অতর্কিত হামলা ও হেনস্তা

সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি শিল্পীদের

সালমানের অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরেই তার স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সম্পর্ক নেই।

রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’-এ হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাতে এ ঘটনায় স্টুডিওর ক্যামেরা, আসবাব, রেকর্ডিং সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে হামলার বিষয়টি জানান সালমান।

সালমানের অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরেই তার স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, ঘটনার সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সম্পর্ক নেই। নিউ গিনি প্রপার্টিজের সঙ্গে পাশের জমির মালিকের বিরোধের জেরেই হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য, সালমানের স্টুডিওটি হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না; জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যে পড়ায় সেখানেও ভাংচুর হয়।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। কনটেন্ট ক্রিয়েটর রাফসান দ্য ছোটভাই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। সালমানের এ ঘটনা ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের ওপর হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা-ভাংচুরের শিকার হয়েছে। গত বছর ছায়ানটে হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। এ বছর মানিক মিয়া এভিনিউতে একটি কনসার্টে সংগীতশিল্পী হাসানের গায়ে দর্শকসারি থেকে পানির বোতল ছোড়া হয়। এ ঘটনায় ব্যান্ড সংগীতশিল্পীদের সংগঠন বামবা প্রতিবাদ জানায়।

এছাড়া গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ইতালির ভেনিসের মেস্ত্রে এলাকায় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন অঙ্গনের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা।

শিল্পীদের ওপর হামলা, হেনস্তা ও মব আচরণের এসব ঘটনায় তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ধরনের আচরণকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যেকোনো শিল্পী বা সাধারণ মানুষের ওপর এ ধরনের মব আচরণ সেটা ডিজিটাল মাধ্যমে হোক কিংবা সরাসরি, খুবই দুঃখজনক। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ থাকলে এ ধরনের ঘটনা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়।’

এ ধরনের ঘটনা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। অমিতাভ রেজা বলেন, ‘সামাজিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যদি দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তাহলে এগুলো বাড়তে থাকবে।’

শাস্তির পাশাপাশি তার দৃশ্যমান প্রয়োগও জরুরি বলে মনে করেন এ নির্মাতা। তার ভাষায়, ‘দিনশেষে প্রতিটি ঘটনায় হয়তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, কিন্তু সেটার কোনো দৃশ্যমান প্রকাশ নেই। এখন জরুরি হচ্ছে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।’

শুধু শিল্পীদের ওপর হামলা নয়, মতবিরোধ বা প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও সহিংসতা ও ভাংচুরের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অভিনেতা তারিক আনাম খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মতের অমিল থাকলেও প্রতিবাদের ভাষা হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ। আমি যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও ভাংচুরের বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, আমার কোনো কাজ কারো পছন্দ না হতে পারে, আবার অন্যের কোনো কাজও আমার পছন্দ না হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এর আগেও দেখেছি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন জায়গায় মব, ভাংচুর—এগুলো যেন আইন হয়ে গেছে। অর্থাৎ কেউ কিছু বলতে পারে না। এটা বন্ধ করা উচিত বলেই আমি মনে করি।’

শিল্পী হোক কিংবা সাধারণ মানুষ, কারো ওপরই হামলা হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তারিক আনাম খান। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের আরো আগেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শিল্পী হোক বা অন্য কেউ, কোনো জায়গায়ই আক্রমণ হওয়া উচিত নয়। বিষয়টি সরকারের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক আগেই দেখা উচিত ছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটা সমাজের জন্য খুব একটা ভালো নয়।’

সহিংসতার বদলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতপ্রকাশের ওপরও জোর দেন এ অভিনেতা। তিনি বলেন, ‘একজন সমাজের শান্তিকামী মানুষ হিসেবে মনে করি, এসব ঠিক নয়। আমি এখনো মনে করি, চোখের বদলে চোখ—এটা ভদ্র, শিক্ষিত বা সভ্য মানুষের আচরণ হওয়া উচিত নয়।’

আরও