গল্প প্রেমের হতে পারে, প্রতিবাদের হতে পারে, অপেক্ষার হতে পারে, আরো অনেক কিছুরই হতে পারে। এর মধ্যে কিছু গল্পের জন্য দর্শক অপেক্ষা করেন। হয়তো দর্শক তার নিজ পছন্দ অনুসারেই গল্প বাছাই করেন। তবে কিছু গল্প, কিছু সিনেমা, কিছু নির্মাতার কাজের জন্য সিনেমার দর্শক সত্যিই অপেক্ষায় থাকেন। ইমতিয়াজ আলী ও তার গল্পও এ তালিকায় থাকবে। দর্শক সেসব গল্প বা সিনেমা কেবল দেখেন না, গভীর রাতে, গরমের দুপুরে কিংবা তুমুল বর্ষাকে পাত্তা না দিয়ে গল্পগুলো যাপন করেন।
‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ আসলে কীসের গল্প? প্রেম? হতে পারে। অপেক্ষা? ভারত ভাগের ক্ষত? হতে পারে। ইমতিয়াজ যে প্রায় সব গল্পে ব্যক্তির অন্দরমহলের অন্তর্দহনে তার দর্শককে শামিল করেন, এটা সেই গল্পও হতে পারে। আধুনিক সময় ও পুরনো সময়ের পার্থক্য আর তার মিলন ও ছেদবিন্দুর গল্পও এটি। কেননা এ সিনেমায় ঈশ্বর গ্রেওয়ালের সঙ্গে তারা প্রথম যৌবনের প্রেমে পড়বেন। নির্বৈরের সঙ্গে আধুনিক সময়ের জটিলতার দ্বন্দ্বে পড়বেন। দর্শক ঈশ্বরের আফসানাকে নিজের গল্পের সঙ্গে মেলাবেন। আমরা ঈশ্বরের বার্ধক্যে, তার যাপন আর যাতনাকে বুঝতে পারি। কেননা এমন অনেক গল্প দেখেছি, শুনেছি। নাকে নল লাগানো বৃদ্ধকে দেখে প্রশ্ন জাগে, একদিন আমিও কি ওভাবেই কোনো অসম্পূর্ণ কাজের যাতনায় জ্বলব?
কিন্তু ঈশ্বরের পাশেই থাকে নির্বৈর। বারবার চাকরি ছেড়ে দেয়া, সম্পর্কে স্থির না হওয়া সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। কাবেরির সঙ্গে তার নাচ দেখে মনে পড়ে ইমতিয়াজ এভাবেই আমাদের তখনো না হওয়া গল্পটা বলে টুইস্ট গানে নাচিয়েছিলেন ১৭ বছর আগে। ‘লাভ আজ কাল’-এর কিছু উপাদান আমাদের ইমতিয়াজের দুনিয়ায় আরেকবার ফিরতে বলে।
ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গার গল্পটা বহুমুখী। সহজ করে বললে, ঈশ্বর গ্রেওয়ালের বাড়ি ছিল সারগোদা। সেখানে এক মুসলিম নারীর প্রেমে পড়েছিল সে। ভারত ভাগের আগের কথা। রক্ষণশীল সে সমাজে প্রেম, সম্পর্কের চর্চা আজকের মতো ছিল না। লুকিয়ে দেখা করা, পরিবার ও সমাজের বিপরীতে গিয়ে প্রেমকে টিকিয়ে রাখাই ছিল ধারা। ঈশ্বর আর আফাসানা সে কাজ করেছিল। কিন্তু তাদের জন্য আরেক বাধা হয়ে এসেছিল ভারত ভাগ। যার অন্যতম বলি ছিল পাঞ্জাব। ভাগ হওয়া পাঞ্জাব থেকে চলে যেতে হয় ঈশ্বরকে। কিন্তু সে কথা দিয়েছিল, একদিন ফিরে আসবে।
সিনেমায় মূল গল্পের সঙ্গে এভাবেই যুক্ত হয় পার্টিশন। সেই সঙ্গে আছে ভিন্ন দুই ধর্মের নারী-পুরুষের ভালোবাসা ও সম্পর্কের জটিলতা। উঠে এসেছে স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, পোশাক, পারিবারিক নিয়ম, যাপন, স্থাপত্য ইত্যাদি। পাশাপাশি নির্বৈর চরিত্রের মাধ্যমে এসেছে একুশ শতকের নাগরিক, মেট্রোপলিটন জীবনের দ্বন্দ্বও।
ইমতিয়াজ আলীর এবারের কাজটি বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করতে গেলে আসবে পার্টিশন প্রসঙ্গ। পার্টিশনের সে দিনগুলোর কথা আরো অনেকে বলেছিলেন। পাঞ্জাব মানেই ভয়ংকর দাঙ্গা। তা কতটা ভালো করে দেখানো হলো? ট্রেনে কচুকাটা মুসলিম, শিখ আর হিন্দুর দৃশ্য ইমতিয়াজের চেয়ে ভালো দেখিয়েছেন চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদী (পিঞ্জর), এমনকি অনীল শর্মা (গদর: এক প্রেম কথা)। তবে এ সিনেমায় বেদাঙ্গের দৌড় দেখে মনে পড়ে মিলখারূপী ফারহান আখতারকে। মনে পড়ে খুশবন্তের ট্রেন টু পাকিস্তান। আর মনে পড়ে মান্টোকে। ‘খোল দো’, ‘ঠাণ্ডা গোশত’-এর মান্টোকে। তবে ইমতিয়াজের সিনেমায়, ‘আব্রু বাঁচাতে’ পরিবারের ছোট-বড় নারীদের গলায় ছুরি চালানো জ্যেষ্ঠ নারীটিকে দেখে নির্দিষ্ট কারো কথা মনে পড়ে না। কিছুক্ষণের জন্য হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে অনুভব করি, মানুষকে। সমাজকে, আব্রুকে, অসহায়ত্বকে।
ঈশ্বর চরিত্রের তরুণ বয়সে অভিনয় করেছেন বেদাঙ্গ রায়না, বৃদ্ধ বয়সে নাসিরউদ্দিন শাহ। বেদাঙ্গের মধ্যে তারুণ্যের সাহস, উচ্ছলতা, বেপরোয়া ভাবের সঙ্গে আছে কোমলতা ও লালিত্য। ভালো অভিনয় করেছেন। আফসানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন শর্বরী বাগ। শর্বরী ও বেদাঙ্গ তাদের অভিনীত দুই চরিত্রের মধ্যকার রসায়ন চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। নির্বৈর চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনিও বরাবরের মতো ভালো অভিনয় করেছেন। বড় চরিত্র বাদে পার্শ্বচরিত্রে রজত কাপুর ও মনীশ চৌধুরী ভালো কাজ করেছেন। বিশেষত মুজাফফর চরিত্রে সংক্ষিপ্ত স্ক্রিন টাইমেও মনীশ প্রভাব রেখেছেন।
সবশেষে আসবে নাসিরউদ্দিন শাহর কথা। পুরো সিনেমায় বেশির ভাগ দৃশ্যেই নাসির বিছানায় শুয়ে অভিনয় করেছেন। দুই-এক জায়গায় বিসদৃশ ঠেকলেও কেবল বিছানায় শুয়েই তিনি চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, ভ্রুভঙ্গি দিয়ে ঈশ্বর চরিত্রের যাতনাকে মূর্ত করেছেন।
গল্প ইমতিয়াজ আলীর। যা কিছু বলা হলো তার বেশির ভাগই ইমতিয়াজ আলীর পরিচালনার ফসল। তার সঙ্গে এআর রহমানের সংগীত যুক্ত হয়ে সিনেমাকে আরো ঋদ্ধ করেছে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এ সিনেমা দর্শকের মনে থাকবে গল্পটার কারণেই। কেননা প্রেম, অপেক্ষা, বিশ্বাসের এ গল্পে ঈশ্বর গ্রেওয়াল কথা দিয়েছিল ফিরবে। ঈশ্বর তার কথা রাখে।