চ্যাম্পিয়নস লিগ

দেম্বেলের গোল ও দোন্নারুমার দেয়াল, আর্সেনালকে হারিয়ে এগিয়ে পিএসজি

পার্ক দে প্রিন্স-এ অপেক্ষা করছে উত্তাল গ্যালারি, আর সেখানে পিএসজির পা থেকে বল ও ফাইনালের প্রতি তাদের হাতছানি— কোনোটাই সরিয়ে নেয়া সহজ নয়।

ম্যাচের আগে আর্সেনাল ভক্তদের উদ্দেশে আর্তেতা বলেছিলেন, ‘বুট পরে এসো’। ইতিহাস গড়ার রাতে যেন গ্যালারিও লড়াকু হয়। কিন্তু পিএসজি শুরুতেই পানিতে ভাসিয়ে দেয় গানারদের অস্ত্রাগার।

লড়াই এখনো শেষ হয়নি—এটাই মিকেল আর্তেতার জন্য সান্ত্বনা। তবে আর্সেনাল যদি সত্যিই চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসে নিজের নাম তুলতে চায়, তবে দ্বিতীয় লেগে প্যারিসে অসাধারণ কিছুই করতে হবে। পার্ক দে প্রিন্স-এ অপেক্ষা করছে উত্তাল গ্যালারি, আর সেখানে পিএসজির পা থেকে বল ও ফাইনালের প্রতি তাদের হাতছানি— কোনোটাই সরিয়ে নেয়া সহজ নয়। এমিরেটসে চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম লেগের শুরুতে চতুর্থ মিনিটে ওসমান দেম্বেলের গোলে তারা যে দাপট দেখিয়েছে, তা ছিল ইউরোপজুড়ে প্রশংসা কুড়ানো সেই প্যারিসিয়ান সিম্ফনিরই এক টুকরো।

ম্যাচের শুরু থেকেই নিজের ছন্দে বাজতে থাকা পিএসজি আধিপত্য রেখেছিল প্রথম ৩৫ মিনিট। শেষের দিকে আবার লুইস এনরিকের শিষ্যরা গতি বাড়ালে মনে হচ্ছিল, তারা ম্যাচে শেষ কথা বলে ফেলবেই। কিন্তু সেটা হয়নি। আর্সেনালও কিন্তু লড়েছে। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি ও লিয়ান্দ্রো ত্রোসারের শট ঠেকিয়ে দোন্নারুমা জানিয়ে দেন কেন তিনি ইউরোপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। মিকেল মেরিনোর একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও কিছু সময়ের জন্য গানারদের মাঝে ফিরেছিল আত্মবিশ্বাস। তবু এই রাত আর্তেতার স্বপ্নের মতো হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের মতো মহাকাব্যিক মুহূর্ত আর ধরা দেয়নি।

শেষ দিকে পিএসজির একতরফা আধিপত্য এতটাই ছিল যে, আরো গোল হলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। একের পর এক আক্রমণে উঠে আসা গঞ্জালো রামোস বল মারেন ক্রসবারে, ব্র্যাডলি বারকোলা একা হয়েও মারেন বাইরে। আর্সেনাল যেন দৈব বিচারেই বেঁচে গেল!

দোন্নারুমার প্রাচীরেই ঘোলা হয়ে গেছে আর্সেনালের স্বপ্ন। ছবি: এপি

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, ম্যাচের নায়ক দেম্বেলেকে গ্রুপ পর্বে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে রাখেনি পিএসজি। সেই ম্যাচে জিতেছিল আর্সেনাল ২-০ গোলে। কিন্তু এদিন দেম্বেলে ফিরেছেন দুর্দান্ত এক গোল নিয়ে—শেষ ২৫ ম্যাচে ২৫তম গোল!

ম্যাচের আগে আর্সেনাল ভক্তদের উদ্দেশে আর্তেতা বলেছিলেন, ‘বুট পরে এসো’। ইতিহাস গড়ার রাতে যেন গ্যালারিও লড়াকু হয়। কিন্তু পিএসজি শুরুতেই পানিতে ভাসিয়ে দেয় গানারদের অস্ত্রাগার।

প্রথম গোলেই দেখা গেল পিএসজির আক্রমণভাগের ক্ষিপ্রতা। মাঝমাঠে দেম্বেলে বল এগিয়ে দিয়ে খুঁজে নেন কাভিশা কাভারাশখেইয়াকে। বল ফেরত পেয়ে দেম্বেলে ছুঁড়ে দেন একটা নিচু শট, আর পোস্ট স্পর্শ করে বল ঢুকে যায় জালে। আলট্রারা তখন ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে উৎসবে মাতোয়ারা।

প্রথমার্ধে পুরোপুরি পিএসজির দখলে ম্যাচ। ভিটিনিয়ারা যেন ইচ্ছা মতো আধিপত্য করলেন। কার্ডের কারণে দলের বাইরে থাকা থমাস পার্টের অভাব অনুভব না করেই পারেননি আর্তেতা। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে ডেকলান রাইসও এ ম্যাচে স্বাধীনতা পেলেন না। একমাত্র পিভট থাকতে হলো মাদ্রিদ-জয়ের এই নায়ককে। ফলাফল— মাঝমাঠের কর্তৃত্ব হারালো আর্সেনাল। ডান দিক থেকে বাঁয়ে—দোয়ে, দেম্বেলে আর কাভারাশখেইয়া মিলে তৈরি করলেন থ্রেট ট্রায়াঙ্গল।

তবে দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়টা ছিল আর্সেনালের, বিশেষ করে ডেকলান রাইসের দাপুটে সময়। পার্টে না থাকলেও রাইস ছন্দে ফেরান মাঝমাঠ। ত্রোসার এক গোলের সুযোগ পেলেও দোন্নারুমা আবার বাধা হয়ে দাঁড়ান।

তবে শেষ ১০ মিনিটে ঘুরে দাঁড়ায় আর্সেনাল। বুকায়ো সাকা জ্বালিয়ে দেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, কিউইওরের ক্রস থেকে মেরিনোর শট একেবারে শেষ মুহূর্তে ব্লক করেন নেভেস। দ্বিতীয়ার্ধে গোল পেলেও তা বাতিল হয়—মেরিনোর হেড থেকে বল জালে গেলেও অফসাইড। আবার, প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এসেছিল আর্সেনালের সবচেয়ে বড় সুযোগ। মাইলস লুইস-স্কেলির থ্রু বল পেয়ে শট নেন মার্টিনেলি। কিন্তু ততক্ষণে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন দোন্নারুমা।

এর আগে ৩২ মিনিটে দোয়ের শটে দারুণ সেভ করেন ডেভিড রায়া। কাভারাশখেইয়ার পেনাল্টির দাবিও উড়িয়ে দেন রেফারি। টিম্বারের হাতে বল লাগলেও সহজে পড়ে যাওয়ায় পেনাল্টি মেলেনি।

শেষ দিকে সালিবার দুর্দান্ত ট্যাকলেই রক্ষা পেয়েছে আর্সেনাল। কিন্তু অন্যপ্রান্তে যখন গোল দরকার, তখন গোলমেশিন রূপে ফিরেছে পিএসজি। বারকোলা আর রামোস যদি গোল করতেন, তাহলে ব্যবধান বাড়তেই পারত।

সেই হিসেবে ১-০ স্কোরলাইন হয়তো বড় দুর্দশার কারণ হচ্ছে না আর্সেনালের জন্য। তবে প্যারিসে গিয়ে এই স্কোরলাইন ঘোরানো সহজ হবে না। ১২ ম্যাচ পর এমিরেটস-দুর্গের পতন ঘটা, চ্যাম্পিয়নস লিগে ৬ষ্ঠ সাক্ষাতে পিএসজির কাছে গানারদের প্রথম পরাজয়ের পরও আর্সেনালের স্বপ্ন এখন টিকে আছে একটাই শর্তে—অসাধারণ কিছু ঘটাতে হবে দ্বিতীয় লেগে।

আরও