১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে দুটি দেশ জন্ম নিয়েছিল। ওই নির্দিষ্ট বছর, তার আগে ও পরে ঘটেছে আরো অনেক ঘটনা। সহজ দৃষ্টিতে বলতে আজ ভারতবর্ষ বলতে যে বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝায়, তা ভাগ হয়েছিল সাতচল্লিশে। কিন্তু এর পেছনে আছে ছোট বড় নানা ঘটনা। ক্রিপস মিশন, মন্ত্রী মিশন, বর্মা-ফেরত নৌসেনাপতিকে প্রেরণসহ ব্রিটিশরা নানা ছক কষেছিল। ভারতে তৈরি হচ্ছিল নানা রাজনৈতিক দল, মত ও উদ্দেশ্য। বহু মানুষ যুক্ত হয়েছিল সে সময়ের রাজনীতিতে। দোমিনিক লাপিয়ের ও ল্যারি কলিন্স এ নিয়ে লিখেছিলেন ‘ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট’। একই নামে সিরিজ নির্মাণ করলেন নিখিল আদভানি। কিন্তু বইয়ের মতোই এ সিরিজেও বড় ক্যানভাসের গল্পটি সংকীর্ণ হয়েই রইল।
ব্রিটিশরা ভারত শাসন করে প্রায় ১৯০ বছর। প্রথম ১০০ বছর ভারত ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর মহারানী ভারতকে নিজ শাসনাধীন করেন। এরপর সরাসরি ব্রিটিশ রাজপরিবারই ভারত শাসন করেছে। একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি তাদের আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে ভারত শাসন করত। অনেকে সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলেন, তবে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ভারতে স্বাধিকার আন্দোলন শুরু হয়। বিশের দশকে তা আরো গতি পায় এবং শুরু হয় সশস্ত্র আন্দোলন। ত্রিশের দশকে তা স্তিমিত হয়ে যায়। এদিকে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে জন্ম নেয় মুসলিম লীগ। কংগ্রেসের একচ্ছত্র রাজনীতিতে আসে প্রতিযোগিতা, তবে ভারতের রাজনীতি ক্রমেই ধর্মভিত্তিক হয়ে পড়ে। দুই রাজনৈতিক দলের মাসকটে পরিণত হন গান্ধী ও জিন্নাহ। এগুলোই মোটাদাগে ত্রিশ-চল্লিশের দশকের ব্রিটিশ ভারতের রাজনীতির গতিপথ। কিন্তু সেই মোটাদাগের ভেতর ছিল সূক্ষ্ম আরো কিছু বিষয়।
তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিছু বই হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট ঘটনা, দল বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। লাপিয়ের-কলিন্সের বইটিও সেই রকম। তাদের বইটি নন-ফিকশন হলেও ফিকশনের আদলে—বলা ভালো, ফর্মুলা সিনেমার আদলে—আছেন একজন নায়ক ও একজন খলনায়ক। তাদের আশপাশে পার্শ্ব চরিত্রে থাকেন আরো অনেকে। বইটিতে গান্ধী হলেন নায়ক আর খলনায়ক জিন্নাহ। সিরিজেও নিখিল সে কাজটিই করেছেন।
ওটিটি প্লাটফর্ম সনি লিভের জন্য নির্মিত সিরিজটির প্রথম সিজন প্রচার হয় ২০২৪ সালের নভেম্বরে। তুলনামূলক অপরিচিত মুখদের নিয়ে এসেছিলেন নিখিল। নেহরু চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিধান্ত গুপ্তা, মহাত্মা গান্ধী চরিত্রে চিরাগ ভোরা, বল্লভভাই চরিত্রে রাজেন্দ্র চাওলা ও মোহম্মদ আলী জিন্নাহ চরিত্রে আরিফ জাকারিয়া। এরা কেউই এর আগে এমন বড় পরিসরের সিরিজে ইতিহাসের বড় কোনো ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করেননি।
সিরিজ শুরু হয় ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে দিয়ে। কলকাতায় ছেচল্লিশ সালে যে দাঙ্গা হয়েছিল, ভারতের স্বাধীনতা বা ভারত ভাগে তা প্রভাব ফেলেছিল। বা বলা চলে সাতচল্লিশের ১৫ আগস্টে হওয়া ভারতের স্বাধীনতার আগে যে ক্রমাগত নানা ঘটনা ঘটেছিল তার সূচনাবিন্দু ছিল এ ঘটনা। সেখান থেকেই সিরিজ শুরু করেন নিখিল। এরপর ক্রমেই আসে ভারতের রাজনীতি, ভারতের সঙ্গে ব্রিটিশ কূটনীতি, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনীতি ইত্যাদি।
একটা টেলিভিশন বা ওটিটি সিরিজে ঠিক কী দেখানো হবে তা নির্মাতারা ঠিক করেন দর্শকচাহিদার ওপর ভিত্তি করে। ভারতের রাজনীতির জটিল বিষয়গুলো সিরিজে আনা সম্ভব না। স্বাভাবিকভাবেই বড় ঘটনাগুলো আসবে এবং আসবে এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের কথা। নিখিল আদভানির এ সিরিজও ব্যতিক্রম না। এখানে আলো ফেলা হয়েছে ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে, সত্যাগ্রহ, পাঞ্জাবের সংকট, পূর্ণ স্বরাজের দাবি, সীমানা ভাগ, দাঙ্গা, ধর্মীয় বিভেদ, বাস্তুত্যাগ, রাজ্য অধিগ্রহণ, কাশ্মীর সংকট ইত্যাদির ওপর। সে বিষয়গুলো ভারতীয় সিনেমা ও সিরিজে আগেও এসেছে। কিন্তু এ সিরিজে বিশেষ হয়ে ওঠে ঘটনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো।
ভারতভাগ একদিনে হয়নি। এর পেছনে ছিল বহুদিনের রাজনীতি ও কূটনীতি। ক্ষেত্রবিশেষে বড় কোনো রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত জেদের কারণে ঘটেছে দুর্ঘটনা। দলের ভেতরে নেতাদের মধ্যে ছিল মতভেদ। ভারতের রাজনীতি নিয়ে সিরিজ তো দূরের কথা, অনেক বইয়েও সেসব আসে না। ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট বইয়ে তা অনেকটা এসেছিল, কিন্তু ভিজুয়ালি তা দেখা ছিল একটা ভালো অভিজ্ঞতা।
বিশের দশকে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন মোহম্মদ আলী জিন্নাহ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু প্রমুখ। কিন্তু গান্ধীর আগমনের পর জিন্নাহর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। জিন্নাহ মুসলিম লীগে যোগ দেয়ার পর গান্ধী পরিণত হন কংগ্রেসের মাসকটে, কিন্তু ক্ষমতার চাবি চলে যায় মারাঠিদের হাতে, যার মধ্যে প্রধান ছিলেন বল্লভভাই। মাওলানা আজাদ কংগ্রেসেই ছিলেন, কিন্তু সেখানে তার কথার গুরুত্ব খুব বেশি ছিল না। এমনকি জওহরলাল নেহরুকেও অনেক সিদ্ধান্তে বাধ্য করতেন বল্লভভাই। সব যে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এমন না, কিন্তু বল্লভ অনেকটাই ছিলেন রক্ষণশীল, অন্তত নেহরুদের তুলনায়। ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট বই এ আলাপ সামান্য করলেও ভিজুয়ালে সে বিষয়টি স্পষ্ট করে আসে। এক্ষেত্রে নেহরু চরিত্রে সিধান্ত ও বল্লভভাই চরিত্রে রাজেন্দ্র চাওলা দারুণ অভিনয় করেছেন। বলা যায় রাজেন্দ্র ফাটিয়ে দিয়েছেন।
বই অনুসারে নির্মিত এ সিরিজে জিন্নাহ পুরোটা সময় নিজের মনমর্জিমতো কাজ করেন। তিনি তার দলের মধ্যে একজন একনায়ক। সেখানে আরিফ জাকারিয়া দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। সিরিজে উঠে এসেছে মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে নেহরুর বন্ধুত্ব। এমনকি এডুইনাও এ সিরিজে প্রাসঙ্গিক। মাউন্টব্যাটেন চরিত্রে দারুণ লুক ম্যাকগিবনি, এডুইনা চরিত্রকে অভিনয় ফুটিয়ে তুলেছেন কর্ডিয়েলা বুজেজা। চিরাগ ভোরাও গান্ধীর চরিত্রে মোটামুটি ন্যায়বিচার করেছেন।
সিরিজটি ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে থেকে শুরু করে পাঞ্জাব, বাংলার দাঙ্গা, ভিটা ছাড়া মানুষের কথা বলে। সিরিল রÅvডক্লিফের দুরবস্থা থেকে শুরু করে দেশীয় রাজাদের একাত্মতা এবং কূটনীতির মাধ্যমে তাদের পরাস্ত করার কথাও বলে। সেই সঙ্গে আছে কংগ্রেস, মুসলিম লীগের দলের ভেতরে নেতাদের মতভেদ। এ বিষয়গুলো ভারতের সিনেমা-সিরিজে এর আগে এত স্পষ্টভাবে আসেনি। কিন্তু লাপিয়ের ও কলিন্সের বইয়ে গান্ধী ছিলেন আধ্যাত্মিক নেতা, তার মধ্যে এক রকমের মহাজাগতিক ঋষিত্ব আরোপ করেছিলেন দুই লেখক এবং তা প্রতিষ্ঠা করতে জিন্নাহকে রাজনীতি, কূটনীতি ও প্রতিভার বাইরে একগুয়ে এক চরিত্র করে তোলা হয়েছিল। সিরিজটি এ জায়গা থেকে বের হয়নি। তাই প্রবল সম্ভাবনা রেখেও মিডিওকোর হয়েই থাকল শেষ পর্যন্ত।