কোনো শব্দ নেই, কোনো সংলাপ নেই। তবুও মানুষের অনুভূতি, বেদনা, আনন্দ, একাকীত্ব, সবকিছুই অভিনয়ের যে শাখার মধ্য দিয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়, তাই 'মাইম'। বহুদিন ধরে এ শিল্প ছিল প্রান্তিক, অনেকটা অবহেলিত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে একজন এ নীরব শিল্পকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি মার্সেল মার্সো। তাকে বোঝার জন্য মঞ্চের আলো থেকে দূরে সরে যেতে হয়, ফিরে যেতে হয় এক অস্থির, ভীতিকর ইউরোপে, যেখানে নীরবতা ছিল শিল্প নয়, বরং বেঁচে থাকার উপায়।
১৯২৩ সালের ২২ মার্চ ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে এক ইহুদি পরিবারে জন্মান মার্সেল মার্সো। বাবা-মা তার নাম মার্সেল মাঙ্গেল রাখলেও ইউরোপজুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে এ পরিচয়ই হয়ে ওঠে বিপদের কারণ। একটি নাম, একটি শব্দ, সবকিছুই হয়ে ডেকে আনতে পারে মৃত্যু। সেই সময়ে নিজের নাম মাঙ্গেল থেকে বদলে রাখেন মার্সো। এটি কোনো শিল্পীসুলভ পুনর্জন্ম ছিল না, ছিল নিছক বেঁচে থাকার কৌশল।
যুদ্ধ যখন ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তখন মার্সো যুক্ত হন ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে। এখানেই তার জীবনের গল্প এক নতুন মাত্রা পায়। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, তার লড়াই ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু গভীরভাবে মানবিক। তিনি জড়িয়ে পড়েন ইহুদি শিশুদের গোপনে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেয়ার কাজে। সীমান্ত পার করা, শত্রুদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া, সবই ছিল প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে ভরা।
এমন পরিস্থিতিতে শব্দ ছিল বিপজ্জনক। একটি কান্না, একটি চিৎকার, সবকিছুই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। আর ঠিক এখানেই মার্সো আশ্রয় নেন ‘মাইম’ এর। শিল্প হিসেবে নয়, বাঁচার উপায় হিসেবে। তিনি শিশুদের শান্ত রাখতেন, তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতেন তার শরীরের নানা অঙ্গভঙ্গি দিয়ে। কখনো কখনো তিনি পুরো যাত্রাটিকেই এক অভিনয় মঞ্চ বানিয়ে তুলতেন, যেন তারা কোনো বিপদের মধ্যে নয়, বরং একটি সিনেমা ভ্রমণে বেরিয়েছে।
কিন্তু অন্যদের বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজে সবকিছু হারানো থেকে রেহাই পাননি। ১৯৪৪ সালে তার পিতাকে গ্রেফতার করে আউশভিৎসে পাঠানো হয়, সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এই শোক, এই নীরব শূন্যতা মার্সোর ভেতরে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে। পরবর্তীতে তার অভিনয়ে যে এক ধরনের মৃদু বিষণ্ণতা দেখা যায়, বিশেষ করে তার বিখ্যাত চরিত্র ‘বিপ’-এ, তা কোনো অভিনয় কৌশল ছিল না, ছিল জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
যুদ্ধ শেষে ইউরোপ যখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে নিজেকে গড়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই মার্সো প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে মঞ্চে দাঁড়ান। হাজারো সৈন্যের সামনে তার সেই নীরব অভিনয় এক ভিন্ন অর্থ বহন করে। কারণ সেই সময় ভাষা ছিল ক্লান্ত, কলুষিত, প্রচার, আদেশ, বিভাজনের ভারে ভারাক্রান্ত। এমন এক সময়ে, এক নীরব মানুষ এসে দাঁড়ালেন, যিনি কোনো শব্দ না বলেই মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে গেলেন। এই মুহূর্তটিই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাইম তখন আর শুধু তার দক্ষতা নয়, এটি হয়ে ওঠে তার বিশ্বাস। যেখানে ভাষা ব্যর্থ, সেখানে নীরবতাই সত্য।
যুদ্ধের পর তিনি নিয়মিতভাবে মাইম ও থিয়েটার চর্চা শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি করেন তার কিংবদন্তি চরিত্র ‘বিপ’। একটি চরিত্র যার পরনে চরিত্র, ডোরাকাটা জামা, পুরনো টুপি আর একটি ফুল, একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক এবং গভীর মানবিক। বিপের মাধ্যমে তিনি জীবনের সূক্ষ্মতম অনুভূতিগুলো তুলে ধরেন, আনন্দ, সংগ্রাম, একাকীত্ব, ভালোবাসা, সময়ের ক্ষয়। এই চরিত্রের ভেতরে যেমন ছিল কোমলতা, তেমনি ছিল এক অনুচ্চারিত বেদনা যা তার নিজের জীবনের প্রতিধ্বনি।
মার্সোর পথচলাকে অনন্য করে তোলে, তার নির্বাচন ক্ষমতা। এমন এক সময় পার করে তিনি এসেছেন, যখন ভাষা বিভক্ত করেছে, প্রতারণা করেছে, কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হয়েছে। তাই তিনি বেছে নিলেন এমন এক মাধ্যম, যা ভাষার সীমা অতিক্রম করে। মাইম কোনো দেশের নয়, কোনো ভাষার নয়, এটি সম্পূর্ণ মানবিক, সর্বজনীন।
তার জীবনের আরও কিছু নীরব অধ্যায় রয়েছে, যা খুব কম আলোচিত। যুদ্ধের সময় তিনি নথিপত্র পরিবর্তনে সাহায্য করেছেন, তরুণদের জোরপূর্বক শ্রমে পাঠানো থেকে রক্ষা করতে তাদের বয়স কম দেখিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি একাধিক ভাষায় দক্ষ হয়ে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছেন, অথচ শেষ পর্যন্ত নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এমন এক শিল্পে, যেখানে কোনো ভাষার প্রয়োজনই নেই। এমন এক সময় যখন মাইমকে গুরুত্বহীন মনে করা হতো, তখন তিনি একে নিজের জীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন এবং বিশ্বব্যাপী সম্মান এনে দেন।
দূর থেকে দেখলে মার্সোকে একজন শিল্পী হিসেবেই মনে হয়, একজন মানুষ, যিনি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেন, অদেখা ঝোঁকে ন্যুয়ে পড়েন। কিন্তু তার জীবনের প্রেক্ষাপটে এই সবকিছুই যেন প্রতীকে পরিণত হয়। অদৃশ্য বাধা, নিঃশব্দ সংগ্রাম, এসব তার নিজের জীবনেরই প্রতিফলন।
শেষ পর্যন্ত, মার্সেল মার্সোর গল্প কেবল একজন মাইম শিল্পীর গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি এমন এক পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন, যেখানে কথা বলা বিপজ্জনক হতে পারত, যেখানে পরিচয় মুছে যেতে পারত, যেখানে নীরবতাই ছিল আশ্রয়।