চলচ্চিত্রে সৌমিত্র

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখককে তুলনা করেছিলেন কলম-পেষা মজুরের সঙ্গে। প্রশ্ন রাখতে চাই, কেবল কি কলম দিয়েই লেখা যায়? বরং কখনো কখনো এমন সময় আসে যে কলমের পরিবর্তে তাকে লিখতে হয় হূদয় দিয়ে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখককে তুলনা করেছিলেন কলম-পেষা মজুরের সঙ্গে। প্রশ্ন রাখতে চাই, কেবল কি কলম দিয়েই লেখা যায়? বরং কখনো কখনো এমন সময় আসে যে কলমের পরিবর্তে তাকে লিখতে হয় হূদয় দিয়ে। ১০ মাসের শূন্যগর্ভা মহামারী আমাদের এ শিক্ষাই দিয়ে যাচ্ছে। হারালাম দেবেশ রায়কে, হারালাম আনিসুজ্জামানকে। আরো কত প্রিয় নাম! সবারই বয়স হয়েছিল বটে! এ মিছিলে সর্বশেষ যোগ হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রত্যক্ষই বলি, পরোক্ষই বলি; তিনিও গেলেন মহামারীর কোপেই। তার নামে বেদনাটি আরো বড় হয়ে বাজে। কারণ ৮৫ উতরেও সৌমিত্র ছিলেন বড্ড সম্ভাবনাময়। তার দেয়ার ক্ষমতা ছিল অক্ষুণ্ন। তার ভাঁড়ার ছিল অফুরান। ‘অপুর সংসার’কে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাজ বিবেচনা করলে পর্দায় তার অভিনয়ের বয়স দাঁড়িয়েছিল ৬২ বছর। নিজের সেরাটা দিয়ে যাওয়ার জন্য নেহাতই কোনো অল্প সময় নয়। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে দিয়েও গেলেন তা; একেবারে অকৃপণভাবে, মুঠোভরে।

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি নিজেকে যেভাবে ভেঙেছেন, গড়েছেন, মানিয়ে নিয়েছেন। বাংলা চলচ্চিত্রে এ নিরীক্ষা-মগ্নতার দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ আমরা পাইনি। আবার কেবল কি অভিনয়? কবিতা-চর্চা, গদ্য-চর্চা, পত্রিকা-সম্পাদনা, নাট্য-চর্চা, নাট্য-সংগঠন; কিংবা, সেই ভরা গলায় বাংলা কবিতাকে ধারণ করা। বহুমাত্রিক ও প্রগাঢ় শিল্প-মনস্কতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পরিণত করেছিল আমাদের যাপনেরই এক অনিবার্য অঙ্গে, আশ্রয়ে, ভালোবাসায়। দাদা নাটকের দল গড়ায়, তাদের কৃষ্ণনগরের বাড়িতে ছিল নাট্যচর্চার পরিবেশ। ছেলেবেলায় অভিনয়ের হাতেখড়িটা সেখান থেকেই। ধরে রেখেছিলেন আজীবন। আমৃত্যু। এক গভীর প্রত্যয়ে মহানগর কলকাতায় নিজের পথ আবিষ্কার করেছিলেন, এগিয়েছিলেন তরুণ সৌমিত্র। বাংলা বিভাগের কলেজপড়ুয়া ছাত্র প্রায়ই গিয়ে বসে থাকতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’ শিশির কুমার ভাদুড়ীর কাছে। এ বয়স্ক নটরাজ অন্তিম শিষ্য সৌমিত্রকে বলেছিলেন: ‘যখন পড়বে গোয়েন্দার মতো পড়বে’। আজীবন তিনি এ গুরুবাক্য মেনে চলেছেন। গোয়েন্দার মতো না পড়লে কী, থিয়েটারেই বলি, পর্দাতেই বলি; ওভাবে সব চরিত্রকে জীবন্ত, বিশ্বস্ত, সবার করে তুলতে পারতেন!

অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত পেকেছিল মৌলত থিয়েটারের মাধ্যমে। আজীবন থিয়েটারে অভিনয়ও করেছেন। তবে রপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন নিজস্ব একটি অভিনয়-কৌশল, যা প্রচলিত থিয়েটার ধারা থেকে স্বতন্ত্র ছিল। অথচ কী আশ্চর্য বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভা, ক্ষমতা ছিল তার! চলচ্চিত্রের অভিনয়ে কখনো সেই থিয়েটারের ছাপ কেন, ছায়াটুকুও পৌঁছতে দেননি। সেটি ‘অপুর সংসার’ থেকে শুরু করে শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ ‘বেলাশেষে’ পর্যন্ত; সবখানেই। শিশির কুমারের পর সত্যজিৎ রায়ের নজরে এসেছিলেন ‘অপরাজিত’র শুটিং দেখতে গিয়ে। যাতায়াতটা জারি ছিল। একদিন ‘জলসাঘর’-এর সেটে সত্যজিৎ সৌমিত্রকে দেখিয়ে ছবি বিশ্বাসকে বলেছিলেন—এই হলো ‘অপুর সংসার’-এর অপু। নিজের বিশিষ্ট অভিনয় ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের মানসপুত্র। বিশ্ব চলচ্চিত্রের দিকে চাইলে প্রত্যক্ষ করা যায়, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর যেমন ছিলেন পিয়ের লিউ, আকিরা কুরোসাওয়ার তোশিরো মিফুন, ফেদেরিকো ফেলেনির মার্চেল্লা মাস্ত্রোয়ানি; ঠিক তেমনি সত্যজিৎ রায়ের ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

২.

সত্যজিতের অনেক চলচ্চিত্রই রয়েছে, যার চিত্রনাট্য তাকে মাথায় রেখেই তৈরি করা। অর্থাৎ, সৌমিত্র ছাড়া কল্পনা করা যায় না। এ প্রসঙ্গে আমরা ‘অপুর সংসার’, ‘চারুলতা’, ‘কাপুরুষ’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘গণশত্রু’ চলচ্চিত্রগুলোর কথা অনায়াসে উল্লেখ করতে পারি। এ চলচ্চিত্রগুলোয় তিনি ছিলেন অনিবার্য। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পর্দার জগতে পা রেখেছিলেন পঞ্চাশের দশকের শেষে। যখন থিয়েটারি ঢঙ ঘুচিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র সবে নিজস্বতার রাস্তায় পা বাড়িয়েছে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘শাপমোচন’, ‘অগ্নি পরীক্ষা’র মাধ্যমে নিজের পাকা আসন তৈরি করে নিয়েছেন উত্তম কুমার। আর্ট ফিল্মের বাইরে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ধারায় টিকে থাকতে সৌমিত্রকে পাল্লা দিতে হয়েছিল তার সঙ্গেই। আরো ছিলেন একাধিক মহারথী: অনিল চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী, বিকাশ রায়, শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়, শমীত ভঞ্জ। এখানেও অভিনয়ের নিজস্ব ধারা গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ে উত্তম কুমার এক রোমান্টিক, আবেগী বাতাবরণ তৈরি করতেন। অন্যদিকে, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেকে গড়ে নিয়েছিলেন কৌশলী ও বুদ্ধিদীপ্ত অভিনেতা হিসেবে।

এ ধারাকে কাঠামো দিতে গিয়ে তিনি নায়ক চরিত্রের বাইরেও একাধিক ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। গুণে, প্রতিভায়, কর্মে উতরে গেছেন সবাইকে। এ পর্বে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত: ‘ক্ষুধিত পাষাণ’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘অতল জলের আহ্বান’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘বর্ণালী’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘বাক্স বদল’, ‘মনিহারা’, ‘হাটে বাজরে’, ‘বাঘিনী’, ‘পরিণীতা’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘স্ত্রী’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘দত্তা’, ‘দেবদাস’, ‘তাহাদের কথা’, ‘মহাপৃথিবী’ চলচ্চিত্রগুলো নাম করার মতো। তাকে বাংলার সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রে একজন অনিবার্য অভিনেতা হিসেবে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় প্রতিভার সঙ্গে সংলাপ উচ্চারণের অসামান্য দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

পরিণত বয়সে উপনীত হয়েও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অন্তহীন সম্ভাবনাময়। চলমান দশকে ‘প্রাক্তন’, ‘বেলাশেষে’, ‘পোস্ত’, ‘বসু পরিবার’, ও ‘৬১ নং গড়পার লেন’ চলচ্চিত্রগুলোয় তার অনবদ্য অভিনয় এ সম্ভাবনার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি সারা জীবনে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। কাজের ক্ষেত্রে ‘শতভাগ দেয়া’ কথাটিকে যদি ব্যবহারিক গণ্ডি অতিক্রম করে চেতনা হিসেবে জ্ঞান করা যায়। তবে এ ‘শতভাগ দেয়া’র চেষ্টা তিনি তার প্রতিটি অভিনয়েই রাখতে সক্ষম হয়েছেন। আরো দুটি জিনিস রেখে গেলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভবনা। প্রথমে চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আসা যাক—আগামী প্রজন্ম কি পারবে অভিনয়ের একাগ্রতায় তাকে উতরে যেতে? এ উত্তর আমাদের সময় বলে দেবে। আর সম্ভাবনাটা হলো তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো এই ভাবী অভিনেতা-প্রজন্মের জন্য চিরন্তন পাঠশালা হয়ে থাকল। যেখানকার মাস্টারমশাই ‘হীরক রাজার দেশে’র উদয়ন পণ্ডিত কিংবা ‘কোনি’র ক্ষিদদা। যিনি কেবল অভিনয় নয়, লড়াইটাও শেখাবেন: ‘দড়ি ধরে মারো টান/রাজা হবে খান খান’ কিংবা ‘ফাইট কোনি ফাইট’। তাকে প্রণতি জানাই।

 

নাজমুল হাসান: লেখক

আরও