাবসার্ড ধারায় মানবজীবনের গল্প নিয়ে মঞ্চে আসছে ‘উজানে মৃত্যু’

বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও সাঈদ আহমেদের হাতে এবং পশ্চিমবঙ্গে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও বাদল সরকারের সৃষ্টিকর্মে অ্যাবসার্ড নাটকের শক্তিশালী চর্চা লক্ষ করা যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত ‘উজানে মৃত্যু’ তাঁর সবশেষ নাটক।

অ্যাবসার্ড ধারার নাটক সাধারণত ঘটনার উদ্ভটতা, স্থান–কালের অযৌক্তিকতা এবং সংলাপের আপাত অর্থহীনতার মধ্য দিয়ে দর্শককে এক ধরনের ক্লান্তিকর দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। অসংগতি ও শৃঙ্খলাহীনতার এই বিন্যাস অনেক সময় দর্শকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু অ্যাবসার্ড যে কেবল বিমূর্ত চিন্তার ভার নয়, বরং তা গল্পগাঁথার মতো বিনোদনমুখী ও মানবজীবনকেন্দ্রিকও হতে পারে, পালাকার প্রযোজিত মঞ্চনাটক ‘উজানে মৃত্যু’ তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই নাটকে অবাস্তব জীবনদর্শন রূপের কল্পনায় দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তিনটি প্রতীকী চরিত্রের অস্তিত্বহীন ও অনিশ্চিত গন্তব্যের পরিক্রমায় অনুসন্ধান করা হয় মানবজীবনের গভীরতম সত্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়েই বিশ্ব নাট্যচর্চায় জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড ধারা। উদ্ভট বাস্তবতা, পরম্পরাহীন গল্পবিন্যাস, কার্যকারণবিহীন সংলাপ ও পরিণামহীনতা, এই ধারার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তবে এই চূড়ান্ত বিমূর্ততার মধ্য দিয়েই কখনো কখনো উন্মোচিত হয় এক অতিপ্রাকৃতিক, তীব্র বাস্তবতা। পাশ্চাত্যে ইউজিন আয়োনেস্কো, স্যামুয়েল বেকেট ও জাঁ জেন এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ নাট্যকার। স্যামুয়েল বেকেটের 'ওয়েটিং ফর গডো' সারা বিশ্বে অ্যাবসার্ড নাটকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ও সাঈদ আহমেদের হাতে এবং পশ্চিমবঙ্গে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও বাদল সরকারের সৃষ্টিকর্মে অ্যাবসার্ড নাটকের শক্তিশালী চর্চা লক্ষ করা যায়। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রচিত ‘উজানে মৃত্যু তাঁর সবশেষ নাটক। তিনটি প্রতীকী চরিত্রের অনিশ্চিত ও অস্তিত্বহীন যাত্রাপথের মাধ্যমে মানবজীবনের প্রকৃত সত্যের সন্ধান এই নাটকের মূল অনুষঙ্গ। এই অস্তিত্বহীন জীবন ও তার সংগ্রামকে নিরীক্ষার অভিপ্রায়ে দেশের অন্যতম পরিশ্রমী নাট্যদল পালাকার মঞ্চে এনেছে ‘উজানে মৃত্যু’।নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন শামীম সাগর। শিগগিরই হতে যাচ্ছে এই নাটকের ৭৭ ও ৭৮তম প্রদর্শনী।

দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে একটি নাটক মঞ্চস্থ করা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং সে প্রসঙ্গে নির্দেশক শামীম সাগর বলেন, ‘এটা সত্য যে থিয়েটারে একটি প্রযোজনা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে নেয়া সহজ নয়। নানা কারণে দলের সদস্যরা অনুপস্থিত থাকতে পারেন। সেই কারণেই পালাকার 'উজানে মৃত্যু'র প্রতিটি চরিত্রে একাধিক অভিনেতা প্রস্তুত করেছেন। আলাদা আলাদা টিমও তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনো অভিনেতা অনুপস্থিত থাকলেও প্রদর্শনী বন্ধ না হয়। এতে দলের অনেকেই কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, আবার নাটকটিও দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে।’

থিয়েটারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি বলেন, ‘এখন থিয়েটারে দর্শক খরা চলছে, এটা সত্য। তবে উজানে মৃত্যু যেহেতু পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত, তাই অনেক শিক্ষার্থী নাটকটি মঞ্চস্থ হলে দেখতে আসেন। এছাড়া ছুটির দিনগুলোতে প্রদর্শনী হলে দর্শক পাওয়া যায়। এইভাবেই ধীরে ধীরে থিয়েটারকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি আমরা।’

পালাকারের এই প্রযোজনায় অভিনয় করেছেন দলপ্রধান আমিনুর রহমান মুকুল, চারু পিন্টু, কাজী ফয়সাল, ফরহাদ লিমন, সাজ্জাদ নিশান, অবণি, শিশিরসহ আরো অনেকে। সংগীতায়োজন করেছেন অজয় দাশ। মঞ্চ ও কোরিওগ্রাফি করেছেন অনিকেত পাল বাবু। ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর, টানা দুই দিন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে নাটক উজানে মৃত্যু’, যা অ্যাবসার্ড নাট্যধারার এক গভীর, চিন্তাশীল ও মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আরও