তবে এবারের ঈদুল আজহায় সেই চেনা খোলস থেকে বেরিয়ে দর্শককে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে নির্মাতা জাকারিয়া সৌখিনের নাটক মায়াপাখি। সিএমভির ব্যানারে ইউটিউবে মুক্তি পাওয়া প্রায় ২ ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের এ নাটক এখন দর্শক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গতানুগতিক রোমান্টিক ধারার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক করপোরেট জীবনের এক অন্ধকার বাস্তবতাকে মনস্তাত্ত্বিক ক্রাইম-থ্রিলারের আবহে পর্দায় এনেছেন নির্মাতা।
নাটকটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর নির্মাণকৌশল ও গল্পের বুনন। দুই ভাগে বিভক্ত এ নাটকের প্রথমার্ধ বা ফার্স্ট হাফ একদম সহজ-সরল, সাদামাটা এক মধ্যবিত্ত দম্পতির গল্প। যেখানে ছোট ছোট সুখ, আবেগ, ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে সাদাত ও মায়ার সংসার খুব সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু গল্পের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে এর দ্বিতীয়ার্ধে। সেখানে এসে মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের সঙ্গে করপোরেট দুনিয়ার আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর পেশাগত সাফল্য পাওয়ার তীব্র লোভের এক চরম সংঘাত দেখা যায়।
গল্পে সম্পর্কের এ মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন এবং চরিত্রের মেজাজ বোঝাতে পরিচালক ‘ব্ল্যাক কফি’ ও ‘গ্রিন অ্যাপেল’—এ দুই ভিন্ন স্বাদের রূপক ব্যবহার করেছেন, যা দর্শকের ভাবনার খোরাক জোগায়। ক্যারিয়ার আর ইগোর লড়াইয়ে কীভাবে একটি সাজানো সংসার ও গভীর বিশ্বাস ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে। পুলিশ যখন শুরুতেই সাদাতকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে, তখন থেকেই গল্পে এক ধরনের রহস্যের অনুভূতি তৈরি হতে থাকে, যা দর্শককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্ক্রিনে ধরে রাখে। বিশেষ করে শেষ ১৫ মিনিটের টুইস্ট পুরো নাটকের প্রেক্ষাপটই বদলে দেয়।
অভিনয়ের দিক থেকে ‘সাদাত’ চরিত্রে জিয়াউল ফারুক অপূর্ব আরো একবার প্রমাণ করেছেন, কেন তিনি এ সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ও দর্শকের প্রিয় অভিনেতা। একজন মানুষ যখন চোখের সামনে নিজের ভালোবাসার মানুষকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে, সেই অসহায়ত্ব, কষ্ট, ধোঁকা খাওয়া ও পরবর্তী সময়ের প্রতিশোধের তীব্র আগুনে রূপান্তর তিনি তার অভিনয়ের অবিশ্বাস্য লেয়ার বা স্তরের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অন্যদিকে তরুণ অভিনেত্রী নাজনীন নাহার নীহাও এ নাটকে নিজের অভিনয়ের পরিপক্বতার দারুণ স্বাক্ষর রেখেছেন। শুরুতে হুমায়ূন আহমেদের গল্পের মতো শান্ত, নরম স্বভাবের মেয়েটি করপোরেট দুনিয়ার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে কীভাবে একটু একটু করে বদলে যায় এবং পরিস্থিতির শিকার হয়, সে রূপান্তর তিনি দারুণভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন। পার্শ্ব চরিত্রে শাহেদ শরীফ খানের রহস্যময় উপস্থিতি গল্পে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে, আর তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে সুমন আনোয়ারের কড়া সংলাপগুলোও ছিল বেশ উপভোগ্য।
নাটকটির কারিগরি দিক, বিশেষ করে রহস্যের মুড অনুযায়ী ‘লো-লাইটিং’ বা আলো-ছায়ার ব্যবহার এবং আধুনিক রূপসজ্জা দৃশ্যায়নকে আরো গম্ভীর ও দর্শনীয় করে তুলেছে। তবে প্রশংসার পাশাপাশি মায়াপাখি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। নাটকে করপোরেট নারী চরিত্রের নেতিবাচক উপস্থাপন নিয়ে দর্শকের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এটি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে ভুল বার্তা দিতে পারে। এছাড়া একটি অন্তরঙ্গ দৃশ্য নিয়েও দর্শক কিছুটা আপত্তি তুলেছেন।
সব সমালোচনা একপাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, দীর্ঘ ২ ঘণ্টার একটি নাটককে যেভাবে পরিচালক জাকারিয়া সৌখিন আকর্ষণীয় করে রেখেছেন, তার জন্য তিনি একটি ধন্যবাদ পেতেই পারেন।