সিনেমা বাজারের সংশয় কাটাল গলুই-শান

মহামারীর প্রভাবে দুই বছরে চারটা ঈদে সিনেমা মুক্তি পায়নি। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বেশকিছু সিনেমা হল। বেড়েছে ওটিটি প্লাটফর্মের জনপ্রিয়তা। গত ঈদুল ফিতরে দর্শক সিনেমা দেখতে হলে আসবেন কিনা তা নিয়ে ছিল সংশয়।

মহামারীর প্রভাবে দুই বছরে চারটা ঈদে সিনেমা মুক্তি পায়নি। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বেশকিছু সিনেমা হল। বেড়েছে ওটিটি প্লাটফর্মের জনপ্রিয়তা। গত ঈদুল ফিতরে দর্শক সিনেমা দেখতে হলে আসবেন কিনা তা নিয়ে ছিল সংশয়। বাংলা সিনেমা ঘুরে দাঁড়াবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করছিল ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো কেমন সাড়া পেল তার ওপর। আপাতত সংশয় দূর হয়েছে। হল রিপোর্ট ও পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, গলুই-শানে ভর করে তীরে উঠেছে বাংলা সিনেমা।

এবার ঈদে চারটি সিনেমা মুক্তি পেলেও আলোচনায় ছিল তিনটি সিনেমা। সেগুলো হলো এসএ হক অলিক পরিচালিত, পূজা চেরি ও শাকিব খান অভিনীত গলুই; এম রাহিম পরিচালিত, পূজা চেরি ও সিয়াম আহমেদ অভিনীত শান এবং শাহিন সুমন পরিচালিত শাকিব খান ও বুবলী অভিনীত বিদ্রোহী। গলুই ও বিদ্রোহী সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন শাকিব খান। শাকিব খানের ভক্ত সংখ্যা অনেক। শুধু তার ভক্তরাই একটি সিনেমা হিট বানিয়ে দিতে পারে। এনে দিতে পারে ব্যবসায়িক সাফল্য। গলুই ও বিদ্রোহী থেকে ভক্তরা কোনটা বেছে নেয় সেই ভাবনাই ছিল সিনেমা-সংশ্লিষ্টদের।

ঈদের আগে ১০৩টা হলে মুক্তির ঘোষণা দিয়ে বড় চমক দেখায় বিদ্রোহী। বিদ্রোহী সিনেমার শুটিং শুরু হয় ২০১৮ সালে এবং গলুই ২০২১-এর মাঝামাঝি। প্রচারে এগিয়ে ছিল গলুই। শাকিব খানও তার ফেসবুক পেজে একের পর এক প্রচারণা চালিয়েছেন এ সিনেমার। এছাড়া শুটিং চলাকালে শাকিবকে দেখতে জামালপুরে নেমেছিল মানুষের ঢল। সবার ধারণা ছিল হল দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকবে গলুই। বিদ্রোহীর শতাধিক হল দখল দেখে অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন বিদ্রোহীই বুঝি ব্যবসাসফল সিনেমা হতে যাচ্ছে। কিন্তু সিনেমা মুক্তির পর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। মাত্র ২৮টি হলে মুক্তি পাওয়া গলুইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে হল বেড়ে দাঁড়ায় ৩২। বিদ্রোহীর হল সংখ্যা ১০৩ থেকে নেমে আসে ৮০-তে। তৃতীয় সপ্তাহে গলুই ১৬টি হলে চললেও বিদ্রোহীর কোনো খোঁজখবর নেই। চতুর্থ সপ্তাহে গলুই চলছে ১২টি হলে। তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বিদ্রোহী সিনেমা প্রদর্শিত হল সংখ্যা জানতে সিনেমাটির প্রযোজক সেলিম খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে ঈদে মুক্তি পাওয়া শান সিনেমাটি বাজিমাত করেছে। হল দখলের লড়াইয়ে শান নিজের ভাগে নিতে পেরেছিল ৩৪টি। দ্বিতীয় সপ্তাহে পাঁচটি বেড়ে শানের হল সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯। তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে শান যথাক্রমে ২১ ও ১৯টি সিনেমা হলে সগৌরবে চলছে। শানের ব্যবসা নিয়ে দারুণ খুশি এর পরিচালক। এম রাহিম পরিচালিত প্রথম সিনেমা শান। ঈদে মুক্তি পেয়ে আশানুরূপ ব্যবসা করায় অনেকটা চাপমুক্ত হয়েছেন তিনি। তার সিনেমার দর্শকদের নিয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খেয়াল করলে দেখবেন প্রথম সপ্তাহের তুলনায় দ্বিতীয় সপ্তাহে শানের হল সংখ্যা বেড়েছে। দর্শকও বেড়েছে। এখনো অনেক হল হাউজফুল যাচ্ছে। এর কারণ শানের গল্প। গল্প, নির্মাণ, অ্যাকশন—সব মিলিয়ে শান একটা পরিপূর্ণ ঈদের মতো উৎসবের সিনেমা। এজন্য প্রথম সপ্তাহের তুলনায় দ্বিতীয় সপ্তাহে দর্শক বেশি এসেছেন।’

দিন দিন শানের দর্শক বাড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দিন দিন শানের দর্শক বাড়ার কারণ হলো এক দর্শক সিনেমা দেখে গিয়ে প্রশংসা করছেন। তার গল্প শুনে নতুন দর্শক আসছেন। আবার এমনও আছেন, অনেকে তিন-চারবার করে সিনেমাটা দেখছেন। একটা ভালো সিনেমা প্রথম সপ্তাহেই হল থেকে নেমে যায় না। বরং অন্যান্য হলও আগ্রহী হয়ে ওঠে। নতুন নতুন দর্শক তৈরি হয়। শান তারই প্রমাণ।’

গলুই নিয়ে পরিচালক এসএ হক অলিক বলেন, ‘টানা দুই ঈদ করোনায় কাটাতে হয়েছে আমাদের। সংশয় ছিল দর্শক হলে আসবেন কিনা। একটা বিশ্বাস ছিল দর্শক সিনেমা দেখবে। কিন্তু সেটা তো নাও হতে পারত। কিন্তু আমি খুবই আনন্দিত যে সে সংশয় দূর হয়েছে। দর্শক আনন্দ নিয়ে হলে এসেছেন। আনন্দ নিয়ে হল ত্যাগ করেছেন। আমি এমনও দেখেছি ষাট-সত্তরোর্ধ্ব দর্শক হলে এসেছেন। পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখেছেন।’

ইতিবাচক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকাটা আনন্দের জানিয়ে বলেন তিনি, ‘ঈদের দিন থেকেই বিভিন্ন ক্যাটাগরির দর্শক হলে এসেছেন। গলুই দেখেছেন। এটা আমাদের কাছে দারুণ ভালো লাগা। এবার দর্শক টানার একটা ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ছিল। সেই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা অনেক আনন্দের।’

গলুই ঘুরেফিরে আবার সিনেমা হলে আসবে বলেও জানান তিনি। ঈদের পরের মাসে ছয়টি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে মনে করিয়ে দিয়ে অলিক বলেন, ‘ঈদে চারটি সিনেমা মুক্তি পেল। পরের মাসে আবার ছয়টি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। এর মধ্যে পাপ-পুণ্য মুক্তি পেল। গত চারটা ঈদে সিনেমা মুক্তি পায়নি। আড়াই বছর ধরে দর্শক হলে যায়নি। এতদিন পর ধারাবাহিকভাবে ছবি মুক্তি পাচ্ছে হলে। বাংলা সিনেমার জন্য ঘটনাগুলো খুবই আনন্দের।’ সুন্দর পরিবেশ এবং সুন্দর ছবি পেলে দর্শক নিয়মিত হলে আসবেন বলেও তার বিশ্বাস।

তিনটি সিনেমা কেমন ব্যবসা করেছে? বাংলাদেশে বক্স অফিস বলে কিছু নেই। ফলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব না। তবে চলচ্চিত্র হল মালিক সমিতির তথ্যমতে, চারটি সিনেমার ভেতর সবচেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে শান, দ্বিতীয়তে রয়েছে গলুই, তৃতীয় অবস্থানে বিদ্রোহী। হল মালিক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, ‘এবারের ঈদে যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেয়েছে তার মধ্যে দর্শক চাহিদায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে শান। তার পরই আছে গলুই। তবে আমরা যে রকম আশা করেছিলাম সে রকম না হলেও অনেক দিন পর দর্শক হলে ফিরছেন, এটাই আশার কথা। আর এবারই বোধ হয় প্রথম অনুদানের কোনো ছবি (গলুই) সর্বোচ্চ হলে মুক্তি পেল। এটাও ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ এর আগে অনুদানের ছবি দু-একটা হলে মুক্তি পেত। কেউ জানতই না। অথচ গলুই ২৮টা হলে মুক্তি পেয়েছে। তবে সিনেমাগুলো পুরো লগ্নি তুলে আনতে পারবে কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।’

আরও