নতুন পরিকল্পনায় ফিরছে এবারের নতুন কুঁড়ি

এক বছর পর এবারো নতুন প্রতিভার সন্ধানে হচ্ছে আয়োজনটি। এরই মধ্যে ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে আবেদন, চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।

প্রায় দুই দশকের বিরতির পর গত বছর আবারো শুরু হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জনপ্রিয় শিশু-কিশোর প্রতিভা অন্বেষণের আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’। এক বছর পর এবারো নতুন প্রতিভার সন্ধানে হচ্ছে আয়োজনটি। এরই মধ্যে ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে আবেদন, চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচন হবে। এরপর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে চূড়ান্ত পর্ব। গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তি, কথন, কিরাতসহ এবার মোট ১৮টি বিষয়ে প্রতিযোগিতা হবে। ‘ক’ বিভাগে ৬-১১ বছরের কম এবং ‘খ’ বিভাগে ১১-১৫ বছর বয়সীরা অংশ নিতে পারবে। কিরাতের জন্য বয়সসীমা ১২-১৭ বছর। এর আগে গত বছরের আয়োজনে ‘ক’ ও ‘খ’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় টাঙ্গাইলের প্রেয়সী চক্রবর্তী ও সুনামগঞ্জের শুভমিতা তালুকদার।

শুধু প্রতিযোগিতা নয়

এবারের আয়োজনকে শুধু প্রতিভা খোঁজার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে না বিটিভি। শিশুদের সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও মূল্যবোধের বিকাশের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন কুঁড়ি শুধু শিশুদের প্রতিযোগিতার একটি আয়োজন নয়, এটি শিশুদের সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের একটি জাতীয় গণমাধ্যম প্লাটফর্ম। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের এ আয়োজনে যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের প্রতিভা ও গল্প তুলে ধরতে চাই। এখানে কোনো শিশুর পরিচয় তার সুযোগ নির্ধারণ করবে না। সে কোন পরিবার থেকে এসেছে, কোন অঞ্চল থেকে এসেছে কিংবা তার সামাজিক অবস্থান কী—এসবের পরিবর্তে তার প্রতিভা, অনুশীলন, পরিবেশনা ও সৃজনশীলতাই হবে মূল্যায়নের মূল ভিত্তি। এমন একটি মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ শুধু ভালো শিল্পী তৈরি করে না; এটি একটি প্রজন্মকে শেখায় যে পরিশ্রম ও যোগ্যতার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এ শিক্ষা শৈশবেই সবচেয়ে শক্তভাবে তৈরি হয়।’ কাজী জেসিন বলেন, ‘নতুন কুঁড়ির পুনর্গঠন শুধু একটি পুরনো অনুষ্ঠানকে নতুন করে প্রচারে আনার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের শিশুদের জন্য একটি ন্যায্য, উন্মুক্ত ও মেধাভিত্তিক সাংস্কৃতিক মঞ্চ, যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা একটি শিশুও জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পাবে।’

বিজয়ীদের নিয়ে ভাবনা

নতুন কুঁড়ির বিজয়ীদের বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আরো জোরালোভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা এবার গুরুত্ব পাচ্ছে। গত বছরও প্রতিযোগীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে অনুষ্ঠান ও বাজেটের সীমাবদ্ধতায় নিয়মিতভাবে তাদের নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান বিটিভির উপমহাপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গতবারের সেরা ১০ জনসহ পরের দিকের কয়েকজনকে বিটিভির শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। শিশুদের বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারো সেরা ১০ জন ও পরের কয়েকজনকে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্টিয়ারিং কমিটিতে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

বিজয়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজী জেসিন বলেন, ‘যারা নতুন কুঁড়িতে ভালো করবে, তারা বিটিভি পরিবারের অংশ হয়ে যাবে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজের সুযোগও তাদের জন্য খোলা থাকবে। শিশুরা বয়সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা অর্জন করলে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’

বাছাইয়ে স্বচ্ছতা

প্রতিযোগীদের বাছাই প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিটিভি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকে যোগ্যদের নির্বাচন করতে প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে মোহাম্মদ রোকন উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগে বিচারকদের আলাদাভাবে নম্বর দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। পরে সে নম্বরের গড়ের ভিত্তিতে ফল নির্ধারণ করা হবে। অডিশনের পর প্রতিযোগীকেও তার প্রাপ্ত নম্বর জানানো হবে। বিচারকদের দেয়া নম্বরের মধ্যে কোনোটি অস্বাভাবিক মনে হলে সেটি বাদ দিয়ে অন্য বিচারকদের নম্বরের গড় করা হবে।’

মূল্যায়নের পাশাপাশি বাছাইয়ের প্রতিটি ধাপ দর্শকের সামনে তুলে ধরার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে কাজী জেসিন বলেন, ‘এবার প্রতিটি পর্যায়ের বাছাই ও অনুষ্ঠান ধারণ করে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন অঞ্চল থেকে কীভাবে প্রতিযোগীরা উঠে আসছে এবং কীভাবে তাদের নির্বাচন করা হচ্ছে, সেটিও দর্শকের সামনে তুলে ধরা হবে। প্রতিটি বিভাগে দক্ষ ও যোগ্য বিচারক রাখার দিকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

গতবারের বিজয়ীদের অভিজ্ঞতা

গত বছর ‘খ’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় সুনামগঞ্জের শুভমিতা তালুকদার। এবার বয়স অনুযায়ী সুযোগ থাকলে আবারো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায় সে। এক বছর গানচর্চা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। ভবিষ্যতে বিটিভির সঙ্গে আরো কাজ করার সুযোগ চায় শুভমিতা। সে বলে, ‘বিজয়ী হিসেবে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলে ভালো লাগবে। এছাড়া সঠিকভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে আমরা আরো ভালো করতে পারব।’

গত বছরের ‘ক’ বিভাগের চ্যাম্পিয়ন টাঙ্গাইলের প্রেয়সী চক্রবর্তীও প্রতিযোগিতার পর বিভিন্ন সুযোগ পেয়েছে। এটিএন বাংলার ‘গানবাজ জুনিয়র’ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার পাশাপাশি টাঙ্গাইল সদরেও সংবর্ধনা পেয়েছে সে। বিটিভির উদ্যোগে নিজের একটি মৌলিক গানও করার সুযোগ পেয়েছে। তবে এবার নতুন কুঁড়িতে অংশ নিচ্ছে না প্রেয়সী। সে বলে, ‘‌এবার নতুন কুঁড়িতে অংশ নিচ্ছি না। বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে আগামীতে ‘খ’ বিভাগে অংশ নিতে নিজেকে প্রস্তুত করছি।’

নতুন কুঁড়ি নিয়ে ইশিতা

‘নতুন কুঁড়ি’র পুরনো দিনের প্রতিযোগীদের কাছেও আয়োজনটির গুরুত্ব আলাদা। ১৯৮৮ সালে শিশুশিল্পী বিভাগে পুরস্কার পেয়েছিলেন অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ইশিতা। দীর্ঘ বিরতির পর আয়োজনটি আবার শুরু হওয়ায় ইতিবাচকভাবেই দেখছেন তিনি। ইশিতা বলেন, ‘এত বছর পর আবার এ আয়োজন শুরু হয়েছে, বিষয়টি অবশ্যই আনন্দের। এজন্য অনেক শুভকামনা। আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই নতুন কুঁড়ির সঙ্গে যুক্ত। আমি, অপি আপা, তারিন আপা, শ্রাবন্তী, রিচি, নাদিয়াসহ অনেকেই নতুন কুঁড়ি থেকে এসেছি। এ আয়োজন আমাদের প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তৈরি করেছিল।’

এমন আয়োজন সফলভাবে এগিয়ে নিতে সম্মিলিত সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন ইশিতা। তার ভাষায়, ‘সামগ্রিকভাবে সবার সহযোগিতা ছাড়া কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যেকোনো সফলতা অর্জন করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। তাই নতুন কুঁড়ির মতো একটি আয়োজনকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান

নতুন কুঁড়িতে অংশ নিতে আগ্রহী শিশুদের নির্ধারিত বিভাগে আবেদন করার পাশাপাশি নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিটিভির মহাপরিচালক। অভিভাবকদের সন্তানদের শিল্পচর্চায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন গান-বাজনায় বেশি সময় দিলে পড়ালেখার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু শিল্পচর্চার সঙ্গে চিন্তার বিকাশ সরাসরি সম্পৃক্ত। শিশুরা যত ভালো শিল্পচর্চা করবে, তাদের মেধা ও চিন্তাশীলতা তত বাড়বে। তাই সন্তানদের আগ্রহের জায়গায় তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। একটি জাতির সাংস্কৃতিক শক্তি তৈরি হয় তার শিল্পী, সৃষ্টিশীল মানুষ এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিভাকে যত্ন করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সে অর্থে ‘নতুন কুঁড়ি’ আজকের শিশুদের জন্য একটি প্রতিযোগিতা হলেও এর লক্ষ্য আগামী দিনের বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে আরো সমৃদ্ধ করা।’

আরও